শুক্রবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৪, ঢাকা

নাওডোবা যেভাবে ‘শহর’ হয়ে উঠল

আসাদুজ্জামান লিমন
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২২, ০৯:৩১ এএম

শেয়ার করুন:

নাওডোবা যেভাবে ‘শহর’ হয়ে উঠল

একসময় ছিল অবহেলিত জনপদ। চলাচলের জন্য ছিল তেমন রাস্তা-ঘাট। স্কুল-কলেজ থাকলেও তা ছিল অনেক দূরে। বাজার-সদাই করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পায়ে হেঁটে যেতে হতো বাজারে। সেই জনপথ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মজা পুকুর, ডোবা আর খানাখন্দে ভরা অবহেলিত সেই জনপথ এখন ক্রমশ শহর হয়ে উঠছে। গল্পটি শরীয়তপুরের জাজিরা নাওডোবা ইউনিয়নের।

এই ইউনিয়নের ফকিরকান্দিকে দুই ভাগ করে নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশের গর্বের পদ্মা সেতু। সেতুর দুই প্রান্তের একটি মাওয়াতে। অন্যটি নাওডোবায়। সেতুতে ঘিরে সেখানে এখন বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। সেতুর নিরাপত্তায় সেখানে তৈরি হয়েছে ক্যান্টনমেন্ট। নাম শেখ রাসেল সেনানিবাস। সেখানে বসবাসকারী সেনা সদস্য ও অফিসারদের ছেলে-মেয়েদের জন্য নির্মিত হচ্ছে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল। এছাড়াও নাওডোবায় নতুন একটি থানাও হয়েছে। পদ্মা সেতু উত্তর থানা নামে যেটি পরিচিতি পেয়েছে। জাজিরাপ্রান্তে সেতুকে ঘিরে নাওডোবার পুরো চিত্রই যেনো বদলে গেছে, যাচ্ছে। কর্দমাক্ত মাটির রাস্তা প্রশস্ত হয়ে কালো পিচের প্রলেপ লেগেছে। আগে গ্রামটির যে দৈন্যদশা ছিল এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলেছে। বাঁশ, কাঠ আর টিন তৈরি ঘর-বাড়িগুলোও যেনো রাতারাতি বদলে যাচ্ছে। এখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এক বা একাধিক পাঁকা ঘর।


বিজ্ঞাপন


jajiraপদ্মা সেতুর জন্য অধিগ্রহণকৃত জমির মূল্য বাবদ মোটা অংকের অর্থ পেয়েছেন নাওডোবার বাসিন্দারা। সেই অর্থ দিয়ে কিনেছেন নতুন জমি। নির্মাণ করেছেন বাড়ি-ঘর। জাজিরাপ্রান্তে পদ্মা সেতু প্রকল্পের সঙ্গে যেসব দেশ-বিদেশি ইঞ্জিনিয়ার ও শ্রমিকরা কাজ করছেন তারা অস্থায়ী নিবাস তৈরি করে থাকছেন ওই এলাকায়ই। ফলে নাওডোবার ফকিরকান্দি এলাকায় মুদি-মনিহারির দোকান-পাট বেড়েছে। এসব দোকানে বিদেশে পণ্যও মিলছে। বিশেষ করে চীনা শ্রমিকদের নিত্যদিনের নানা কিছুই এখানে মিলছে। যার সুফল পাচ্ছেন স্থানীয়রা।

ফকিরকান্দি বাজারের বাসিন্দা নুরু মিয়া জানান, পূর্বপুরুষ ধরে তারা সেখানে বসবাস করছেন। পদ্মা বিধৌত এলাকা হওয়ায় বাদাম ছাড়া আর কিছুই চাষ হতো না এই গ্রামে। বর্ষায় কিছু পাট চাষ হলেও ধান তেমন হতো না। কৃষি অর্থনীতি বলতে এটুকুই। তাদের বেশ কিছু জমি পদ্মা সেতুর জন্য অধিগ্রহণ হয়েছে। এজন্য ক্ষতিপূরণও পেয়েছেন।

পূর্ব নাওডোবা পুনর্বাসন কেন্দ্রে অনেকেই বসতবাড়ি পেয়েছেন। সঙ্গে টাকাও। কেউ কেউ সেখানে থাকছেন। কেউবা আবার ক্ষতিপূরণের টাকা দিয়ে নতুন করে জায়গা-জমি কিনেছেন। ভালোই আছেন তারা। একসময় নাওডোবা পদ্মার ভাঙন কবলিত এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। সেতুর নদীশাসনের কারণে বর্ষায় আর আতঙ্কে তাদের দিন কাটাতে হবে না। মাইলের পর মাইল পদ্মার পর কংক্রিটে ব্লক ফেলে বাঁধানো হয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থারও অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে এলাকাটিতে। আগে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে বালুময় এবড়ো-খেবড়ো পথ পাড়ি দিয়ে পদ্মার উজানে কাওরাকান্দি ঘাটে যেতে হতো। নিত্যদিনের বাজার-সদাই করতে। এরপর ঘাট সরে আসে কাঁঠালবাড়িতে, সর্বশেষ ফেরি ও লঞ্চ ঘাট জায়গা নিয়েছে বাংলাবাজারে।

naodobaএছাড়াও নাওডোবার বাসিন্দারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে কয়েক মাইল ভাটিতে মঙ্গলমাঝির ঘাট এলাকায় যেতেন। এখন আর তাদের বহুদূরের পর পাড়ি দিতে হয় না। পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তের টোল প্লাজা সংলগ্ন এলাকায়ই গড়ে উঠেছে হাটবাজার। স্থানীয়দের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ, প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা সেখান থেকে কেনাকাটা সারেন।


বিজ্ঞাপন


জাজিরা প্রান্তের সেতুর অ্যাপ্রোচ রোডের পাশেই গড়ে উঠছে পদ্মা পুলিশ একাডেমি, রেস্ট হাউজ, রিসোর্ট, চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, ও বিভিন্ন ধরনের খাবারের হোটেল। জাজিরায় শেখ রাসেল সেনানিবাস নির্মাণের আগে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে এখানে পদ্মা সেতুর সার্ভিস এরিয়া তৈরি করা হয়। সার্ভিস এরিয়ায় রয়েছে ব্যারাক, অফিসারদের থাকার আবাসন এবং দৃষ্টিনন্দন মসজিদ।

naodobaএদিকে পদ্মা সেতুর জাজিরা টোল প্লাজা থেকে সোজা একটি রাস্তা গেছে ফরিদপুরের ভাঙ্গার দিকে। যে সড়কটির একটি অংশ অ্যাপ্রোচ রোড নামে পরিচিত। শিবচর থেকে শুরু হয়েছে এক্সপ্রেসওয়ে। এই অ্যাপ্রোচ রোডের দুই পারে শত শত নতুন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। যার বেশিরভাগই হাইওয়ে রেস্তোরাঁ, অবকাশযাপন কেন্দ্র। স্থানীয়রা স্বপ্ন দেখছেন সেতু চালু হলে ঢাকা থেকে এখানে দর্শনার্থীরা আসবেন। তাদের পণ্য ও সেবা নেবেন। যা তাদের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখবে।

পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের বেপারীকান্দি গ্রামের বাসিন্দা ইসহাক সরদার বলেন, পদ্মা সেতু হওয়ার আগে এখানকার জমিজমার তেমন দামই ছিল না। বেচতে গেলে কাস্টমারই পাওয়া যাইত না। এখন সেই জমি নিয়াই কাড়কাড়ি। কে আগে কিনব সেটা নিয়া চলছে জোরাজুরি।

ইসহাক সরদার আরও বলেন, ‘পদ্মা সেতু আমাগো নাওডোবা গ্রামটাকে শহর বানাই দিছে।’

naodobaএদিকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ প্রায় শতভাগ শেষ। সেতু নির্মাণের বড় ধরনের সব কাজই শেষ। এখন চলছে ফিনিশিংয়ের কাজ। যা এই সপ্তাহেই শেষ হবে বলে পদ্মা সেতু প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আশাবাদী। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ২৫ জুন শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য এবং দেশ-বিদেশের অতিথিদের নিয়ে স্বপ্নের সেতুটির উদ্বোধন করবেন।

সেদিন সকাল ১০টায় সেতুর মাওয়া প্রান্তে উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করবেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী সুধী সমাবেশ বক্তব্য দেবেন। এরপর সেতুতে টোল দিয়ে পদ্মা পার হবেন। ওপারে গিয়ে আরও একটি উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করবেন। এরপর মাদারীপুরের শিবচরের বাংলা বাজার ঘাটে জনসমাবেশে অংশ নেবেন। উদ্বোধনের পরদিন ভোর ছয়টা থেকে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে দেশের দীর্ঘতম সেতুটি।

setuউল্লেখ্য, পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য (পানির অংশের) ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। তবে ডাঙার অংশ ধরলে সেতুটির মোট দৈর্ঘ্য প্রায় নয় কিলোমিটার। দ্বিতল পদ্মা সেতুর এক অংশ থাকবে মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায়, আরেক অংশ শরীয়তপুরের জাজিরায়। মূল সেতু নির্মাণের জন্য কাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি)। নদী শাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। দুইটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেড। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হয়েছে এ সেতুর কাঠামো।

এজেড/এমআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর