মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ নিয়ে জনমনে কৌতূহল ও উদ্বেগ বাড়ছে। দেশে বর্তমানে কত জ্বালানি তেল রয়েছে এবং তা দিয়ে কতদিন চাহিদা মেটানো সম্ভব—এই প্রশ্ন ঘুরেফিরেই সামনে আসছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি সংকট না থাকার দাবি করা হলেও ‘তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে’—এমন আশঙ্কায় দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের সারি। গ্রাহক ও বিক্রেতাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা কিংবা সংঘাতের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ মজুত ঠেকাতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। সব মিলিয়ে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তি বিরাজ করছে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার বড় অংশই ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল। অকটেনের অল্প অংশ আমদানি হলেও এর বড় অংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ মূলত আমদানিনির্ভর, যেখানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
তবে দেশের সংরক্ষণ সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় পুরো বছরের জ্বালানি একসাথে মজুত করা সম্ভব নয়। নিয়মিত আমদানি ও ব্যবহারের মধ্য দিয়েই সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় মার্চ মাস থেকেই বাংলাদেশে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। আগের বছরের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করছে সরকার। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দাবি, মার্চের মতো এপ্রিলেও কোনো সংকট হবে না।

বিজ্ঞাপন
তেলের মজুত কত?
দেশে এই মুহূর্তে জ্বালানি তেলের মজুত কত? কতদিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব? এই প্রশ্নগুলো এখন অনেক বেশি আলোচনায়।
বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুত রয়েছে এক লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন।
এছাড়া সাত হাজার ৯৪০ মেট্রিক টন অকটেন, ১১ হাজার ৪৩১ মেট্রিক টন পেট্রোল এবং ৪৪ হাজার ৬০৯ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল মজুত রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ডিজেলের গড় নিয়মিত চাহিদা ১২ হাজার মেট্রিক টনের মতো। অর্থাৎ মজুত থাকা ডিজেলে প্রায় ১১ দিনের মতো চলবে।
তার মানে এই নয়, জ্বালানি তেলের মজুদ ফুরিয়ে শূন্য হয়ে যাবে। এই সময়ে নতুন করে আমদানি করা জ্বালানি তেলের চালান দেশে পৌঁছালে আবারও এই মজুত বাড়বে।
যেমন সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন এবং মার্চ মাসে ভারত থেকে ২২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে এসেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন।
এছাড়া অকটেন পেট্রোলের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া। প্রতিদিনের ব্যবহারের পাশাপাশি স্টকে নতুন করে তেল যুক্তও হচ্ছে বলে জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, এই মুহূর্তে মাসভিত্তিক চাহিদা পূরণেই গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
তিনি জানান, গত বছরের এপ্রিলে দেশে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ হয়েছিল এই বছরের এপ্রিলেও একই পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই বলে দাবি মনির হোসেন চৌধুরীর। তিনি বলছেন, ডিজেলে কোনো সংকট নেই, বরং পাচারের শঙ্কা থাকতে পারে, যা সরকার বিবেচনায় রেখেছে- সীমান্তে নির্দেশনা দেওয়া আছে।
জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মজুদের চেষ্টা থাকায় এই মুহূর্তে প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করা কঠিন হচ্ছে।
এক্ষেত্রে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুদ থাকা উচিত।
কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা না থাকায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম।
অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, স্টোরেজ বা সংরক্ষণ সক্ষমতা কম হওয়ায় আমরা সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ দিনের বেশি তেল মজুত করে রাখতে পারি না।
‘কৌশলগত মজুতের’ সক্ষমতা না থাকা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ বলেও মনে করেন তিনি।
‘সব সময়ই মজুত ওঠানামা করে। সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার সঙ্গেও জুন মাস পর্যন্ত আমাদের জ্বালানি চুক্তি আছে, কিন্তু তাদেরও অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকেই। ফলে তারা যে পরিশোধিত তেল দেয় সেটাও ধারাবাহিক থাকবে না,’ বলেন তিনি।

জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতা কেন?
‘প্রায় দুই ঘণ্টা দাড়াইছি এক পাম্পের সামনে পরে বলে তেল নাই। পরে আরেকটা পাম্পে আইসা অনেকক্ষণ দাড়াইয়া দুইশ টাকার তেল দিছে।’ নিজের অভিজ্ঞতা বলছিলেন ঢাকার বংশাল এলাকার বাসিন্দা মোটরসাইকেল চালক আনিসুর রহমান। পাম্প থেকে তেল দিতে অনিয়ম করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তার।
অন্যদিকে পেট্রোল পাম্প মালিকরা নিরাপত্তা চেয়েছেন সরকারের কাছে। তাদের দাবি, কোনো অনিয়ম না করেই অনেক সময় গ্রাহকদের আক্রোশের শিকার হচ্ছেন তারা।
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে যে, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের আদেশ, নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা।
এছাড়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে রাতের বেলা পেট্রোল এবং অকটেন বিক্রি বন্ধ রাখতে সরকারের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন পাম্প মালিকরা।

এদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে জ্বালানি তেল মজুতের অভিযোগে কয়েকটি পেট্রোল পাম্পের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছে প্রশাসন।
সব মিলিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সংকট না থাকার কথা বলা হলেও মাঠ পর্যায়ে জ্বালানি তেল নিয়ে অস্বস্তির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে প্রতিদিনই যানবাহনের লাইন দীর্ঘ হওয়ার সাথে সাথে মানুষের মধ্যে অস্থিরতাও বাড়ছে।
যদিও জ্বালানি তেলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা সরকার করছে বলে দাবি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরীর।
তিনি বলছেন, মার্চের মতো এপ্রিল মাসেও জ্বালানি তেল সংকটের কোনো শঙ্কা নেই।
তাহলে পেট্রোল পাম্পের সামনে জ্বালানি তেলের জন্য যানবাহনের এমন দীর্ঘ লাইন কেন? এই প্রশ্নের জবাবে মনির হোসেন চৌধুরী বলছেন, এই দীর্ঘ লাইন মনস্তাত্ত্বিক। আমরা কোনো সংকট দেখছি না।

সরকার কী করছে?
জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে আলোচনা শুরুর পর থেকেই ‘প্যানিক বাইং’ এবং ‘মজুত’ এই শব্দগুলোও অনেক বেশি সামনে আসছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী ব্যবহারের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংগ্রহের কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
এছাড়া জ্বালানি তেলের মজুত এবং এর সঠিক ব্যবস্থাপনায় দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে ১১৬ জন, ঢাকার ১৩ জেলায় ৪৭৯ জন, চট্টগ্রামের ১১ জেলায় ৩৩০ জন, রাজশাহীর আট জেলায় ৩৪০ জন, খুলনার দশ জেলায় ৩০১ জন কর্মকর্তা ট্যাগ অফিসার হিসেবে কাজ করছেন।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলছেন, বাকি বিভাগগুলোতেও একইভাবে সরকারিভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘জ্বালানি তেল ব্যবস্থাপনায় সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এই কর্মকর্তারা কাজ করবে এবং এ সংক্রান্ত নিয়মিত তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন,’ বলেন তিনি।
>> আরও পড়ুন
এছাড়া জ্বালানি তেল মজুতের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে বলেও জানান মনির হোসেন চৌধুরী।
তিনি বলেন, ৩০ মার্চ একদিনে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সারাদেশে ৩৯১টি অভিযান চালানো হয়েছে।
‘এসব অভিযানে ১৯১টি মামলা করা হয়েছে, প্রায় দশ লাখ টাকা জরিমানা এবং তিন জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে,’ বলেন তিনি।
এছাড়া প্রায় ৬৮ হাজার লিটার ডিজেল, সাড়ে ছয় হাজার লিটার অকটেন এবং প্রায় ১৪ হাজার লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি তেল সাধারণত দুই ভাবে কেনা হয়। উৎস দেশের সঙ্গে সরকারিভাবে চুক্তির মাধ্যমে অথবা ওপেন টেন্ডারে স্পট মার্কেটের মাধ্যমে।
‘ভারত, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো কয়েকটি দেশের সঙ্গে আমাদের চুক্তির মেয়াদ এখনো রয়েছে। এছাড়া আমেরিকা ও চীনের সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ করছি জ্বালানি তেল আনার ব্যাপারে,’ বলেন তিনি। সূত্র: বিবিসি বাংলা
/এএস

