উৎসবের আমেজ বা ঋতু পরিবর্তনের সময় শিশুদের মধ্যে পেটের সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়। বিশেষ করে ঈদের পর অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার বা বর্ষার শুরুতে ভাইরাস-ব্যাকটেরিয়ার প্রকোপে শিশুরা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ে। ছোটরা যেহেতু সমস্যার কথা গুছিয়ে বলতে পারে না, তাই বাবা-মাকে সবসময় সজাগ থাকতে হবে। হালকা পেটের সমস্যায় সবসময় ওষুধের প্রয়োজন হয় না, বরং কিছু কার্যকরী ঘরোয়া যত্নেই শিশু দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।
কখন চিন্তার কারণ নেই? (ঘরোয়া যত্নই যথেষ্ট)
যদি শিশুর পেট খারাপের ধরণ নিচের মতো হয়, তবে আতঙ্কিত না হয়ে শান্তভাবে ঘরে সেবার ব্যবস্থা করুন-
- শিশুর মলের পরিমাণ সামান্য বাড়লেও সে যদি হাসিখুশি ও চঞ্চল থাকে।
- বমি বা পাতলা পায়খানা হলেও শিশু যদি পর্যাপ্ত তরল খাবার গ্রহণ করে।
- প্রস্রাবের পরিমাণ ও রঙ স্বাভাবিক থাকে।
- মাঝেমধ্যে পেটে মোচড় দিলেও দীর্ঘক্ষণ একটানা ব্যথা না থাকে।
আরও পড়ুন: বাড়ন্ত শিশুর বিকাশে যেসব খাবার জরুরি

বিজ্ঞাপন
ঘরে বসে যা করবেন (কার্যকরী করণীয়)
১. ওআরএস: ডায়রিয়াজনিত সমস্যায় ওআরএস অত্যন্ত কার্যকর একটি সমাধান। এটি শরীরে ইলেকট্রোলাইটসের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। শিশুকে একটু পর পর ওআরএস মিশ্রিত পানি খাওয়ান।
২. লবণ-চিনির পানি: যদি তাৎক্ষণিকভাবে ওআরএস না পাওয়া যায়, তবে এক গ্লাস নিরাপদ পানিতে এক চামচ চিনি এবং এক চিমটি লবণ মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। এটি সাময়িকভাবে পানিশূন্যতা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা।
৩. ফুটানো পানি: ফিল্টারের পানি দিলেও এই সময়ে ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো। পানি অন্তত ১০-১৫ মিনিট ফুটিয়ে তারপর ঠান্ডা করে পান করান। এটি নতুন কোনো জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি কমাবে।
৪. টক দইয়ের গুণ: মলের বেগ কিছুটা কমে এলে শিশুকে ঘরে পাতা টক দই খাওয়ান। এতে থাকা ‘ল্যাকটোব্যাসিলাস’ (উপকারী ব্যাকটেরিয়া) অন্ত্রের স্বাস্থ্য দ্রুত ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। তবে দোকানের কেনা মিষ্টি দই পরিহার করুন।
আরও পড়ুন: বড়দের যেসব আচরণে ক্ষতি হয় শিশুর
কখন চিন্তার বিষয়? (জরুরি সতর্কতা)
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে এক মুহূর্ত দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে-
- পানিশূন্যতার লক্ষণ: শিশুর চোখ বসে যাওয়া, জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া এবং ৬ ঘণ্টার বেশি সময় প্রস্রাব না হওয়া।
- রক্ত বা মিউকাস: পায়খানার সাথে রক্ত বা সাদাটে আম (mucus) দেখা দিলে।
- তীব্র ব্যথা ও বমি: যদি শিশু যা খাচ্ছে তাই বমি করে দেয় এবং তীব্র ব্যথায় কুঁকড়ে যায়।
- নিস্তেজ ভাব: শিশু যদি অতিরিক্ত ঘুমানো বা নিস্তেজ হয়ে যাওয়ার মতো অস্বাভাবিক আচরণ করে।

যেসব ভুল করা যাবে না
- নিজের সিদ্ধান্তে সন্তানকে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াবেন না; এতে উল্টো ক্ষতি হতে পারে।
- পেট খারাপ অবস্থায় বড়দের হজমের ওষুধ বা অতিরিক্ত কড়া ও ক্ষতিকর কোনো পানীয় শিশুকে দেবেন না।
- হালকা ক্ষেত্রেও যদি ২–৩ দিনের মধ্যে উন্নতি না হয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
শিশুর অসুস্থতায় বিচলিত হওয়া স্বাভাবিক, তবে সঠিক তথ্য জানা থাকলে দুশ্চিন্তা অনেকখানি কমে যায়। ‘কখন চিন্তার, কখন নয়’—এই পার্থক্যটি মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করলেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। মনে রাখবেন, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ পানিই শিশুর সুস্বাস্থ্যের মূল চাবিকাঠি।
সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ গাইডলাইন; আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স; স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ

