শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

‘তামাক পণ্য নিষিদ্ধের ধারা বাতিল করা সরকারের প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী’

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১৯ পিএম

শেয়ার করুন:

‘তামাক পণ্য নিষিদ্ধের ধারা বাতিল করা সরকারের প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী’

‎জাতীয় সংসদে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল ২০২৬ পাস হয়েছে, যেখানে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচসহ সব ধরনের উদীয়মান তামাক পণ্য নিষিদ্ধের বিধান বাতিল করা হয়েছে। ফলে এ সব দ্রব্য কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই বাজারে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে, যা জনস্বাস্থ্য ও বিশেষ করে দেশের যুবসমাজের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে বলে জানিয়েছে তামাক বিরোধী সংগঠনগুলো।

‎শনিবার (১১ এপ্রিল) সংগঠনগুলোর যৌথ বিবৃতিতে এমন প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠিয়েছেন বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের (বাটা) মিডিয়া অফিসার নাজমুন নাহার নীপা।

‎বিবৃতি দেওয়া সংগঠনগুলো হলো— বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট (বাটা), বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল এডভোকেটস (বিটিসিএ), বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি), বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল রিসার্চ নেটওয়ার্ক (বিটিসিআরএন), বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি, এইড সোস্যাইটি, আর্থ ফাউন্ডেশন, সেতু, লিডার্স ইন টোব্যাকো কন্ট্রোল এলামনাই এসোসিয়েশন, লেটথ ওয়ার্ক, প্রত্যাশা মাদক বিরোধী সংগঠন, পাবলিক হেলথ ল’ইয়ার্স নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্য আন্দোলন, তামাক বিরোধী নারী জোট (তাবিনাজ), ইউনাইটেড ফোরাম এগেইনস্ট টোব্যাকো, স্কুল অব লাইফ, ইয়ুথ ফর টোব্যাকো ফ্রি বাংলাদেশন।

‎গতকাল শুক্রবার সংসদে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল ২০২৬ পাস হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ্য করে বিবৃতিতে বলা হয়, আপিল বিভাগ সিভিল (আপিল নং ২০৪-২০৫/২০০১) মামলায় ২০১৬ সালে ১ মার্চ এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে বাংলাদেশে যৌক্তিক সময়ের মধ্যে তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দেন। ই-সিগারেট, ভ্যাপ এবং নিকোটিন পাউচ বৈধ করার পদক্ষেপ আদালতের সিদ্ধান্তের পরিপন্থি।

‎বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০৫ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের মাধ্যমে একটি যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগ বাংলাদেশকে তামাক নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ এশিয়ায় অগ্রণী ভূমিকায় নিয়ে এসেছিল। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে ই-সিগারেট নিষিদ্ধের বিধান বাতিল করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রোগ ও মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত শুধু সেই অগ্রগতির বিপরীতমুখীই নয়, বরং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিরও পরিপন্থী।

‎বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সংসদে বলেছেন, রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ই-সিগারেট বিধান বাতিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ এ সিদ্ধান্ত রোগের অর্থনীতির জন্ম দেবে। বাংলাদেশে তামাকের কারণে মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা রাজস্ব আয়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষার অর্থনীতির ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

‎সংগঠনগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক গবেষণা ও তথ্য অনুযায়ী, ই-সিগারেটের ক্ষতিকর প্রভাব ইতোমধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। ২০২৩ সালে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল টোব্যাকো কন্ট্রোল (আইজিটিসি)-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বের ১৩২টি দেশ ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করেছে, যার মধ্যে ৪৬টি দেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। এটি প্রমাণ করে যে বৈশ্বিকভাবে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশ উল্টো পথে হাঁটছে।

‎সংগঠনগুলো আরও বলছে, ই-সিগারেট শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণই নয়, এটি বর্তমানে মাদক গ্রহণের একটি মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, কিছু চক্র ই-সিগারেট বা ভ্যাপের লিকুইডে এমডিএমবি নামক মারাত্মক মাদক মিশিয়ে সরবরাহ করছে, যা ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’ নামে পরিচিত এবং বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ই-সিগারেটকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাজারে ছেড়ে দেওয়া দেশের যুবসমাজকে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।

‎‘এছাড়াও, মাত্র ৬১ কোটি টাকার বিনিয়োগের বিপরীতে একটি বহুজাতিক তামাক কোম্পানিকে দেশে নিকোটিন পাউচ উৎপাদনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। বিশ্বের বহু দেশ যেখানে নিকোটিন পাউচ নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে এ ধরনের উৎপাদনের অনুমোদন দেওয়া জনস্বার্থের পরিপন্থী। বৈশ্বিক বাস্তবতায় যখন অধিকাংশ দেশ জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, তখন বাংলাদেশ বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে’, বলেও বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়।

‎২০০৫ সালে যেভাবে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেই অঙ্গীকার রক্ষার্থে ই-সিগারেট, নিকোটিন পাউচসহ সব ধরনের উদীয়মান তামাক পণ্য নিষিদ্ধের জন্য দ্রুত কার্যকর আইন প্রণয়নে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি দাবি জানায় তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো। পাশাপাশি ফিলিপ মরিসকে দেওয়া নিকোটিন পাউচ কারখানার অনুমোদন বাতিলের দাবিও জানানো হয়েছে। 

‎এএম/ক.ম 

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর