জুলাই বিপ্লবের পর থেকে দেশে অপপ্রচারের ঢেউ উঠেছে। এ কাজে দেশের সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারকারীরা যেমন জড়িত, তেমনই অপপ্রচার চলেছে ভারত থেকেও। আর অপ্রচারের শিকার হওয়াদের মধ্যে শীর্ষে আছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপরই আছেন পতিত শেখ হাসিনা এবং জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান।
সম্প্রতি অপপ্রচার শনাক্তকারী প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার বাংলাদেশের করা একটি প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন
ওই প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে তিন মাসে ভুল তথ্যের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাজনীতি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা। সম্মিলিতভাবে এবং রাজনৈতিক—উভয় ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রয়েছেন শীর্ষে। তাকে নিয়ে ২৮৭টি অপপ্রচার শনাক্ত করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও জনমত প্রভাবিত করার প্রবণতাকে তুলে ধরে।
অপপ্রচারের শিকারের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে আছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাকে নিয়ে ৯০টি অপপ্রচার শনাক্ত করেছে রিউমার স্ক্যানার। তৃতীয় স্থানে আছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ৮০টি অপতথ্যের শিকার।
রিউমার স্ক্যানার বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশে মোট ১৯৭৪টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩৬ শতাংশ বেশি। গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে এই সংখ্যা ছিল ৮৩৭টি।
বিজ্ঞাপন
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ভুল তথ্যের বিস্তার বাড়ার পেছনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ জাতীয়, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আগের প্রান্তিকের (২০২৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর) তুলনায় এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৩৭ শতাংশ।
একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে তারেক রহমানকে নিয়ে। রাজনৈতিক দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য প্রচারিত হয়েছে বিএনপিকে নিয়ে। এই তথ্যগুলো রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে গত তিন মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে।
রিউমার স্ক্যানার আরও বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ফেসবুকেই সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে। মেটার মালিকানাধীন এই প্ল্যাটফর্মে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মোট ১,৭৩২টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১৯টিরও বেশি ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছে এখানে।
ফেসবুকের পর একক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে টিকটকে, ৩৬৮টি। এছাড়া ইউটিউবে ১১৫টি, ইনস্টাগ্রামে ২৬৪টি এবং মেটার আরেক প্ল্যাটফর্ম থ্রেডসে ৫১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরেও অপতথ্য বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে দেশের গণমাধ্যম। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভিডিওসহ মোট ৬৮টি কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে।
এর পাশাপাশি তিন মাসে ভারতীয় গণমাধ্যমেও অন্তত নয়টি ঘটনায় বাংলাদেশকে জড়িয়ে অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকেই ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম বাংলাদেশকে নিয়ে অপপ্রচারে লিপ্ত।
তবে এই প্রবণতা মার্চে এসে হঠাৎই কমে যায়। রাজনৈতিক অপতথ্য ২৫০-এ নেমে আসে এবং নির্বাচন-সংক্রান্ত অপতথ্য মাত্র ৮-এ সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ, যে তীব্রতা ফেব্রুয়ারিতে দেখা গিয়েছিল, তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রশমিত হয়। এই আকস্মিক পতন ইঙ্গিত করে যে, নির্বাচনি কার্যক্রম বা সংশ্লিষ্ট উত্তেজনা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপতথ্যের প্রবাহও দ্রুত কমেছে।
সার্বিকভাবে এই দুই প্রান্তিকের তুলনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। রাজনৈতিক অপতথ্য হঠাৎ করে তৈরি হয় না; বরং এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, নির্দিষ্ট সময়পর্বে (বিশেষ করে নির্বাচন ঘিরে) চূড়ায় পৌঁছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত কমে যায়।
অন্যদিকে জাতীয় ইস্যুতে নজর দিলে দেখা যায়, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস (৫০) সবচেয়ে বেশি অপতথ্যের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। পাশাপাশি সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে জড়িয়েও কিছু অপতথ্য ছড়িয়েছে।
নারী সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা এগিয়ে। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান ও ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমাকে নিয়ে বিভ্রান্তি নারী ব্যক্তিত্বদের লক্ষ্য করে তথ্য বিকৃতির প্রবণতাকে ইঙ্গিত করে।
এছাড়া সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামও উল্লেখযোগ্য হারে অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন। অপপ্রচার হয়েছে সেনাবাহিনী (৭০) ও পুলিশ (৫৮) বাহিনীকে নিয়েও।
আরও পড়ুন: গুজব ও অপপ্রচার রোধে ইসলামি নির্দেশনা
এছাড়া ক্রীড়া ও বিনোদন অঙ্গনে ভুল তথ্যের পরিমাণ কম হলেও তা পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়। ক্রীড়ায় মুস্তাফিজুর রহমান এবং বিনোদনে আসিফ আকবরকে ঘিরে ভুল তথ্যের প্রবাহ ছিল সবচেয়ে বেশি।
ভুয়া ফটোকার্ডে অপতথ্যের বিস্তার
বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ানো এখন একটি কৌশলগত পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে গণমাধ্যমের নাম ও লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এই সময়ে এমন ৫৯৩টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে মোট ৬১১টি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি টার্গেট হয়েছে দেশীয় গণমাধ্যম। মোট ৫৯টি আক্রান্ত সংবাদমাধ্যমের মধ্যে ৫৪টিই দেশের, আর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ছিল মাত্র পাঁচটি।
আক্রান্ত গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে দৈনিক আমার দেশ (৯১)। এরপর রয়েছে যমুনা টিভি (৬৫) ও দৈনিক কালের কণ্ঠ (৫৫)। এছাড়া আরটিভি (৩২) এবং চ্যানেল টোয়েন্টিফোরকেও (৩১) উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
এএইচ



