শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

ঈদ ঘিরে হকারদের গুলিস্তান দখল উৎসব, নির্বিকার সিটি করপোরেশন

মোস্তাফিজুর রহমান
প্রকাশিত: ০৬ মার্চ ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম

শেয়ার করুন:

ঈদ ঘিরে হকারদের গুলিস্তান দখল উৎসব, নির্বিকার সিটি করপোরেশন

ঈদের আরও দুই সপ্তাহ বাকি। সে উপলক্ষে বেচাকেনা এখনো সেভাবে শুরু হয়নি। অথচ গুলিস্তান এলাকার ফুটপাত থেকে শুরু করে রাস্তা পর্যন্ত দখল করে বসে পড়েছেন হকাররা। ফলে যানবাহন চলাচল যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি হাঁটাচলায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।

শুক্রবার (৬ মার্চ) সাপ্তাহিক ছুটির দিন। ফলে এদিন সড়কে যানবাহন ছিল তুলনামূলক কম। কিন্তু গুলিস্তান এলাকায় যেন ব্যতিক্রম। এদিন সকাল থেকেই যানজট তৈরি হয়ে আছে। বিশেষ করে দুপুরের পর যানজট তীব্র আকার ধারণ করে। অথচ একই সময়ে ওই এলাকার আশপাশ ছিল নির্ঝঞ্ঝাট।


বিজ্ঞাপন


এদিন সরেজমিনে গুলিস্তানের সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেট ও ঢাকা ট্রেড সেন্টার মার্কেট, সুপার মার্কেট এলাকা থেকে শুরু করে গুলিস্তান সুপার মার্কেট, হকার্স মার্কেট, বায়তুল মোকাররম মার্কেট পর্যন্ত সর্বত্রই এখন হকারদের দখলে থাকতে দেখা গেছে।

e

বিশেষ করে গুলিস্তান মোড় থেকে গোলাপ শাহ মাজার রোড এবং ফুলবাড়িয়া থেকে হানিফ ফ্লাইওভার রোড (সুন্দরবন স্কয়ার ও ঢাকা ট্রেড সেন্টারের মাঝের সড়ক)— দুটি সড়কই কার্যত হকারদের দখলে বন্ধ হয়ে আছে। সর্বত্রই প্যান্ট, শার্ট, জামা, জুতাসহ শত শত পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন হকাররা।

আরও পড়ুন: ঈদের বাজার: নারীদের পোশাকের দোকানে উপচে পড়া ভিড়


বিজ্ঞাপন


বড় দুটি ব্যাগ হাতে শাহআলম। তাঁর স্ত্রী সালমা খাতুন মেয়েকে কোলে ও ছেলেকে হাতে ধরে এগোচ্ছেন। তাঁরা ট্রেড সেন্টার মার্কেটের পশ্চিম পাশে একটু ফাঁকা জায়গা পেয়ে ক্ষণিকটা জিরিয়ে নেন। এ সময় কথা হলে সড়কের পরিস্থিতি নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা।

শাহআলম বলেন, ‘আমরা পিরোজপুর যাব। রামপুরা থেকে এলাম, কিন্তু কোথাও জ্যাম পাইনি। পল্টনে আসার পর আটকে গেছি। অনেকক্ষণ বসে থেকে এখন নেমে হেঁটে যাচ্ছি।’

i

‘ভেবেছিলাম এটুকু (জিরো পয়েন্ট থেকে ফুলবাড়িয়া) হেঁটে কাউন্টারে পৌঁছে যাব। কিন্তু নেমে আরও বিপদে পড়ে গেলাম। ফুটপাত তো দখল, রাস্তাও দখল। হাঁটার কোনো পরিস্থিতি নেই। এটুকু এসেই জান চলে যাচ্ছে। সঙ্গে বউ-বাচ্চারা আছে। কী একটা মুশকিলে পড়লাম,’ বলেন শাহআলম।

এদিকে ভিড় ঠেলে বায়তুল মোকাররমের দিকে যাচ্ছিলেন জাকির হোসেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছেন। বায়তুল মোকাররমের একটি স্বর্ণের দোকানে যাবেন।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘ফুটপাত-রাস্তা এমনভাবে দখল করা হয়েছে যেন মানুষকে টার্গেট করেই। যেটুকু এলাম, কোথাও দিয়ে মানুষ সরাসরি বা সহজে হাঁটা-চলা করতে পারছেন না। রাস্তার পদে পদে ঠেকে যাচ্ছেন মানুষ। এ কারণেই ভিড় লেগে যাচ্ছে।’

জাকির হোসেনের মতোই মন্তব্য করেন মো. শাকিল নামের এক পথচারী। তিনি গোলাপ শাহ মাজার এলাকা দিয়ে গুলিস্তান মোড়ের দিকে যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ফুটপাত-রাস্তায় দোকানগুলো সাজানোই হয়েছে যেন তাদের পণ্যগুলো দেখতে বাধ্য থাকেন পথচারীরা। আপনি প্রত্যেক দোকানে এমনিতেই দাঁড়াতে বাধ্য হন। এ কারণেই হয়তো এমন ভিড়। তা ছাড়া এত ভিড় হওয়ার কথা নয়।’

f

তবে রাস্তা বা ফুটপাত দখল করার বিষয়ে কথা বলতে চাইলে অনেকেই রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিকজন ঢাকা মেইলকে বলেন, ঈদের বেচাকেনা শুরু না হলেও তারা মূলত পজিশন দখলে রাখার জন্যই এখন বসে গেছেন।

‘বেচা হবে ঈদের দুই-চার দিন আগে। এখন না বসলে পরে বসার জায়গা পাব কোথায়,’ বলেন এক হকার। একেবারে রাস্তায় এসে বসার কারণ জানতে চাইলে আরেক হকার বলেন, তিনি এখানেই জায়গা পেয়েছেন, তাই বসেছেন। অনেকেই আবার দোকান বসানোর জন্য ‘জীবিকার তাগিদকে’ দায়ী করেন।

সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, গুলিস্তান এলাকায় ৫ হাজারের বেশি হকার রয়েছেন। তবে এই সংখ্যা ‘আরও অনেক বেশি’ হবে বলেও মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে ঈদকে ঘিরে অনেকেই ফুটপাতে মৌসুমি ব্যবসায় নেমেছেন বলেও জানা গেছে।

আরও পড়ুন: ঈদের কেনাকাটায় নিউ মার্কেট এলাকায় ক্রেতার ঢল, তীব্র যানজট

এসব কারণেই ফুটপাত থেকে রাস্তা পর্যন্ত দখল হয়ে গেছে। ফলে পথচারীদের হেঁটে চলাও কঠিন হয়ে পড়ছে। সড়ক সংকুচিত হওয়ায় তীব্র যানজট লেগেই থাকছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান শুক্রবার (৬ মার্চ) সন্ধ্যায় ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ফুটপাত-রাস্তা দখলমুক্ত করতে আমাদের মোবাইল কোর্ট প্রতিদিন চলমান। প্রতিদিন একাধিকবার করার পরও আবার তারা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। সকালে করলে বিকেলে বসছে, বিকেলে করলে পরদিন বসছে।’

শুধু সিটি করপোরেশনের পক্ষে দখলমুক্ত রাখা কঠিন বলেও মনে করেন এই কর্মকর্তা। ম্যাজিস্ট্রেটের ঘাটতি আছে বলেও তিনি জানান।

‘আসলে আমাদের দুজন ম্যাজিস্ট্রেট আছে। তারা প্রতিদিন মোবাইল কোর্ট করছেন। এটা দুজন দিয়ে সম্ভব না। তারপরও আমাদের যতটুকু সক্ষমতা আছে, তা দিয়ে আমরা চেষ্টা করছি,’ বলেন মোবাশ্বের হাসান।

h

শুক্রবার গুলিস্তান এলাকায় কোনো অভিযান হয়নি বলে জানান তিনি। তবে অন্যান্য জায়গায় অভিযান হয়েছে বলেও দাবি করেন।

ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা বলেন, ‘কোথাও না কোথাও অভিযান হচ্ছে। এটা (দখলমুক্ত করা) আসলে কঠিন। আমরা এককভাবে পারছি না। এটাই বাস্তবতা। আপনারা যারা আছেন, আপনাদেরও (গণমাধ্যম) এগিয়ে আসতে হবে।’

গরিবের মার্কেটে বিচাকেনা শুরু হয়নি

‘গরিবের মার্কেট’ হিসেবে খ্যাতি আছে গুলিস্তানের ফুটপাতের দোকানগুলোর। কিন্তু এখনো ক্রেতাদের ভিড় কম। মূলত পথচারীরাই দোকানগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন। অধিকাংশই শুধু দেখছেন। তবে ২৫ রমজান থেকে বেচাকেনা জমবে বলে আশা করছেন হকাররা।

সুন্দরবন স্কয়ার ও ঢাকা ট্রেড সেন্টারের মাঝে হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে জুতার পসরা সাজিয়ে বসেছেন সাইফুল। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঈদের বেচাকেনা নাই। ঈদের বেচাকেনা শুরু হতে আরও দেরি আছে।’

গুলিস্তান রাজধানী হোটেলের সামনে রাস্তার মাঝে টি-শার্ট বিক্রি করছেন সুমন। ১৫০ টাকা করে ডেকে বিক্রি করছেন তিনি। জানতে চাইলে তিনিও বলেন, ঈদের বিকিকিনি এখনও শুরু হয়নি। ‘শুক্রবার তো, তাই একটু ভিড়,’ বলেন তিনি।

গুলিস্তান সুপার মার্কেটের পাশের রাস্তায় প্যান্ট বিক্রি করছেন স্বাধীন নামের এক হকার। তিনি বলেন, ১৬–১৭ মার্চ থেকে ঈদের বিক্রি শুরু হবে।

জানতে চাইলে হকার্স মার্কেটের পাশে রাস্তায় বাচ্চাদের জামা নিয়ে বসা রানা বলেন, ‘বেচা নাই। এই সপ্তাহের শেষ দিক থেকে বেচা শুরু হইবো, আশা করতাছি।’

এএম/এআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর