মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০২৪, ঢাকা

হায়দ্রাবাদি হালিমের জনপ্রিয়তার কারণ ও রেসিপি জানুন

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৪ মার্চ ২০২৩, ০৫:৪৩ পিএম

শেয়ার করুন:

হায়দ্রাবাদি হালিমের জনপ্রিয়তার কারণ ও রেসিপি জানুন

হালিম একটি বিশেষ মুখরোচক লোভনীয় খাবার। বিশেষ করে পবিত্র মাহে রমজানে এটির জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ইফতার আয়োজনে হালিম থাকা যেন আবশ্যক হয়ে পড়ে। বাসায় তৈরি করা হালিমের চেয়ে হোটেল থেকে কিনে খেতে পছন্দ করেন অনেকে। ঢাকা-শহরে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় হালিমের দোকান রয়েছে, যেখানে হালিমপ্রেমীরা ভিড় জমান প্রতিদিন। কিন্তু জনপ্রিয় হায়দ্রাবাদি হালিমের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই, যার উৎপত্তি প্রতিবেশী দেশ ভারতে। চলুন জেনে নিই হায়দ্রাবাদি হালিম কেন এত জনপ্রিয়।

হালিমেও উৎপত্তি


বিজ্ঞাপন


হায়দ্রাবাদি হালিমের আগে জেনে নিই কীভাবে এটির উৎপত্তি হয়েছিল। রন্ধন ইতিহাসবিদ ক্লডিয়া রডেনের মতে মধ্যপ্রাচ্যের হারিশা নামক এক ধরণের ডাল ও মাংসের মিশ্রণ জাতীয় খাবার থেকেই উৎপত্তি হয়েছে হালিম নামে পরিচিত এই খাবারটি। সেই হিসেবে এর উৎপত্তি হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্যে। 

খ্রিস্টীয় দশম শতকের দিকে বাগদাদে কিতাব আল তাবিখ নামের রান্নার বইতে লিখিত আকারে হারিশার সবচেয়ে পুরনো রেসিপি পাওয়া যায়। এই বইতে সংকলন করা হয়েছিল তৎকালীন রাজা বাদশাহদের বেশকিছু খাবারের রন্ধনপ্রণালী। বইটির লেখক আবু মুহাম্মদ আল মুজ্জাফর ইবন সায়ার। ইবন বতুতাও তার ভ্রমণ কাহিনীতেও পারস্যে ডাল, ঘি এবং গোশত দিয়ে রান্না করা হারিশার কথা উল্লেখ্য করেছেন।

হালিমের নামকরণ

মধ্যপ্রাচ্যের সেই হারিশাই বর্তমান হালিমে রূপ নিয়েছে। কিন্তু এই হারিশার নাম কেন হালিম করা হলো? এর বিভিন্ন উত্তর প্রচলিত থাকলেও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উত্তর হলো, হালিম রান্না করতে প্রচুর সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। আরবিতে হালিম শব্দের অর্থ হলো ধৈর্যশীল। সেখান থেকেই হারিশার নামকরণ হালিম করা হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে।


বিজ্ঞাপন


hyderabadi-haleemহালিম যেভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে আসে

অনেক ঐতিহাসিক বলেন, ভারতে হারিশার আগমন মুঘলদের মাধ্যমে। দ্বিতীয় মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের আমলে ভারতে হারিশার আগমন হলেও হারিশা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় হুমায়ূনের পুত্র সম্রাট জালাউদ্দিন আকবরের আমলে। সম্রাট হুমায়ূনের সাথে পারস্যের সাফাভি সাম্রাজ্যের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাই বলা যায় পারস্য হয়ে হারিশা ভারতে এসেছিল।

আবার আকবরের শাসনামলে লিখিত আইন-এ-আকবরী গ্রন্থে হারিশার কথা পাওয়া যায়। তবে ভারতবর্ষে আরব বণিক ও ইসলাম প্রচারকদের আগমন সেই হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর সময় থেকেই। তাই আরবদের হাত ধরেও হারিশা ভারতে প্রচলিত হতে পারে।

হায়দ্রাবাদি হালিম

বিরিয়ানির মতো হায়দ্রাবাদি হালিমও সুবিখ্যাত। এটি ভারতের হায়দ্রাবাদ শহরের জনপ্রিয় একটি হালিম। ভারতবর্ষে হালিম জনপ্রিয়করণের পেছনে এই হালিমের অবদান অনস্বীকার্য। হায়দ্রাবাদের স্থানীয় মসলার ব্যবহারে এটি অনন্য হালিমে পরিবর্তিত হয়। ১৯ শতকে স্থানীয়দের মধ্যে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠে।

ইতিহাসবিদদের মতে, হায়দ্রাবাদের নিজামদের আরব সৈন্যরাই হারিশা এনেছিল হায়দ্রাবাদে। বিংশ শতকে হায়দ্রাবাদি হালিম জনপ্রিয়করণে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিলেন সুলতান সাইফ নাওয়াজ জং বাহাদুর। ইয়েমেনী জমিদার সুলতান সাইফ ছিলেন হায়দ্রাবাদের নিজামদের দরবারের খানদানি আমির ওমরাহ্‌দের একজন। তাঁর বাড়িতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত মেহমানদের খাদ্য তালিকায় নিয়মিত স্থান পেত তার মাতৃভূমি ইয়েমেনের হারিশা। তবে ইয়েমেনের হারিশা ততদিনে ভারতীয় মশলার ছোঁয়া পেয়ে পরিণত হয়ে গেছে আজকের হালিমে।

hyderabadi-haleemহায়দ্রাবাদি হালিমের জনপ্রিয়তার কারণ

হালিম মুখরোচক খাবার যা খাসির মাংস, বিভিন্ন রকমের ডাল, গম এবং গরম মশলার সিদ্ধ করা ঘন মিশ্রণ। এটি সহজে হজমযোগ্য। মূলত হায়দ্রাবাদের স্থানীয় মসলার ব্যবহার এটির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।

হায়দ্রাবাদের হালিমের জনপ্রিয়তা শুধু ভারতে নয়, বাংলাদেশেও রয়েছে। রমজান মাস এলেই প্রচুর অস্থায়ী হালিমের দোকান বসে। হায়দ্রাবাদের হালিমের ২৮ শতাংশ বিশ্বের ৫০টি দেশে রপ্তানি করা হয়।

১৯৫০ এর দশকে হায়দ্রাবাদের ইরানি খাবার হোটেলগুলোতে সর্বপ্রথম হালিম বিক্রি শুরু হয়। তখন এক বাটি হালিমের দাম ছিল মাত্র ৩ পয়সা।

হালিমের ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে ২০১০ সালে ইন্ডিয়ান পেটেন্ট অফিস হায়দ্রাবাদি হালিমকে প্রথম ননভেজ খাবার হিসাবে পেটেন্ট দিয়েছে। অর্থাৎ ভারতে কেউ হায়দ্রাবাদি হালিম নামে কোনো হালিম বিক্রি করতে চাইলে তাকে নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড মেনে হালিম বানাতে হবে। এটিই হলো ভারতের প্রথম মাংস সমৃদ্ধ খাবার, যা ভারতের ভৌগোলিক চিহ্ন হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে এই হালিম ততক্ষণ পর্যন্ত হায়দ্রাবাদের হালিম নামে বিক্রয় করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত এটি আদর্শ মান না অর্জন করে।

haleem-recipeযেভাবে তৈরি করবেন হায়দ্রাবাদি হালিম

উপকরণ

খাসির মাংস ১ কেজি
ভাঙা গম ৩ কাপ
মাসকলাইর ডাল ১ কাপ
আদা বাটা ২ চা চামচ
রসুন বাটা ২ চা চামচ
লাল মরিচের গুঁড়া ১ চা চামচ
টক দই ২ কাপ
কাজু বাদাম ১/২ কাপ
গোল মরিচ ১/২ চা চামচ
ঘি ১/২ কাপ
পুদিনা পাতা ১/২ কাপ
হলুদ গুঁড়ো ১/৪ চা চামচ
পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ
দারচিনির টুকরো ১ ইঞ্চি
ধনেপাতা ১ কাপ
কাঁচামরিচ ৬টি
পরিবেশনের জন্য লেবু
গরম মসলা গুঁড়ো ১ চা চামচ (শাহ জিরা, কালো গোলমরিচ, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জাফরান, স্টার এনিস, কাবাবচিনি, শুকনো গোলাপের পাঁপড়ি ইত্যাদির মিশ্রণ)

প্রণালি

১ম ধাপ

ভাঙা গম এক ঘণ্টার জন্য ভিজিয়ে রাখতে হবে। মাংস ছোট টুকরো করে নিতে হবে। মাংস থেকে যতটা সম্ভব চর্বি ও বড় হাড় আলাদা করতে হবে।

২য় ধাপ

মাংসের সাথে আধা চা চামচ করে আদা ও রসুন বাটা, লবণ, লাল মরিচের গুঁড়ো, গরম মশলা গুঁড়ো আর এক চিমটি হলুদ গুঁড়ো মাখাতে হবে। এরপর ৮ থেকে ১০ মিনিট (চারটি হুইসেল অন্তত) প্রেশার কুকারে রান্না করে তারপর আরও ১৫ থেকে ২০ মিনিট অল্প আঁচে রান্না ঢেকে রেখে রান্না করতে হবে। মাংস সেদ্ধ হয়ে নরম হয়ে গেলে হাত বা খুন্তির সাহায্যে ছিঁড়ে নিতে হবে।

৩য় ধাপ

একটা পাত্রে ভেজানো গম আর মাসকালাইর ডালের সাথে এক চামচ করে আদা ও রসুন বাটা, হলুদ, কাঁচা মরিচ আর কালো গোলমরিচ দিয়ে ৮ থেকে ১০ কাপ পানি নিয়ে পুরোপুরি সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। পুরোপুরি সিদ্ধ হয়ে গেলে একটা ডাল ঘুটনির সাহায্যে মিশ্রণটিকে ভালোভাবে ব্লেন্ড করে নিন।

৪র্থ ধাপ

আলাদা পাত্রে তেল গরম করে তাতে আস্ত গরম মসলা, রান্না করা ছাড়ানো খাসির মাংস, কাঁচা মরিচ  আর আধা কাপ তাজা ধনে পাতা দিয়ে কয়েক মিনিট নেড়েচেড়ে রান্না করতে হবে। এরপর টক দই যোগ করে আরও কয়েক মিনিট অল্প আঁচে নেড়ে চেড়ে কষান। ভালো করে কষানো হয়ে গেলে গরম মসলার গুঁড়ো আর তিন কাপ পানি দিয়ে ফুটতে দিন।

৫ম ধাপ

এরপর এতে গম আর ডালের মিশ্রণটি মেশান। ঘি দিয়ে আধা ঘণ্টার জন্য অল্প আঁচে রান্না করুন। নামানোর আগে কিছুটা ফ্রেশ ক্রিম দিতে পারেন।

৬ষ্ঠ ধাপ

বেরেস্তা, কাজু বাদাম, ধনে পাতা কুঁচি আর লেবুর টুকরো দিয়ে পরিবেশন করুন গরম গরম হায়দ্রাবাদি হালিম।

এমএইচটি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর