মানুষের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ স্পর্শ। এই অনুভূতি এতটাই শক্তিশালী যা আমাদের শরীর ও মনের ব্যথা কমাতেও পারে, আবার বাড়াতেও পারে। একটি সঠিক স্পর্শ আমাদের পুরো পৃথিবী রঙিন করে দিতে পারে। আবার ভুল স্পর্শে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে গোটা জীবন। গবেষণায় দেখা গেছে, স্পর্শের মাধ্যমে মানুষ শব্দের চেয়ে দ্রুতবেগে আবেগ প্রকাশ করতে পারে। একটি সঠিক স্পর্শ আমাদের ব্যথা কমাতে পারে। এমনকি মানসিক চাপও দূর করতে পারে।

এই অনুভূতিটি নিয়ে খুব কমই আলোচনা হয়ে হয়। এর সম্পর্কে আরও জানতে সম্প্রতি ‘দ্য টাচ টেস্ট’ নামে একটি অনলাইন গবেষণা শুরু করে ওয়েলকাম কালেকশন এবং বিবিসি রেডিও ৪। এ গবেষণায় অসংখ্য মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। তাদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, পারস্পারিক সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই স্পর্শকে প্রাধান্য দেন-
অধিকাংশ মানুষই স্পর্শ করতে বা পেতে পছন্দ করে, তবে সবাই নয়
গবেষণায় স্পর্শের প্রতি মানুষের মনোভাব পরিমাপের জন্য একটি স্কেল ব্যবহার করা হয়। এতে দেখা গেছে, স্পর্শ নিয়ে ইতিবাচক অনুভূতির কথা জানিয়েছেন ৭২ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে, নেতিবাচক অনুভূতির কথা জানিয়েছেন ২৭ শতাংশ। তাই, সবাই স্পর্শ পছন্দ করেন-এই কথা ঢালাওভাবে বলা যাবে না।
স্পর্শ অপছন্দ করা ব্যক্তিরা অন্তর্মুখী হন

টাচ টেস্টে মূলত বয়স, লিঙ্গ এবং বিশ্বের কোন স্থানে মানুষ বাস করে এসব উপাদানের ওপর ভিত্তি করে পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা গেছে, ব্যক্তিত্বের প্রভাব স্পর্শের প্রতি মানুষের মনোভাব কেমন হবে তা নির্ধারণ করে। মানুষের সম্পর্কের ধরনও নির্ধারণ করে কোনো সম্পর্কে স্পর্শের অনুভূতি থাকবে কি না।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, যেসব মানুষ কোনো সম্পর্কে স্বাধীন থাকতে পছন্দ করেন এবং মানুষের সঙ্গে মানসিকভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে মেলামেশা অপছন্দ করেন তারাই সাধারণত স্পর্শের প্রতি কম ইতিবাচক।
জীবনে স্পর্শের অভাব অনুভব করেন অর্ধেকের বেশি মানুষ
জরিপে অংশ নেওয়া ৫৪ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তাদের জীবনে স্পর্শের পরিমাণ খুবই কম। মাত্র ৩ শতাংশ মানুষ জানান, তাদের জীবনে স্পর্শের পরিমাণ অতিরিক্ত। এই ফলাফল ‘দ্য টাচ টেস্ট’ এর ২০২০ সালের জানুয়ারির শেষ থেকে মার্চের শেষ পর্যন্ত সংগ্রহ করা তথ্য।
তবে যুক্তরাজ্যে লকডাউনে পরিচালিত আরেকটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, আগের তুলনা এখন আরও বেশি মানুষ মনে করেন জীবনে তারা পর্যাপ্ত স্পর্শ পাচ্ছেন না। এর মানে, আমাদের যদি বন্ধু এবং পরিবার-পরিজনকে জড়িয়ে ধরা এবং স্পর্শ করা থেকে বিরত রাখা হয় তবে আমরা সেটি সত্যিই আরও বেশি মিস করি।
পৃথিবীব্যাপী স্পশের অনুভূতি যেমন
টাচ টেস্টে অনলাইনে অংশ নিয়েছিল বিশ্বের ১১২টি দেশের মানুষ। তাদের কাছে স্পর্শের অনুভূতি কেমন তা জানতে চাওয়া হলে, বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে মানুষের দুটি সাধারণ শব্দ ব্যবহার করেন ‘স্বস্তিদায়ক’ এবং ‘উষ্ণ’।

অপরিচিতদের স্পর্শ অপছন্দ করে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ
বন্ধু এবং অপরিচিত ব্যক্তিরা শরীরের কোনো অংশে স্পর্শ করলে মানুষ সেটি পছন্দ করে নাকি অপছন্দ তা জানতে চাওয়া হলে জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষই জানান, অপরিচিত কেউ তাদের হাত স্পর্শ করলে ঠিক আছে। এর বেশি কোনোকিছুই তারা পছন্দ করবেন না।
আরও পড়ুন: অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম থেকে উঠবেন যেভাবে
ঘুমানোর আগে সঙ্গীকে স্পর্শ না করলে ঘুম ভালো হয়!
সামগ্রিকভাবে অধিকাংশ নারী ও পুরুষ বিশ্বাস করেন, ঘুমানোর আগে সঙ্গীকে স্পর্শ করলে ঘুম ভালো হয়। বিশেষ করে পিটে, কাঁধে মাথায় হাত বুলালে। তবে এই গবেষণায় উল্টো চিত্র দেখা গেছে। গবেষকরা বলছেন, তাদের পাওয়া তথ্যমতে, ঘুমানোর আগে সঙ্গীকে বরং স্পর্শ না করলে পুরুষদের তুলনায় নারীরা চার গুণ বেশি ভালো ঘুমাতে পারেন।

মানুষের মধ্যে আগের তুলনায় স্পর্শ কমেছে না বেড়েছে?
এ নিয়ে অবশ্য মতপার্থক্য রয়েছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া এক তৃতীয়াংশ মানুষ বলেছেন, আগের মতো তারা একে অপরকে ততটা স্পর্শ করেন না। তবে অর্ধেক মানুষ মনে করেন, এতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। যারা মনে করছেন, জীবনে স্পর্শের মাত্রা কমে গেছে তাদের দাবি, সম্মতি ও সামাজিক যোগাযোগের অভাবে এমনটা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: রিলেশনশিপ অ্যাংজাইটিতে ভুগছেন? জানুন দূর করার উপায়
স্পর্শ পছন্দকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সুস্থতার মাত্রা বেশি, একাকীত্বের মাত্রা কম
টাচ টেস্টে দেখা গেছে, পারস্পরিক সম্মতিতে স্পর্শ শারীরিক ও মানসিকভাবে আমাদের জন্য ভালো। এ ধরনের আরও কিছু গবেষণার ফলাফলে সঙ্গে এই গবেষণার মিল পাওয়া গেছে।

মানুষ কৃত্রিম উপায়ে স্পর্শের আদান-প্রদান অপছন্দ করে
মানুষ ম্যাসাজ চেয়ার ব্যবহার করতে পছন্দ করলেও এমন কোনো ডিভাইস ব্যবহার করতে আগ্রহী নয় যা তাদের দূর থেকে একে অপরের সাথে হাত মেলানোর অনুভূতি দিতে পারবে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৪৬ শতাংশ মানুষ বলেছে, তারা নিশ্চিতভাবেই এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন না যা তাদের কম্পিউটারের মাধ্যমে কারো সাথে হাত মেলানোর অনুমতি দেবে। যদিও বিশ্বজুড়ে এ ধরনের প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বিকাশের প্রচেষ্টা চলছে।
টাচ টেস্ট তৈরি এবং বিশ্লেষণকারী দলটি পরিচালনা করেছিলেন গোল্ডস্মিথস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মাইকেল ব্যানিসি। এতে গ্রিনউইচ ইউনিভার্সিটির ডা. নাটালি বোলিং, গোল্ডস্মিথস ইউনিভার্সিটির আইকাতেরিনি ভাফেয়াদু এবং ইউসিএলের অধ্যাপক কাটেরিনা ফোটোপ ওলোও অংশ নিয়েছিলেন।
এএ




