ভৌগোলিক দুর্গমতা ও নিরাপত্তার নামে ‘অহেতুক’ তল্লাশির কারণে আদিবাসী ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন আদিবাসী নেতারা। ভোটকেন্দ্র বসবাসের স্থান থেকে দূরে হওয়া ও ভোটের আগে-পরে ৪৮ ঘণ্টা যোগাযোগের বাহন নিষিদ্ধ থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধিকাংশ আদিবাসী ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হবেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর–রুনি মিলনায়তনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন নেতারা। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে আদিবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দাবিও করেছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের যুগ্ম সমন্বয়কারী অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম চৌধুরী। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন আরেক যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন। এসময় এএলআরডির (অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, আদিবাসী অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমিলা, দিপায়ন খীসা প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের দূরবর্তী পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী আদিবাসী ভোটারদের জন্য ভোটকেন্দ্রে যাতায়াত একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভোটকেন্দ্র অনেক দূরে হওয়ায় এবং ভোটের আগে ও পরে ৪৮ ঘণ্টা সব ধরনের যোগাযোগের বাহন নিষিদ্ধ থাকায় তারা কার্যত ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন না। বিশেষ করে রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই হ্রদ তীরবর্তী এলাকাগুলোর আদিবাসীরা নৌযানের ওপর নির্ভরশীল হলেও নির্বাচনের সময় এই নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় তারা ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত হন।
লিখিত বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে কেবল ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী বাদ পড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে নিরাপত্তাবাহিনীর অযথা তল্লাশি ও হয়রানির অভিযোগে অনেক ভোটার ভোট প্রদানে আগ্রহ হারান।’ তিনি এসব ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত বিধিনিষেধ শিথিল করার আহ্বান জানান।
বিজ্ঞাপন
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি পক্ষ থেকে বেশকিছু দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-
১. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে এই চুক্তির দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন করা।
২. পাহাড়ে সামরিক কর্তৃত্ব ও পরোক্ষ সামরিক শাসনের স্থায়ী অবসান করতে হবে।
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ সমূহকে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিকীকরণ ও স্থানীয় শাসন নিশ্চিতকরণে পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক যথাযথ ক্ষমতায়ন করা।
৪. পার্বত্য ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকরের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উদ্ভাস্তু ও ভারত থেকে প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের পুনর্বাসন করে তাদের ভূমি অধিকার নিশ্চিত করা।
৫. দেশের মূলস্রোতধারার অর্থনৈতিক সংগতি ও টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা।
৬. ইউনিয়ন পরিষদসহ সব স্তরের স্থানীয় সরকারে সমতলেরর আদিবাসীদের জন্য বিশেষ আসন সংরক্ষণ ও আদিবাসী জনগণের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৭. সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করা।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৮ বছর পার হলেও এখনও মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়িত হয়নি।
সংগঠনের নেতা জাকির হোসেন বলেন, ‘দেশে প্রায় ৫৪টির বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বসবাস করেন, যার বড় একটি অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে। দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসানে বিভিন্ন সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় এ অঞ্চলে এখনো অস্থিরতা ও প্রান্তিকতা রয়ে গেছে।’
এএইচ/এএম

