সম্পর্কের রঙিন দিনগুলোতে উপহার দেওয়া-নেওয়ার বিষয়টি খুবই স্বাভাবিক। জন্মদিনের কেক থেকে শুরু করে প্রিয় মানুষটির পছন্দের সুবাসের পারফিউম, আংটি, ঘড়ি কিংবা হাতে লেখা চিঠি, প্রেমের সময়টুকুকে আরও মধুর করে তুলতে কতশত জিনিসই না একে অপরকে উপহার দেন তরুণ-তরুণীরা। কিন্তু ভালোবাসার সেই সমীকরণ যখন বদলে যায় আর পরিণতি পায় তিক্ত বিচ্ছেদে, তখন প্রশ্ন ওঠে—স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই উপহারগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে? ব্রেকআপের পর কি সব উপহার ফিরিয়ে দেওয়া উচিত, নাকি নিজের কাছে রেখে দেওয়ায় কোনো দোষ নেই?
সম্পর্ক ভাঙার পর এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে নানা মুনির নানা মত সামনে আসে। চলুন, বিষয়টি একটু গভীরে গিয়ে খতিয়ে দেখা যাক।

আবেগের টানাপোড়েন ও মনস্তত্ত্ব
ব্রেকআপ বা বিচ্ছেদ যেকোনো মানুষের জন্যই এক ধরনের মানসিক ট্রমা। সম্পর্কের ইতি ঘটার পর স্বাভাবিকভাবেই হৃদয়ে এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়। এই সময়ে সাবেক সঙ্গীর দেওয়া উপহারগুলো চোখের সামনে পড়লে তা পুরোনো স্মৃতির কড়া নাড়ে এবং মনের ক্ষতকে বারবার উসকে দেয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বিচ্ছেদের পর মানসিক শান্তি বজায় রাখা এবং নতুন করে জীবন শুরু করার ক্ষেত্রে পাস্ট বা অতীতের জঞ্জাল থেকে মুক্ত হওয়া জরুরি। অনেকের কাছেই উপহার ফিরিয়ে দেওয়া মানে হলো সেই অধ্যায়ের পুরোপুরি ইতি টানার একটি মানসিক ঘোষণা।

তবে সবার মানসিকতা এক হয় না। কেউ কেউ উপহারগুলোকে সুন্দর একটি স্মৃতির অংশ হিসেবে জীবনের খাতায় জমিয়ে রাখেন, আবার কেউ দম বন্ধ করা কষ্টের হাত থেকে বাঁচতে মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু দূরে সরিয়ে দিতে চান।
তরুণ প্রজন্মের ভাবনা কী?
বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের মাঝে উপহার লেনদেন এবং তা ফেরত দেওয়া নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়।
সম্মান বজায় রাখা: অনেকের মতে, ভালোবাসার সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও অতীতের সুন্দর মুহূর্তগুলোর প্রতি সম্মান জানানো উচিত। তাই উপহারগুলো ফেরত না দিয়ে নিজেদের কাছে সযত্নে রেখে দেওয়া বা বর্জন করা, দুটাই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়।
আত্মসম্মান ও রাগ: অন্যদিকে, কিছু তরুণ-তরুণী প্রচণ্ড অভিমান কিংবা রাগের বশে তাৎক্ষণিকভাবে উপহারগুলো ফিরিয়ে দেন। তাদের যুক্তি, যে সম্পর্কে আর ভবিষ্যৎ নেই, সেই সম্পর্কের কোনো চিহ্ন নিজের কাছে রাখতে চান না তারা।

মূল্যবান উপহারের ক্ষেত্রে জটিলতা: সাধারণ ছোটখাটো জিনিসের চেয়ে অনেক সময় সম্পর্কের ভেতরে বড় বা দামি উপহারও আদান-প্রদান হয়ে থাকে। বিচ্ছেদের পর এসব দামি উপহার (যেমন—স্মার্টফোন, গ্যাজেট বা স্বর্ণালংকার) রাখা বা ফেরত দেওয়া নিয়ে এক ধরনের সামাজিক অস্বস্তি ও দ্বিধা কাজ করে।
উপহার ফেরত দেওয়া কি বোকামি, নাকি পরিপক্বতা?
সমাজ ও সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মতে, উপহার ফেরত দেওয়া বা না দেওয়ার কোনো নির্দিষ্ট বা পাথরে খোদাই করা নিয়ম নেই। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে সম্পর্কের ধরন এবং দুই ব্যক্তির মানসিক অবস্থার ওপর।
যদি সম্পর্কটি অত্যন্ত তিক্ততা, প্রতারণা বা বিষাক্ত পরিস্থিতিতে শেষ হয়, তবে সাবেক সঙ্গীর দেওয়া যেকোনো স্মৃতিচিহ্ন বা উপহার চোখের সামনে না রাখাই শ্রেয়। সে ক্ষেত্রে সেগুলো ফিরিয়ে দেওয়া বা নষ্ট করে ফেলা মনের শান্তির জন্য সহায়ক হতে পারে।
পক্ষান্তরে, যদি বোঝাপড়ার মাধ্যমেই সম্পর্কটির ইতি ঘটে এবং দুইপক্ষই বন্ধুসুলভ দূরত্ব বজায় রাখতে চান, তবে উপহারগুলো নিজের কাছে রেখে দেওয়ায় বা একে অপরকে ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না।

যা করা উচিত
ব্রেকআপের পরবর্তী সময়ে আবেগতাড়িত হয়ে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। রাগ বা জেদের বশে উপহার ছুড়ে দেওয়া বা ফেরত চাইতে যাওয়ার চেয়ে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া বেশি জরুরি। উপহার ফিরিয়ে দেওয়া বা রেখে দেওয়া, যাই করা হোক না কেন, তা যেন আপনার আত্মসম্মান ও মানসিক প্রশান্তির পরিপন্থী না হয়।
আরও পড়ুন: পুরুষের কাছে ভালোবাসা ছাড়া আর কী চান নারীরা?
উপহার কোনো চুক্তির অংশ নয়, যা বিচ্ছেদের পর সুদে-আসলে বুঝিয়ে দিতে হবে। এটি ছিল ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। সম্পর্ক ফুরোলেই ভালোবাসার সেই দিনগুলো মুছে যায় না। তাই উপহার ফিরিয়ে দেওয়া বা না দেওয়ার সিদ্ধান্তটি একান্তই আপনার ব্যক্তিগত অনুভূতির ওপর ছেড়ে দেওয়া ভালো।
এজেড




