দেশে তামাকজনিত রোগে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও অর্থনীতির স্বার্থে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের অধ্যাদেশ দ্রুত আইনে পরিণত করার দাবি জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও তামাক নিয়ন্ত্রণকর্মীরা। তাদের মতে, শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন করা গেলে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিও লাভবান হবে।
বুধবার (১১ মার্চ) সকালে ‘জাতীয় অর্থনীতিতে শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রভাব’ শীর্ষক এক ওয়েবিনারে বক্তারা এসব বলেন। বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) এ ওয়েবিনারের আয়োজন করে।
বিজ্ঞাপন
ওয়েবিনারে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিএনটিটিপির প্রজেক্ট ডিরেক্টর হামিদুল ইসলাম হিল্লোল। তিনি বলেন, টোব্যাকো অ্যাটলাসের তথ্যমতে দেশে প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৯৯ হাজার মানুষ তামাকজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করে। একইসঙ্গে তামাকজনিত রোগে চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট খাতে বছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। বিপরীতে তামাক খাত থেকে সরকার রাজস্ব পায় মাত্র ৪০ হাজার কোটি টাকা। তাই জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে তামাক নিয়ন্ত্রণের অধ্যাদেশ দ্রুত আইনে পরিণত করা প্রয়োজন।
হামিদুল ইসলাম হিল্লোল বলেন, গত ২১ বছরে তামাক থেকে সরকারের রাজস্ব আয় প্রায় ১৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রায় প্রতি বছরই রাজস্ব বাড়তে দেখা গেছে। ২০০৫ ও ২০১৩ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের পরও রাজস্ব বৃদ্ধির ধারায় কোনো বাধা তৈরি হয়নি। কিন্তু যখনই মূল্য ও করহার বৃদ্ধি বা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই তামাক কোম্পানিগুলো রাজস্ব কমে যাওয়া এবং অবৈধ বাণিজ্য বাড়ার আশঙ্কার কথা প্রচার করে। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জব্দ করা শীর্ষ ১০ পণ্যের তালিকায় সিগারেট নেই। গবেষণা সংস্থা আর্ক ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে অবৈধ সিগারেটের বাজার মাত্র ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
একাত্তর টেলিভিশনের পরিকল্পনা সম্পাদক ও গবেষক সুশান্ত সিনহা বলেন, তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপের কারণে দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মৃত্যুর হার বাড়লেও তুলনামূলকভাবে রাজস্ব বৃদ্ধির হার কম। বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন যথেষ্ট শক্তিশালী না হওয়া এবং তামাক কোম্পানির প্রভাব এর প্রধান কারণ। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে জারি হওয়া তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ বাতিল ঠেকাতে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সরকারকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে তামাক কোম্পানিগুলো। তাই জনস্বার্থে দ্রুত এ অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা এবং একটি সমন্বিত তামাক করনীতি প্রণয়ন করা জরুরি।
বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সভাপতি ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে চললেও তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ ও নানা ধরনের অপপ্রচারের কারণে তা বিলম্বিত হচ্ছে। সব বাধা পেরিয়ে এখন একটি অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। তাই জনস্বার্থে সরকার দ্রুত এটিকে আইনে পরিণত করবে বলে আমরা আশা করি। ব্যবসার চেয়ে মানুষের জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি, কারণ তামাকজনিত রোগে চিকিৎসা ব্যয় ও মৃত্যুহার ইতোমধ্যেই বেড়ে গেছে।
বিজ্ঞাপন
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক জাহিদুল কাইয়ূম বলেন, দেশের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন শক্তিশালী করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তামাক কোম্পানিগুলো মূলত তরুণদের লক্ষ্য করেই তাদের ব্যবসায়িক কৌশল তৈরি করে। প্রত্যক্ষ ধূমপানের পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতির কারণেও তামাকজনিত রোগ ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। তাই তরুণদের ধূমপান থেকে দূরে রাখতে জারি হওয়া তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ দ্রুত আইনে পরিণত করা উচিত।
ওয়েবিনারে তামাক নিয়ন্ত্রণে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন। বিভিন্ন সংগঠনের প্রায় অর্ধশত প্রতিনিধি এ আয়োজনে যুক্ত ছিলেন।
এএইচ/ক.ম

