ক্লাস শেষ হতেই ক্যাম্পাসের গেটে ফুচকা বা চটপটির দোকানে ভিড় জমানো শিক্ষার্থীদের চিরচেনা দৃশ্য। আড্ডা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো বা স্রেফ তাড়াহুড়োর মধ্যে ক্ষুধা মেটানো, সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে রাস্তার ধারের মুখরোচক এসব খাবার। শীতের সন্ধ্যায় ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা হোক বা গরমের দুপুরে এক গ্লাস কোল্ড কফি, স্ট্রিট ফুড যেন তরুণদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই সস্তা ও সুস্বাদু খাবারের পেছনে লুকিয়ে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি কতটা ভাবাচ্ছে তাদের?
শিক্ষার্থীদের কাছে স্ট্রিট ফুড কেবল রসনাবিলাস নয়, অনেক সময় এটি রীতিমতো বাধ্যবাধকতা। চট্টগ্রাম কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনিয়া তাবাচ্ছুমের কথায় বিষয়টি বেশ স্পষ্ট হয়। ক্লাস ও অন্যান্য কাজের ফাঁকে চটজলদি ক্ষুধা মেটাতে চটপটি বা গরম মোমোই তার প্রথম পছন্দ।

তবে একই কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী তৈয়বা খানম বিষয়টি দেখেন আরেকটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের স্ট্রিট ফুডের ওপর নির্ভরতার পেছনে সময়ের অভাব এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বড় ভূমিকা রয়েছে। পকেটের সীমিত টাকার সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেক সময় স্বাস্থ্যঝুঁকি জেনেও সস্তা খাবারের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হন শিক্ষার্থীরা। শুধু তাই নয়, অনেক সময় নামিদামি ব্র্যান্ডের রেস্তোরাঁগুলোও যখন পরিচ্ছন্নতার মান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ খাবারের সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যের প্রশ্নটি যখন আসে, তখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা এবং বাস্তবতার এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব চোখে পড়ে। ঢাকার বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী ফাহিমা আক্তারের কাছে স্বাস্থ্যের চেয়ে বড় কিছু নেই। বিক্রেতার হাতে গ্লাভস আছে কি না কিংবা ব্যবহৃত পানি পরিষ্কার কি না, তা নিশ্চিত না হয়ে তিনি খাবার কেনেন না। প্লেট বা গ্লাস অপরিষ্কার মনে হলে নিজের সামনেই আবার ধুইয়ে নেন।

কিন্তু এই সচেতনতা সবসময় ধরে রাখা সম্ভব হয় না। টঙ্গীর তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার শিক্ষার্থী রাইহান উদ্দিন অকপটে স্বীকার করেন এক রূঢ় সত্য। স্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবের চিত্রটা ভিন্ন। কম দাম ও মুখরোচক হওয়ার কারণে অনেক সময় রাস্তার ধারের ঝালমুড়ি বা সিঙ্গারার প্রতি আলাদা আকর্ষণ কাজ করে, যেখানে তাড়াহুড়োর কারণে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি কিছুটা হলেও উপেক্ষিত থেকে যায়।
এই আপসের মাশুলও গুনতে হয় প্রায় সবাইকে। মজার ব্যাপার হলো, যাদের মতামত বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তাদের প্রায় প্রত্যেকেই কখনো না কখনো স্ট্রিট ফুড খেয়ে অসুস্থ হয়েছেন। সিলেটের এম সি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মাহজাবীন তাসনীম রুহী একবার রাস্তার খাবার খেয়ে মারাত্মক গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভুগেছিলেন। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর থেকে তিনি শুধু বিশ্বস্ত ও পরিচ্ছন্ন দোকান থেকেই খাবার কেনেন।

অপরিষ্কার পানি ও খোলা খাবার খেয়ে তাসনিয়াও ভীষণ অসুস্থ হয়েছিলেন। এই অসুস্থতার অভিজ্ঞতাগুলো শিক্ষার্থীদের আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক। তবে রাইহানের মতো অনেকেই আছেন, যারা অসুস্থ হওয়ার পর কিছুদিন বিরতি দিলেও স্থায়ীভাবে স্ট্রিট ফুড পরিহার করতে পারেননি, যা আমাদের চারপাশের অনিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থার দৈন্যই ফুটিয়ে তোলে।
তাহলে এর সমাধান কোথায়? শিক্ষার্থীরা শুধু সমস্যা চিহ্নিত করেই থেমে নেই, তারা বেশ কিছু বাস্তবসম্মত সমাধানের কথাও ভেবেছেন। সবার মতামতেই একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, আর তা হলো বিক্রেতাদের সচেতনতা ও সরকারি তদারকি। ফাহিমা ও রুহী দুজনেই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের নিয়মিত তদারকি, জরিমানা এবং প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন।

অন্যদিকে তাসনিয়া একটি চমৎকার ও যুগোপযোগী প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি যত্রতত্র দোকান না বসিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পরিচ্ছন্ন স্ট্রিট ফুড জোন তৈরির কথা বলেছেন, যেখানে বিশুদ্ধ পানির সুব্যবস্থা থাকবে এবং প্লাস্টিকের বিকল্প ফুড-গ্রেড পাত্রের ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি তৈয়বার মতে, কেবল আইন দিয়ে নয়, ব্যবসায়ীদের নিজস্ব নৈতিকতা ও মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করাটাও সমান জরুরি।
স্ট্রিট ফুড আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত ও সীমিত বাজেটের জীবনে এটি বাদ দিয়ে চলার সুযোগ খুব একটা নেই। তাই এই সংস্কৃতিকে উচ্ছেদ করা কোনো সমাধান নয়। প্রয়োজন এটিকে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত করে তোলা।

বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণ, সরকারি নজরদারি এবং ক্রেতাদের সচেতনতা, এই ত্রিমাত্রিক উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল নিশ্চিত হতে পারে নিরাপদ স্ট্রিট ফুড। তা না হলে স্বাদের টানে স্বাস্থ্যের চরম মূল্য চুকানোর এই নীরব চক্র চলতেই থাকবে।
এনএম




