ঈদ মানেই নতুন পোশাক, নতুন জুতা, আনন্দ আর মিলনমেলা। তবে সেই আনন্দের আড়ালে নিঃশব্দে পরিশ্রম করছেন একদল মানুষ (মুচি)। পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে রাজধানীজুড়ে মুচিদের কর্মব্যস্ততা অনেকগুন বেড়েছে। দিন-রাত এক করে তারা পুরোনো জুতায় নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দিচ্ছেন, যেন সবার পায়ের আনন্দ নিখুঁত হয়।
রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন, গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম ও জিপিও এলাকায় ছোট ছোট দোকান ক ফুটপাতে সকাল থেকেই উপচে পড়া ভিড়। কেউ সোল লাগাচ্ছেন, কেউ রঙ করছেন, কেউ সেলাই-সবই শেষ মুহূর্তে।
বিজ্ঞাপন
সুমন কৃষ্ণ নামের একজন মুচি ঢাকা মেইলকে বলেন, ঈদের আগে গ্রাহকের চাপ অনেক বেড়ে যায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করি। কেউ সোল লাগাচ্ছেন, কেউ রঙ করছেন, কেউ সেলাই-সবই সময়মতো শেষ করতে হয়। আমরা খুশি, মানুষের ঈদ আনন্দে আমাদের অবদান আছে।
আরেকজন মুচি, আনিসুর রহমান যোগ করেন, পুরোনো জুতো ঠিক করে দিতে পারলে গ্রাহক খুশি। আমাদের জন্য এ সময়টিই সবচেয়ে ব্যস্ত। তবে খুশিরও এক বিশেষ অনুভূতি থাকে।
বিজ্ঞাপন
মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে নতুন জুতা কিনা সবসময় সম্ভব হয় না। তাই তারা আসেন মুচিদের কাছে-পুরনো জুতো ঠিক করাতে বা রঙে নতুন করে তুলতে। একজন দিনমজুর, কামরুল ইসলাম বলেন, আমি চাই নতুন জুতা, কিন্তু কেনার সামর্থ্য নেই। তাই মুচির কাছে আসি। আমার পছন্দের জুতো আবার নতুনের মতো হয়ে যায়। মুচিরা সময়মতো কাজ শেষ করে দিচ্ছেন।
গার্মেন্টস কর্মী রোশনী আক্তার বলেন, আমার ছেলে ছোট, সে খুব বেশি দৌড়ঝাঁপ করে। তাই নতুন জুতা কেনার পরিবর্তে আমরা পুরোনো জুতো মেরামত করি। মুচিরা ভালোভাবে সেলাই ও রং করে দেয়। আমরা সন্তুষ্ট।
আরও পড়ুন: উত্তরের পথে পথে ভোগান্তি
ঈদকে সামনে রেখে মুচিদের চাপ চরমে পৌঁছায়। পুরোনো জুতোর সোল লাগানো, ছেঁড়া অংশ সেলাই, রঙ করা-সবই বেড়ে যায়। অনেকে রাতে পর্যন্ত কাজ চালান।
রবি নামের এক মুচি বলেন, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় ঈদে আয় অনেক গুণ বেড়ে যায়। তবে কাজের চাপও বেড়ে যায়। রাত জেগে কাজ করি, তবুও খুশি যে মানুষ আমাদের কাজের মূল্য বোঝে।
সমাজে অনেক সময় মুচির পেশাকে ছোট করে দেখা হয়। কিন্তু ঈদে তাদের গুরুত্ব প্রকটভাবে দেখা যায়। শ্রমজীবী মানুষের আনন্দে মুচির অবদান অদৃশ্য হলেও অপরিসীম। তাদের হাতের কাজই সবার ঈদের আনন্দকে পূর্ণতা দেয়।
মুচিরা শুধু জুতো মেরামত করেন না, শহরের জীবনের রঙই যোগ করেন। ঢাকার মতিঝিল, পল্টন, গুলিস্তান-সব জায়গায় শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা যেন এক উৎসবমুখর চিত্র। ফুটপাথ, মোড় ও ছোট দোকানগুলোতে এক পাশে রঙের বোতল, অন্য পাশে সোলের স্টক, আর সব জায়গায় গ্রাহকের অপেক্ষা।
বেসরকারি একটি বীমা কোম্পানির চাকরিজীবী আশিকুর রহমান বলেন, আমি দেখছি, ছোট এই পেশার মানুষগুলো কত পরিশ্রম করছেন। এদের জন্য আমরা অপেক্ষা করি। ঈদে আমাদের আনন্দের পিছনে এই মানুষগুলোর হাতের কাজ রয়েছে।
নতুন জুতার ঝলমলে বাজারের পাশে, পুরোনো জুতায় নতুন প্রাণ ফেরানোর এই ব্যস্ততা দেখায় মুচিদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ছোট পেশা হলেও তাদের শ্রমে মানুষের ঈদ আনন্দ পূর্ণ হয়। প্রতিটি সেলাই, প্রতিটি রং, প্রতিটি পালিশ-সবই ঈদকে করে তোলে আরও রঙিন, আরও প্রাণবন্ত।
এভাবে, মুচিদের চেষ্টায় নগর জীবনের ধীরবৃত্ত, শেষ মুহূর্তের হট্টগোল এবং সাধারণ মানুষের আনন্দ একত্রিত হয়ে একটি জীবন্ত চিত্র তৈরি করছে-ঈদের আনন্দকে আরও সমৃদ্ধ করে।
এমআর/এমআই
