শনিবার, ১৮ মে, ২০২৪, ঢাকা

ডোনাল্ড লু’র বক্তব্য কী বার্তা দিচ্ছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫ মে ২০২৪, ১০:০১ পিএম

শেয়ার করুন:

ডোনাল্ড লু’র বক্তব্য কী বার্তা দিচ্ছে?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ডোনাল্ড লু। ছবি: সংগৃহীত

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের অনেকটাই দূরত্ব সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চেয়ে ভিসানীতিও ঘোষণা করেছিল বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশটি। তবে মার্কিন আলটিমেটামকে অনেকটা পাত্তা না দিয়ে চীন-ভারতকে পাশে নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়। অনেকের ধারণা ছিল, ভোটের পর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। সরকারের মধ্যেও সেই আতঙ্ক ছিল। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যে সেটা বিভিন্ন সময় আঁচও করা গেছে।

তবে নির্বাচনের চার মাস পেরিয়ে গেলেও এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এবার দেশটির দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের বার্তা দিলেন। জানালেন, অতীত ভুলে সামনে এগোতে চান তারা।  


বিজ্ঞাপন


তিন দিনের সফরে গতকাল মঙ্গলবার (১৪ মে) ঢাকায় আসেন ডোনাল্ড লু। তিনি এর আগেও কয়েকবার বাংলাদেশে এসেছেন। বিশেষ করে গত বছর দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে মার্কিন এই কূটনীতিক দুই দফায় সফর করেন বাংলাদেশে। তখনও তার সফর ছিল বেশ আলোচনায়। নির্বাচনের আগে ওই সফরে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সরকারকে নানা পরামর্শ দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেকটা একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে সরকার গঠিত হয়। তবে এবারের সফর কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশে নয়। রাজনৈতিক কোনো এজেন্ডাও স্থান পায়নি এই সফরে।

আরও পড়ুন

ডোনাল্ড লু’র সফর নিয়ে কেন এত আলোচনা?

‘বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনে আগ্রহী আমেরিকা’

মূলত ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা নিয়েই লু এবার ঢাকায় এসেছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সুষ্ঠু নির্বাচন প্রশ্নে বাংলাদেশকে চাপ দিলেও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কিছুটা বেকায়দায় ছিল। কারণ প্রতিবেশী দুটি বড় শক্তি চীন ও ভারত ক্ষমতাসীন সরকারকে জোরালোভাবে সমর্থন দেয়। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও তাদের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন এখানে ঘটাতে পারেনি। এছাড়া বাংলাদেশ চীন ও রাশিয়ার বলয়ে চলে যাক সেটাও যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই চায়নি। এজন্য সম্পর্কের ভারসাম্যের নীতি নিয়েছে দেশটি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলি হামলা, সামনে নিজেদের নির্বাচন এসব কারণে নতুন করে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো তিক্ততায় যেতে চায়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এজন্য সম্পর্ক নবায়নের বার্তা দিয়েই মূলত ডোনাল্ড লু’কে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

অস্বস্তি কাটিয়ে সম্পর্কের নতুন বার্তা


বিজ্ঞাপন


সফরের প্রথম দুই দিনে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে সাক্ষাতে লু’ যে বক্তব্য দিচ্ছেন তাতে এটা পরিষ্কার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের যে অস্বস্তি আছে সেটা কাটিয়ে উঠতে চায়।

America
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ডোনাল্ড লু’র বৈঠক। ছবি: সংগৃহীত

বুধবার (১৫ মে) ডোনাল্ড লু দুইজন মন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেন। সকালে সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন লু। এরপর বিকেলে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ সফরে এসে গত দুই দিনে আমি দুই দেশের জনগণের মধ্যে পুনরায় আস্থা স্থাপনের চেষ্টা করছি। আমরা জানি, গত বছর বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অনেক টেনশন ছিল। আমরা অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন (বাংলাদেশে) অনুষ্ঠানে যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলাম। এতে কিছু টেনশন তৈরি হয়েছিল। আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটা স্বাভাবিক।’

লু বলেন, ‘আমরা সামনে তাকাতে চাই, পেছনে নয়। আমরা সম্পর্ক উন্নয়নের উপায় খুঁজে বের করতে চাই।’

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্নির্মাণ চায় যুক্তরাষ্ট্র: ডোনাল্ড লু

‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর ও বিস্তৃত করা নিয়ে আলোচনা হয়েছে’

বৈঠকে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, শ্রম আইন সংশোধন এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ দ্বিপাক্ষীক সম্পর্কের আরও বেশকিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান লু। বলেন, ‘আমাদের সম্পর্কের পথে অনেকগুলো কঠিন বিষয় রয়েছে, র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার ও ব্যবসার পরিবেশের উন্নয়ন। কিন্তু কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করার জন্য ইতিবাচক সহযোগিতার ওপর ভর করে এগিয়ে যেতে চাই।’

তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ জানিয়েছেন, লুর সঙ্গে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তার কোনো আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে এটা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে হয়তো আলোচনা হয়ে থাকতে পারে।’ তবে র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়টি যে দুই দেশের সম্পর্কের ওপরে প্রভাব ফেলেছে, সেটা বলেছেন বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

saber5
পরিবেশমন্ত্রীর সঙ্গে ডোনাল্ড লু’র বৈঠক। ছবি: সংগৃহীত

লু’র সঙ্গে বৈঠকে অতীত নিয়ে কোনো কথা হয়নি বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বরেন, ‘আমরা দুজনই বলেছি যে, অতীতে কী ঘটেছে, সেটা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। আলোচনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়েই আলোচনা হয়েছে।’

এদিকে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গড়ে তোলা, কর্মশক্তি বৃদ্ধি, নিরাপত্তা সহযোগিতার উন্নতি এবং জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকারকে পুনর্ব্যক্ত করেছে বলে এক ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস।

একইসঙ্গে, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার মূল্যবোধকে শক্তিশালী করার বিষয়েও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাবে বলেও জানানো হয়েছে।

এর আগে সকালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেন ডোনাল্ড লু। সেখানে অতীত নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানান সাবের চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছি, অতীতের কোনো বিষয় নিয়ে কথা হয় নাই। বাংলাদেশ এবং আমেরিকার মধ্যে যে সম্পর্ক আছে, সেটাকে কীভাবে আরও এগিয়ে নিতে পারি, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’

আরও পড়ুন

বাংলাদেশি ফুচকা ইজ দ্য বেস্ট: লু

‘অতীত নয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা হয়েছে’

মন্ত্রী বলেন, ‘সেখানে স্বাভাবিকভাবেই যে বিষয়গুলোতে আমাদের অবস্থান অভিন্ন, যেমন: জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর অভিঘাত মোকাবেলায় বাংলাদেশ এবং আমেরিকা আরও কীভাবে কাজ করতে পারে, সেটা বিয়ে আলাপ করেছি।’

lu66
নৈশভোজে ফুচকার স্বাদ নেন ডোনাল্ড লু। ছবি: সংগৃহীত

পরিবেশমন্ত্রী বলেন, এসব বিষয় নিয়ে ভবিষ্যতে আবার বসবেন। তখন সবকিছু সুনির্দিষ্ট হবে। কোন কোন খাতে সহযোগিতা হবে, তা নির্ধারণ করা হবে।

ডোনাল্ড লু’র যখনই সফরে আসেন তখনই তাকে নিয়ে নানা আলোচনা হয়। এবারের সফরটি রাজনৈতিক না হলেও তার সফর ঘিরে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাদের মধ্যে চর্চা হয়েছে। কথায় এক দলকে আরেক দল ঘায়েল করার চেষ্টা করেছে।

ডোনাল্ড লু তার দেশের হয়ে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক দায়িত্ব পালন করছেন। লু’কে নিয়ে জোরেশোরে আলোচনার শুরু হয় পাকিস্তানে ইমরান খানের পতনের সময়। ২০২২ সালের শুরুর দিকে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আসাদ মজিদকে ইমরান খানের ক্ষমতাচ্যুতির ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন লু। পরে সেই বিষয়টি একটি তারবার্তায় (সাইফার) আসাদ মজিদ ইসলামাবাদে ইমরান খানের সরকারকে অবহিত করেন। সেই তারবার্তার সূত্র ধরে ইমরান খান দাবি করেন, ২০২২ সালে তার সরকার পতনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত আছে। এই বিষয়ে ইমরান খানের বিরুদ্ধে একটি মামলাও আছে। তবে, ইমরান খানকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত থাকার অভিযোগ পরে অস্বীকার করেছেন ডোনাল্ড লু।

জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর