বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) রেসিডেন্ট চিকিৎসক হলে তালা ভেঙে বেশ কয়েকটি কক্ষ দখলের চেষ্টা ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বেলা আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ব্লক ভবনে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় বহিরাগতসহ অন্তত ২০ জন চিকিৎসকের নেতৃত্বে ভবনের পঞ্চম তলার অন্তত ছয়টি কক্ষের তালা ভাঙা হয়।
ওই কক্ষগুলোতে জামায়াতপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) সংশ্লিষ্টরা থাকেন। বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ডা. এম আর হাসান দখলের ঘটনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক নন।
বিজ্ঞাপন
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়টির অস্থায়ী এই হল দখলে রেখেছিলেন আওয়ামীপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নেতাকর্মীরা। এ সময় হলে অবৈধ কার্যকলাপেও তারা জড়িয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) ও জামায়াতপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) মাঝে আসন ভাগাভাগি করে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর মধ্যে বড় অংশ ড্যাবের দখলে রয়েছে।
কক্ষগুলোতে থাকা চিকিৎসকদের অভিযোগ, দুপুর ২টা ২৫ মিনিটের দিকে একদল বহিরাগতসহ কয়েকজন চিকিৎসক এসে এ ব্লকের ছয় তলার একটি ব্লকের তালা ভেঙে ঢুকেন। তারা তালা ভাঙার বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে এসেছিলেন। ওই ব্লকে প্রবেশ করে বিভিন্ন কক্ষের তালা ভাঙার চেষ্টা করেন। এ সময় ৬টি কক্ষের তালা ভাঙতে সক্ষম হন তারা। এ সময়ে ব্লকের সবাই ডিউটিতে ছিলেন। তারা খবর পেয়ে ফিরে এলে দুই দলে বাগবিতণ্ডা হয়। এ সময় তাদের আগামীকালের মধ্যে কক্ষ ছেড়ে দিতে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়।
হুমকিদাতারা বিএনপিপন্থি হওয়ায় ভুক্তভোগী চিকিৎসকরা সংবাদমাধ্যমে নিজেদের নাম প্রকাশ করতে অপারগতা প্রকাশ করছেন। ওই ব্লকের একজন আবাসিক চিকৎসক বলেন, খবর পেয়ে আমরা দ্রুত আসি। তারা আমাদেরকে হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। কক্ষ ছেড়ে যেতে বলে। গায়েও হাত তোলার চেষ্টা করে। রেসিডেন্টদের শারীরিকভাবে হেনস্তা করে। মোটামুটি সাড়ে ৩টা পর্যন্ত তারা এগুলো করেছে। যারা আসছিল, বেশিরভাগই বাইরের, কয়েকজন টোকাইও ছিল তাদের সঙ্গে। এজন্য সবাইকে আইডেন্টিফাই করা যায়নি।
এই চিকিৎসক জানান, দখলের চেষ্টা ও হেনস্তায় জড়িতদের ৪-৫ জনকে তারা শনাক্ত করতে পেরেছেন। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন ড্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদক ডা. এম আর হাসান। তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট চিকিৎসক নন। পড়াশোনা করেছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ থেকে এবং তার সেশন ২০০৭-০৮। ঘটনায় জড়িত অন্যান্য চিকিৎসকদের মধ্যে ডা. মাহিন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের ১০-১১ সেশনের। ডা. সামাহিলও একই মেডিকেলের ২০০৯-১০ সেশনের ছাত্র, তিনি বিএমইউর ইউরোলজি বিভাগের রেসিডেন্ট। এ ছাড়া ডা. শোয়েব ও ডা. শৈবাল শেরে বাংলা মেডিকেলের।
ভুক্তভোগী এক চিকিৎসক বলেন, আমাদের পাঁচটি কক্ষের তালা ভাঙা হয়েছে। তালা ভাঙার পর তারা আসবাপত্রও ভাঙচুর করেছে। পরে আমরা দেখেছি আমাদের দুটি ল্যাপটপ, আর তিনটা মোবাইল হারানো গেছে। আসলে তাদরে সাথে টোকাইরা ছিল। তিনি বলেন, আমরা যখন ডিউটি থেকে সবাই চলে আসছি, তখন ওরা হুমকি-ধামকি দিয়ে চলে গেছে যে কালকে আবার আসবে। এর মধ্যে আমাদের রুম ছেড়ে দিতে হবে, না হলে আমাদেরকে দেখে নিবে, মারধর করবে। তারা কয়েকজন ডাক্তারকে শারীরিকভাবে হেনস্থা করেছে। যারা গায়ে হাত দিয়েছে, এদেরকে আসলে আমরা আইডেন্টিফাই করতে পারিনি কারণ মাস্ক পরা ছিল। অফিস টাইম শেষ হয়ে যাওয়ায় আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে মৌখিকভাবে বলেছি। আগামীকাল লিখিত অভিযোগ দিব।
ভুক্তভোগী আরেক চিকিৎসক বলেন, তারা আমাদের বলছিল যে মবতন্ত্র আর চলবে না। এর মধ্যে লিডিং যারা ছিল, তারা কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসিডেন্ট না। কিছু ছিল রেসিডেন্ট। তারা আমাদের হুমকি দিয়েছে, তবে আমরা রুম ছাড়ব না। আগামীকাল অফিশিয়ালি প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করব।
হুমকি-ধমকি ও কক্ষ দখলের চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করে ড্যাবের আইন বিষয়ক সম্পাদক ডা. এম আর হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, এতদিন কিছু সাধারণ রেসিডেন্ট বাইরে থাকত, আর কিছু লোক পুরো একটা ব্লক দখল করে আছে। ওই রুমগুলো ফাঁকা, তারা রুম দখল করে রেখেছে। পিজির রেসিডেন্ট না এরকম অনেক লোকজনও ব্লক দখল করে আছে। আজকে সাধারণ চিকিৎসকরা গিয়ে দেখে পুরো ব্লকে তালা মারা। ধরেন, আপনার একটা রুম আছে, আপনি আপনার সেই রুমটাকে সিকিউর করবেন। আপনি তো পুরো হলটাকে তালা মেরে রাখতে পারেন না।
এম আর হাসান বলেন, ওখানে আমাদের সাধারণ রেসিডেন্টরা যখন গেছে, তখন যারা রুম আর ব্লক দখল করে আসছে, ওরা তাদের পরে হামলে পড়েছে। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ছিলাম। আমাদের ছোট ভাইয়েরা যখন আমাদের ফোন দিল যে— ভাই আমাদের তো ব্লক দখল করে আমাদের ওপরে চড়াও হচ্ছে; তখন আমরা সেখানে গিয়েছি যেন একটা সমতা নিশ্চিত করা যায়। কারণ এই বাংলাদেশ সবার। তবে ওখানে ড্যাবের তরফ থেকে কেউ যায়নি। ড্যাবের কেউ ছিল না। আমরা ঘটনা জানার পর বিএমইউর বটতলায় যাই। সেখানে তাদের ওই রুমের লোকজনের সঙ্গে আমাদের কথা হয়।
বিকেল সোয়া ৪টার দিকে ডক্টরস হলের ভারপ্রাপ্ত প্রভোস্ট ডা. জামাল উদ্দীন আহমদ গণমাধ্যমকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, উভয় গ্রুপের সঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে বিষয়টির সমাধান করা হবে।
এসএইচ/ক.ম

