-
কেউ পথেই সেহরি ইফতার সেরেছেন
-
কারও লাগছে ১৮ ঘণ্টা, কেউ এখনো পথে
-
সড়কে গাড়ি বিকল অন্যতম কারণ
-
কাউন্টারগুলোতে এখনো মানুষের ভিড়
ইউসুফ আহমেদ গতকাল রাত সাড়ে তিনটার দিকে গাবতলী থেকে দিনাজপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার বিকেল তার সঙ্গে কথা হলো তখন তাকে বহনকারী বাসটি বগুড়ায় ঢুকছে। তিনি বলছিলেন, বাড়ি কখনো পৌঁছাবো জানি না।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে জিসানুল ইসলাম রাত দশটায় গাবতলী থেকে রওনা হন লালমনিরহাটের উদ্দেশ্যে। তিনি রাত আটটার পর বাড়িতে পৌঁছেছেন বলে জানা গেছে।
বুধবার (১৮ মার্চ) দুপুর থেকে উত্তরের পথে ঈদ করতে যাওয়া লোকজন এভাবেই ভোগান্তিতে পড়ছেন। আজও চলছে সেই ভোগান্তি। যদিও বিকেল থেকে কিছু্টা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে পরিস্থিতি।
ইউসুফ আহমেদ বলছিলেন, রাত দশটায় গাড়ি ছিল। ফলে বৌ বাচ্চা নিয়ে রাত নয়টায় কাউন্টারে গেলাম। কিন্তু গিয়ে শুনি বাস আসেনি। আসতে দেরি হবে। পরে বাস আসলো রাত তিনটায়। উঠতে উঠতে লাগলো সাড়ে তিনটা। এই দীর্ঘ সময়ে ছোট দুই বাচ্চাকে নিয়ে বড্ড সমস্যায় পড়তে হয়েছে। যা বলে বোঝাবে না। পথেই সেহরি সারতে হয়েছে। তাও নামকাওয়াস্তে। পানি ও টয়লেটের সমস্যা তো ছিলই। গতকাল এক জায়গাতেই প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বাসে পড়ে ছিলাম। এরপর গাড়ি চললো আবার কিছুদূর গিয়ে থেমে রইলো। এভাবে বাড়ি পর্যন্ত আসতে ১৬ ঘণ্টারও বেশি লাগলো বগুড়া আসতে। বাকী পথ এখনো বাকী।
বিজ্ঞাপন

জিসানুল বলেন, ‘এবারের জার্নির ভোগান্তির কথা বলে শেষ করা যাবে না। দুই বাচ্চা, স্ত্রীকে নিয়ে কী যে কষ্ট। বাসের ভেতর গরম, পানি ও খাবারের সংকট, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম আমরা। যদিও এখন বাড়িতে বসে কথা বলছিল। কিন্তু এসব ভোগান্তি কমাতে সরকারকে আরও আন্তরিক হতে হবে।’
গত ঈদেও উত্তরের পথে রওনা হতে গিয়ে এমন ভোগান্তির শিকার হন হাজার হাজার মানুষ। এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। ফলে তারা বিষয়টি কোনোভাবে মেনে নিতে পারছেন না। একই জায়গাগুলোতে প্রতি বছর যানজট হওয়ায় অনেকে বিরক্ত। যাত্রীরা না পেরে সামাজিক মাধ্যমে সেই বিরক্তির কথাও জানাচ্ছেন।
দিনাজপুর যেতেই লাগছে ১৮ ঘণ্টা!
উত্তরের জেলাগুলোতে রওনা হতে গিয়ে কারও ১৮ ঘণ্টা, কারও ২৪ ঘণ্টাও সময় লাগছে বাড়িতে পৌছাতে। তবে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন যারা ঠাকুরগাঁ ও পঞ্চগড় জেলায় বাড়ী। তাদের আরও বেশি সময় লাগছে। দীর্ঘ এই সময়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
ঢাকা থেকে গতকাল রাত ১২টায় রওনা হয়ে আজ বিকেল ছয়টায় পৌঁছেছেন সাজিদ রহমান। দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টা বাসেই বসে ছিলেন। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে সেই ভোগান্তির কথা তিনি ফেসবুকে জানান দেন। তার ভাষ্য হলো, প্রতি বছর উত্তরের জেলাগুলোতে রওনা হতে গিয়ে এমন ভোগান্তি হচ্ছে। সরকারকে এজন্য আরও আন্তরিক হতে হবে। রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে কিন্তু ভোগান্তিতে তো কমলো না।

জানা গেছে, টাঙ্গাইলের কালিহাতি, এলেঙ্গা, বাইপাইল ও চান্দুরা এলাকার সড়কগুলোতে গাড়িতে ভরে গেছে। ফলে গাড়ির জট লেগে আছে। এ কারণে মহাসড়কটিতে গতকাল থেকে যানজট তৈরি হয়েছে। তাছাড়াও ঢাকা থেকে রওনা হওয়া অনেক গাড়ির রাস্তাতে বিকল হয়ে পড়ে থাকছে। তবে এই যানজটের প্রভাব ঢাকার বাস টার্মিনালগুলোতে গতকাল থেকেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যার কারণে সময়মতো যাত্রীরা রওনা হতে পারছে না।
টাঙ্গাইলের কালিহাতি, এলেঙ্গা ও যমুনা ব্রিজের এলাকার দায়িত্বে থাকা এএসপি মনজুরুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, গতকাল থেকে গাড়ীর জট তৈরী হয়েছে। আজ দুপুর থেকে বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত কাজ করে সচল করা হয়। তবে পুরোপুরি সচল হতে সময় লাগবে।
ট্রাফিক পুলিশের দাবি, সড়কগুলোতে গতকাল থেকে এক যোগে রওনা হওয়া গাড়িগুলোর কিছু বিকল হয়ে পড়ে ছিল। সেগুলো খবর পেয়ে সারাতে সময় লাগছে। ফলে অন্য গাড়িগুলো এসে যোগ হওয়ায় জটের সীমানা বাড়ছে। তা দীর্ঘতর হচ্ছে। তবে আজ সেই ভোগান্তি কমে আসবে বলে বিশ্বাস তাদের।

এদিকে বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বিকেল পর্যন্ত ঢাকা থেকে দূরপাল্লার বাসগুলো সময়তো উত্তরের পথে রওনা হতে পারেনি। ফলে সকালে রওনা হতে চাওয়া লোকজনের ভোগান্তি ছিল চরমে।
গাবতলীতে কথা হচ্ছিলো বিল্লাল দম্পতির সঙ্গে। তিনি যাবেন নাটোর জেলায়। বলছিলেন, দুপুর বারটায় বাস ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু বিকেল তিনটায়ও বাস ছাড়লো না। বাড়িতে কখন পৌঁছাবো ভাবছি। এদিকে শুনছি যমুনার সামনে দীর্ঘ গাড়ির জট। সব মিলে চিন্তা হচ্ছে।
বিপাকে পড়েছেন বাস কাউন্টারের কর্মীরাও
গাবতলীতে থাকা কাউন্টারম্যানরা জানিয়েছেন, তারা গতকাল যে বাস ছেড়েছিলেন তার অর্ধেকও আজ বিকেলে ঢাকায় ঢুকতে পারেনি। ফলে অনেকে বিরক্ত হয়ে টিকিট বুকিং বাতিল করছে।

আহাদ এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার ইয়াসিন বলেন, রাস্তায় অনেক যানজট। ফলে রাতে যে গাড়ি ছাড়া হয়েছে সেগুলোর অধিকাংশ এখনো গাবতলীতে ফিরে আসেনি। তবে কিছু গাড়ী চান্দুরা, বাইপাইলে আটকে আছে। হয়তো দুপুরের পর ঢাকায় ঢুকবে। এ কারণে বাড়তি টিকিটও বিক্রি করতে পারছি না।
তিনি জানান, তাদের এসি/ ননএসি মিলে ৩০ টি গাড়ি তারা রাতে ছেড়েছেন। এখনো ছাড়ছেন। কিন্তু বাসগুলোর জিপি ট্রাক বলছে, সেগুলো এখনো যমুনা সেতু পার হতে পারেনি।
এমন ভোগান্তিতে শুধু আহাদ পরিবহনের বাসগুলোই পড়েনি, ভুগছে নামিদামি কমবেশি পরিবহণের দূরপাল্লার বাসগুলো।
শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের ২৯টি বাস গত রাতে উত্তরের জেলাগুলোতে রওনা হয়েছে। কিন্তু মাত্র সাতটি ফিরে আসলেও বাকিগুলো এখনো গন্তব্য যাওয়ার জন্য মাঝপথে পড়ে আছে৷

কাউন্টারম্যান জাহিদ বলেন, বসে আছি। যাত্রীরা বারবার এসে খোঁজ খবর নিচ্ছে কখন বাস ফিরবে কিন্তু এটা তো আমাদের ওপর নেই। রাস্তার অবস্থা ভালো না ফলে এই অবস্থা।
আরও পড়ুন: যথাসময়ে বাস না ছাড়ায় যাত্রীদের ক্ষোভ
এদিকে উত্তরের পথে এমন ভোগান্তির কথা জানতে পেরে বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পরিস্থিতি দেখার পর ছুটে যান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
তিনি জানান, ঈদযাত্রায় জনভোগান্তি কমাতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঈদের ছুটিতে ঘরমুখো মানুষ যাতে ভোগান্তির শিকার না হন এবং রোজাদারদের যেন সড়কে ইফতার করতে না হয়, সেজন্য সার্বক্ষণিকভাবে মহাসড়ক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এমআইকে/এমআই

