রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় গত ২৬ অক্টোবর মেট্রোরেলের পিলারের বিয়ারিং প্যাড বিচ্যুত হয়ে খুলে পড়ার ঘটনায় শরীয়তপুরের বাসিন্দা আবুল কালাম (৩৫) নামের এক পথচারীর মৃত্যু হয়েছিল। এই দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দুর্ঘটনার মূল কারণ চিহ্নিত করেছে সেতু বিভাগের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি।
দুর্ঘটনার পরই সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফের নেতৃত্বে একটি পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
বিজ্ঞাপন
কমিটিতে ছিলেন- বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এ বি এম তৌফিক হাসান, এমআইএসটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জাহিদুল ইসলাম, ডিএমটিসিএল লাইন-৫-এর প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব এবং সদস্য সচিব উপসচিব আসফিযা সুলতানা। পরবর্তীতে প্রধান প্রকৌশলী, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এছাড়াও দুইজন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক, ড. খান মাহমুদ আমানত ও ড. রাকিব আহসান এবং ফরেনসিক প্রতিনিধি মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, এসএসপি, সিআইডি, বাংলাদেশ পুলিশও কমিটিতে যুক্ত হন।
আরও পড়ুন: ফার্মগেটে মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড পড়ে পথচারীর মৃত্যু
কমিটি দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন, প্রত্যক্ষদর্শী, ট্রেন চালক, অপারেটর ও মেট্রোরেল কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং বিয়ারিং প্যাড প্রস্তুতকারক, ঠিকাদার ও ডিজাইন পরামর্শকদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছে। এছাড়া প্রাপ্ত ডিজাইন ডকুমেন্ট, অন্যান্য উপাত্ত ও প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। কমিটি ট্রেন চলাকালীন সময়ে কম্পন পরিমাপসহ ল্যাবরেটরি টেস্ট পরিচালনা করেছে।
তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাডের হার্ডনেস, কম্প্রেশন সেট ও নিওপ্রিন কন্টেন্ট প্রচলিত স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সঠিক ছিল না। বিয়ারিং প্যাডগুলো কিছুটা ঢালু অবস্থায় (০.৮% স্লোপ) বসানো হয়েছিল, যা বিচ্যুতিতে প্রভাব ফেলেছে। ফার্মগেট স্টেশনের উভয় প্রান্তে বৃত্তাকার এলাইনমেন্ট থাকায় কার্ড এলাইনমেন্টের জন্য পৃথক মডেলিং ও এনালাইসিস করা হয়নি, ফলে অযাচিত পার্শ্ববল ও কম্পন দেখা দিয়েছে। এছাড়া মধ্যবর্তী স্থানে রিজিড ট্র্যাক বসানোর কারণে ভাইব্রেশন বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কমিটি দশটি সভা করে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের পূর্ববর্তী দুর্ঘটনার তদন্তও পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধান থেকে প্রতীয়মান হয়, পূর্বের তদন্তে উল্লেখিত কারণগুলোর মধ্যে কোনোটি নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।
তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার সঙ্গে নাশকতামূলক কর্মকান্ডের কোনো যোগসাজশ পায়নি।
আরও পড়ুন: মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড পড়ে নিহতের ঘটনায় স্ত্রীর মামলা
তদন্ত কমিটি মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষকে কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছেন। কমিটির সুপারিশগুলো হলো-
১। ভবিষ্যতে বিয়ারিং প্যাড যাতে সরে না যায় সেজন্য যথাযথ কারিগরী ব্যবস্থা গ্রহণ।
২। থার্ড পার্টি ইন্ডিপেন্ডেন্ট কনসালট্যান্টের মাধ্যমে ভায়াডাক্টের স্ট্রাকচারাল ও ট্র্যাক ডিজাইনের বিস্তারিত পর্যালোচনা।
৩। মেট্রোরেল প্রজেক্টের সার্বিক ডিজাইনের ওপর থার্ড পার্টি সেফটি অডিট পরিচালনা।
৪। কার্যকর ও যথাযথ স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম দ্রুত স্থাপন।
৫। মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় বিশেষজ্ঞ ও বিদেশি পরামর্শকের মাধ্যমে প্রযুক্তি স্থানান্তর নিশ্চিতকরণ।
এএইচ/এআর

