- একদিকে বরণের প্রস্তুতি, অন্যদিকে বঞ্চিতদের তৎপরতা
- ভোল পাল্টানোর লড়াই, গদি হারানোর শঙ্কা
- সচিবালয়ের করিডোরে ‘বদলি’র হাওয়া
চব্বিশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে ঘটে ক্ষমতার পালাবদল। গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়। প্রায় দেড় বছর ধরে চলা এই প্রতিযোগিতা নতুন মোড় নিচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করতে যাওয়ার প্রাক্কালে এখানে একদিকে চলছে নতুন মন্ত্রীদের বরণের প্রস্তুতি, অন্যদিকে দাপুটে ও দলবাজ কর্মকর্তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।
বিজ্ঞাপন
২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের আমলের সুবিধাবাদী কর্মকর্তারা হয়ে পড়েন কোণঠাসা। অন্যদিকে ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন বিএনপি ও জামায়াতপন্থী কর্মকর্তারা। আলোচনা আছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রশাসনের চালিকাশক্তিতে ছিলেন জামায়াত-এনসিপির আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তারা। কিন্তু নির্বাচনে ভূমিধস বিজয় নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করায় এখন চওড়া হাসি বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের মুখে। অন্যদিকে কিছুটা চাপ বাড়ছে জামায়াতপন্থীদের মধ্যে।
সরেজমিন সচিবালয়ে একাধিক দফতর ঘুরে, একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপে এমন আভাস পাওয়া গেছে। বিশেষ করে বিগত সময় দাপুটে কর্মকর্তা হিসেবে যারা দফতর দাপিয়ে বেড়াতেন তাদের মধ্যে বদলি অথবা ওএসডি হওয়ার আতঙ্ক বিরাজ করছে।
বিশেষ করে রোববার বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহসানুল হকের সঙ্গে সাক্ষাতের পর কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। তারা দলীয় কর্মকর্তা নয়, দলনিরপেক্ষ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে দোসরমুক্ত প্রশাসনের দাবি জানিয়েছেন।
জানা গেছে, রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহসানুল হকের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ও শিল্পসচিব ওবায়দুর রহমান এবং সংগঠনের মহাসচিব ও পরিকল্পনা কমিশনের অতিরিক্ত সচিব মো. বাবুল মিয়ার নেতৃত্বে ২৫ থেকে ৩০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বৈঠক করে। বৈঠকে প্রশাসনের সংস্কার এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানানো হয় জনপ্রশাসন সচিবের কাছে।
বিজ্ঞাপন
প্রভাবশালীদের মধ্যে অস্থিরতা
আওয়ামী লীগ বিদায়ের পর অন্যান্য জায়গার মতো সচিবালয়ের দফতরগুলোতে আসতে থাকে নতুন মুখ। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে, দীর্ঘদিনের বঞ্চিত কর্মকর্তারা দাবি আদায়ে রীতিমতো কর্মসূচি পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে যেসব কর্মকর্তা প্রশাসনের কেন্দ্রে দাপট দেখিয়েছেন তাদের মধ্যে নতুন সরকার আসায় চরম উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, প্রশাসনের ভেতরে থাকা ‘বর্ণচোরা’ কর্মকর্তারা নিজেদের অবস্থান টেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। অনেকে ছাত্রজীবনে ‘ছাত্রদল’ করার প্রমাণ খুঁজতে ব্যস্ত কিংবা প্রভাবশালী বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। কেউ আবার সংসদ সদস্য হয়েছেন তাদের সঙ্গে নিজেদের ঘনিষ্ঠতার কথা সহকর্মীদের সঙ্গে জানান দিচ্ছেন।
সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনে রদবদলের ঘটনা নতুন নয়। তবে এবারের নির্বাচনের পর প্রশাসনের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বড় রদবদলের সম্ভাবনা আছে এমন গুঞ্জন সচিবালয়জুড়ে। যেকোনো সময় বদলি বা ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হতে পারেন এমন গুঞ্জনও চলছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘কে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন, কাকে রাখবেন আর কাকে অন্যত্র যেতে হয়, সেটা নিয়ে অনেকেই চিন্তিত। কিন্তু সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে এটা মেনে নেওয়ার মানসিকতা আছে। কারণ কোনো দফতরই আমার জন্য নির্ধারিত নয়।’
এদিকে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এর আগে একাধিকবার প্রশাসনের মধ্যে ঘাঁপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগ ঘেঁষা কর্মকর্তাদের অপসারণের দাবি জানানো হয়। বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকেও এর আগে জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
বরণের প্রস্তুতির সঙ্গে চলছে দাবি-দাওয়া নিয়ে বৈঠক
এদিকে নতুন মন্ত্রীদের বরণের প্রস্তুতি যখন একদিকে চলছে সচিবালয়ে তখন কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের একাংশ নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট বৈঠক করছেন। তাদের মূল আলোচনার বিষয় হলো-নতুন মন্ত্রীদের কাছে কী কী দাবি উত্থাপন করা হবে। বিশেষ করে যারা বিগত সময়ে পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন বা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন, তারা এখন ‘পাওনা’ বুঝে নিতে সোচ্চার হচ্ছেন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নতুন মন্ত্রী হিসেবে কে আসবেন জানি না, তবে আমাদের কিছু দাবি দাওয়া নিয়ে নিজেরা মিটিং করেছি। বিগত দিনে কী হয়েছে, কারা কী করেছে সেসব তুলে ধরব আমরা।’
এদিকে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. বাবুল মিয়া জনপ্রশাসন সচিবের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে বলেন, ‘দোসর কর্মকর্তাদের অপসারণ ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতিসহ পদায়নের দাবি জানিয়েছি। বলেছি, ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ও আমরা বঞ্চিত ছিলাম। এমনকি গত দেড় বছরেও বঞ্চিত করা হয়েছে। কোনো দলীয় দোসর চাই না। দলনিরপেক্ষ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে দোসরমুক্ত প্রশাসন চাই।’
জনপ্রশাসন সচিব দাবি-দাওয়ার বিষয় প্রশাসনের শীর্ষ মহলকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
ইতোমধ্যেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নাসিমুল গনিকে নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগকে প্রশাসনে রদবদলের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নতুন এই পরিবর্তনের ফলে অনেক প্রভাবশালী কর্মকর্তার ফাইল এখন গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছে বলেও চাউর আছে।
বিইউ/জেবি

