- প্রচারণা শুরুর পর কোথায় কোথায় সংঘর্ষ হয়েছে
- তফসিল ঘোষণার পর ১৪৪ সহিংসতার ঘটনা
- এক প্রার্থীর সঙ্গে আরেক প্রার্থীর গণতান্ত্রিক দূরত্ব: বিশেষজ্ঞদের মত
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর শেরপুরে ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে জামায়াত ও বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম নিহত হন। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ দুই পক্ষের প্রায় দুই শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এ ছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথাযথ তৎপরতার ঘাটতি থাকায় এমন সহিংসতা ঘটছে বলে বিশেষজ্ঞদের দাবি।
বিজ্ঞাপন
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বিকেল ৩টার দিকে ঝিনাইগাতী উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-৩ আসনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের নিয়ে আয়োজিত নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
বুধবার রাতে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম জানান, রাত ১০টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেজাউল করিম মারা যান। তিনি বলেন, হামলা-পাল্টা হামলার একপর্যায়ে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিমকে মাথায় ও কানের নিচে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। পরে তিনি মারা যান। তবে হামলার দায় নিয়ে জামায়াত ও বিএনপি একে অপরকে দায়ী করছে।
সংঘর্ষে নেতাকর্মী আহত হওয়ার প্রতিবাদে রাতে শেরপুর শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে জেলা জামায়াতে ইসলামী।
বিজ্ঞাপন
শেরপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) কামরুল ইসলাম বলেন, মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় তাকে শেরপুর থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। আমরা তার মৃত্যুর খবর পেয়েছি।
এ ঘটনার পর শেরপুর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সংঘর্ষের প্রতিবাদে শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জরুরি সংবাদ সম্মেলনের ডাক দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
যেভাবে ঘটল ঘটনা
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল ইসলাম রাসেল এবং ঝিনাইগাতী থানার ওসি নাজমুল হাসানসহ সংশ্লিষ্টরা ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠান শুরুর অপেক্ষায় ছিলেন। অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের নেতাকর্মীরা আগে থেকেই সামনের সারিতে বসেন। তবে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল দেরিতে পৌঁছান।
বিএনপির নেতাকর্মীরা সামনের সারিতে বসতে না পেরে ক্ষুব্ধ হন। তারা ইউএনওকে আসন অর্ধেক ভাগ করে দেওয়ার দাবি জানান। ইউএনও জামায়াত প্রার্থীকে কিছু আসন ছাড়ার অনুরোধ করেন। প্রার্থী মাইকে কর্মীদের আসন ছাড়তে বললেও সমর্থকরা সামনের সারির অর্ধেক আসন ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। এ নিয়ে বাগবিতণ্ডা শুরু হয় এবং একপর্যায়ে চেয়ার ছোড়াছুড়ি ও সংঘর্ষে রূপ নেয়। কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানমঞ্চ লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।
এরপর বিএনপির নেতাকর্মীরা স্টেডিয়াম থেকে বের হয়ে ঝিনাইগাতী বাজারে অবস্থান নেন। মাঠে থাকে জামায়াতের প্রার্থী ও সমর্থকরা। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক স্ট্যাটাস ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে বাজারে প্রবেশ করলে দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী ও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। সংঘর্ষের সময় জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম পিছিয়ে পড়লে তাকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
জামায়াত-বিএনপির অন্যান্য সংঘর্ষ
২০ জানুয়ারি রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকায় জামায়াত ও বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন আহত হন।
লালমনিরহাট-১ আসনের হাতীবান্ধায় নির্বাচনী গণসংযোগকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন।
২০২৪ সালের ২১ ডিসেম্বর গাইবান্ধার সাঘাটায় সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন।
২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার মিরপুরে সংঘর্ষে জামায়াত কর্মী খোকন মোল্লা নিহত হন।
তফসিল ঘোষণার পর সহিংসতা
পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে ১৪৪টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, হুমকি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, আমাদের দেশে নির্বাচনী সংঘাতের অন্যতম কারণ হলো এক প্রার্থীর সঙ্গে আরেক প্রার্থীর গণতান্ত্রিক দূরত্ব। প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকেই সহিংসতা সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন, সংঘর্ষপ্রবণ জেলাগুলো চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। শুধু কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়ে সহিংসতা বন্ধ করা যাবে না।
এম/এআর

