শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

ঢাকায় থেমে নেই ছিনতাই, গোয়েন্দা তালিকা ধরে চলছে অভিযান

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:০৫ এএম

শেয়ার করুন:

ঢাকায় থেমে নেই ছিনতাই, গোয়েন্দা তালিকা ধরে চলছে অভিযান
ঢাকায় থেমে নেই ছিনতাই, গোয়েন্দা তালিকা ধরে চলছে অভিযান

গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজধানীজুড়ে বেড়েছে অপরাধের পরিমাণ। এর মধ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে। এতে অনিরাপত্তা বোধ করছেন নগরবাসী। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তৎপর রয়েছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) প্রতিদিন গড়ে অন্তত ১০ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করছে। এরপরও কমছে না ছিনতাই।

ডিএমপির তথ্যমতে, গত কয়েক মাসে কয়েক শ ছিনতাইকারী গ্রেফতার হয়েছে পুলিশের হাতে। এছাড়া র‌্যাব ও ডিবিও ধরছে। এরপরও থেমে নেই ছিনতাইকারীরা। এবার পুলিশ গোয়েন্দা তালিকা ধরে অভিযান শুরু করেছে।

পুলিশের ভাষ্য, ছিনতাইকারীরা কারাগারে যাওয়ার পর আবারও জামিনে বেরিয়ে আসছে। এরপর তারা আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। আদালত তাদের জামিন দিলে পুলিশের করার কিছু থাকে না।

6
ছিনকারীদের কবল থেকে এক তরুণীর পালানোর চেষ্টার ভিডিও ধরা পড়ে সিসি ক্যামেরায়

জানা গেছে, সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুর, গাবতলী রোড, সদরঘাট,  সায়েদাবাদ, সংসদ ভবন, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, ফার্মগেট, লালমাটিয়া, মগবাজার, হাতিরঝিল, গুলশান, পুরান ঢাকা, ধানমন্ডি, শাহবাগ, উত্তরা, মুগদা, বনশ্রী, হাজারীবাগ, লালবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। তবে সব খবর মিডিয়ায় আসে না এবং ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করতে চান না। ফলে বেশির ভাগ ঘটনাই চাপা পড়ে যাচ্ছে।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন পুলিশের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার ব্যক্তিদের বেশির ভাগই থানায় অভিযোগ করেন না। ফলে নগরীতে কতটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে তার সঠিক পরিসংখ্যান থাকে না পুলিশের খাতায়।

সম্প্রতি ধানমন্ডি, মগবাজার, হাতিরঝিল, মোহাম্মদপুর এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশ আলোচিত হয়েছে। এসব এলাকায় সড়ক বা ফুটপাত ধরে রাতের আঁধারে কেউ চলাচল করলেই তাদের সব কিছু কেড়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে ছিনতাইকারীরা।

7
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে হরহামেশাই ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। ছবি: সিসিটিভির ফুটেজ থেকে নেয়া

ঘটছে একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনা

গত ১০ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টার দিকে নবীনগর হাউজিংয়ের ১৬ নম্বর সড়কে ছিনতাইয়ের চেষ্টার সময় দুজনকে ধরে স্থানীয় লোকজন গণপিটুনি দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই একজন নিহত হন এবং অপরজন গুরুতর আহত হন।

এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে কয়েকজন ছিনতাইকারী নবীনগর ও বসিলা ৪০ ফিট এলাকার খালের সাঁকোর কাছে দেশীয় ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছিনতাই করতে যায়। ভোর ৪টায় দ্বিতীয় দফায় ছিনতাই করতে এলে স্থানীয়রা ঘেরাও করে চার ছিনতাইকারীকে আটকে গণপিটুনি দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাদের উদ্ধার করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন।

তার আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলায় দিনেদুপুরে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। পরে সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, মাত্র ১১ সেকেন্ডে ঘটনাটি ঘটে। একটি বাসার নিচে এক যুবক তার হাতে থাকা মোবাইল ফোন চাপছিলেন।

সেখানে দুই যুবক দৌড়ে এসে তাকে ঘিরে ধরে। তারা চাপাতি ঠেকিয়ে তাকে জিম্মি করে ফেলে। এরপর তার কাছে থাকা মোবাইলফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়। এ ঘটনার পর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকা থেকে রোমান মিয়া (২০) নামে একজনকে পুলিশ গ্রেফতার করে।

8
শ্যামলীতে ছিনতাইয়ের দৃশ্য- যুবকের পোশাক-জুতাও খুলে নেয় ছিনতাইকারীরা। সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়া ছবি

গত ২৩ জুলাই মোহাম্মদপুরে মোবাইল ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে এক সংবাদকর্মী ফেসবুক পোস্ট দেন। পরে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করে। তারপর ২৬ জুলাই মোহাম্মদপুরের বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে প্রাণ যায় রাব্বি সুমন (২৬) নামে এক যুবকের। সুমন সাইনবোর্ড এলাকায় থাকতেন। ঘটনার দিন তার বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন।

গত ১১ সেপ্টেম্বর কামরাঙ্গীরচরের মুন্সিহাটি মুড়ির ফ্যাক্টরির সামনে নিহত আকরাম হোসেন অটোরিকশায় যাত্রীদের নিয়ে পৌঁছান। এ সময় যাত্রীবেশী ছিনতাইকারীরা তার কাছ থেকে নগদ দেড় হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় এবং অটোরিকশাটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। কিন্তু আকরাম এতে বাধা দিলে তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ঘাড়ের ডান পাশে ও পিঠে আঘাত করে। তার চিৎকারে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায়। পরে আশপাশের লোকজন এসে আকরামকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরদিন সন্ধ্যায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আকরাম। পরে কামরাঙ্গীরচর থানায় একটি হত্যা মামলা হয়। সেই মামলায় ঘটনার সাত দিন পর পুলিশ দুজনকে গ্রেফতার করে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছেন, রিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশেই তারা সেই চালককে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার চিৎকারে তারা সেই কাজ সারতে পারেননি।

গোয়েন্দা তালিকা ধরে চলছে অভিযান

জানা গেছে, গত এক বছরে রাজধানীতে যেসব ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে সেগুলো পর্যালোচনা করে মাঠে কাজ করছেন গোয়েন্দারা। তারা ইতোমধ্যে একটি খসড়া তালিকাও তৈরি করেছেন। সেই তালিকা ধরে ধরে থানায় থানায় অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। তবে ছিনতাইকারীদের ধরতে নগরবাসীর কাছেও পুলিশ নানাভাবে সহযোগিতা কামনা করছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের ডিসি মুহাম্মদ তালেবুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, ঢাকায় ছিনতাই প্রতিরোধে প্রতিনিয়ত কাজ করছে পুলিশ। ঢাকার রাস্তাগুলোতে টহল বাড়ানো হয়েছে। থানাভিত্তিক ছিনতাইকারীদের তালিকা প্রস্তুত করে সেই অনুযায়ী গ্রেফতার চলছে।

ঢাকায় ছিনতাইকারীদের নতুন করে কোনো তালিকা করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঢাকায় নতুন করে ছিনতাইকারীদের তেমন কোনো তালিকা করা হয়নি। তবে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা যেসব তালিকা করেছেন পুলিশ সেই তালিকা ধরে ধরে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করছে।

এমআইকে/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর