শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

নরওয়েকে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ বলা হয় কেন?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর ২০২৫, ০৪:২৯ পিএম

শেয়ার করুন:

নরওয়েকে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ বলা হয় কেন?
নিশীথ সূর্যের দেশ নামে পরিচিত নরওয়ে।

সূর্য দিনের বেলায় আলো দেয়। এ কথা কে না জানে। কিন্তু যদি বলি, পৃথিবীতে এমন একটি দেশ আছে যেখানে দিন-রাত সারাক্ষণই সূর্যের দেখা মেলে। সেখানে আঁধার নামে না বললেই চলে। কী অবাক লাগছে? সত্যিই কিন্তু পৃথিবীতে এমন একটি দেশ আছে। দেশটির নাম নরওয়ে (Norway)। এই দেশকে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ (Land of the Midnight Sun) বলা হয়। এর পাশাপাশি সুইডেন, ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং রাশিয়ার কিছু অংশেও এই প্রাকৃতিক ঘটনা দেখা যায়। তবে বিশেষণের ক্ষেত্রে নরওয়ে এগিয়ে। 

নরওয়েকে কেন নিশীথ সূর্যের দেশ বলা হয়?

নরওয়েকে নিশীথ সূর্য বা রাতের সূর্যের দেশ বলার পেছনে কিছু কারণ দায়ী। এগুলো হলো- 

norway1

ভৌগোলিক অবস্থান:

নরওয়ের উত্তরাংশ আর্কটিক সার্কেলের (Arctic Circle) মধ্যে অবস্থিত। আর্কটিক সার্কেলের উত্তর দিকে অবস্থিত স্থানগুলোতে বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে সূর্য সম্পূর্ণরূপে অস্ত যায় না।


বিজ্ঞাপন


আর্কটিক সার্কেলে থাকা অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে, বিশেষ করে মে মাসের শেষ থেকে জুলাই মাসের শেষ পর্যন্ত, ২৪ ঘণ্টা ধরে আকাশে সূর্যের দেখা মেলে। এসময়ে সূর্য দিগন্তের নিচে নামে না, তাই রাতও নামে না। কিংবা বলা যায় রাতের আকাশও দিনের মতো আলোকিত থাকে।  

দিনের দৈর্ঘ্য: 

সাধারণত দিনের দৈর্ঘ্য ১২ ঘণ্টা, রাতের দৈর্ঘ্য ১২ ঘণ্টা হয়। গ্রীষ্মকালে দিনের ব্যাপ্তি বেড়ে ১৩-১৪ ঘণ্টা হয়। আবার শীতকালে দিনের দৈর্ঘ্য কমে ১১ ঘণ্টাও হতে পারে। কিন্তু নরওয়েতে গ্রীষ্মের দিনের দৈর্ঘ্য ২৪ ঘণ্টা হয়। অর্থাৎ কোনো রাত হয় না। 

norway2

কেন নরওয়েতে রাতের আকাশেও সূর্যের দেখা মেলে? 

পৃথিবীর অক্ষের ঢাল: 

ছেলেবেলায় সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের ভূগোলে নিশ্চয়ই পড়েছেন, পৃথিবী তার অক্ষের সাথে প্রায় ২৩.৫ ডিগ্রি কোণে ঝোঁকা অবস্থায় সূর্যের চারপাশে ঘোরে। এই ঢালুর কারণে গ্রীষ্মকালে উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে বেশি মুখ করে থাকে, ফলে আর্কটিক সার্কেলের অঞ্চলে সূর্য সম্পূর্ণরূপে অস্ত যায় না।

গ্রীষ্মকালীন অয়নান্তর (Summer Solstice): 

জুন মাসের ২১ তারিখের কাছাকাছি সময়ে গ্রীষ্মকালীন অয়নান্তর ঘটে। সেসময় উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় ঝোঁকে। নিশীথ সূর্যের প্রভাব এই সময়েই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

norway3

নরওয়ের দৈনন্দিন জীবনে নিশীথ সূর্যের প্রভাব

একটি দেশের দিন-রাতের পুরোটা সময় যদি আলোকিত থাকে, আকাশে সূর্যের দেখা মেলে, স্বাভাবিকভাবেই তার প্রভাব দৈনন্দিন জীবনেও পড়ে। নরওয়ের পর্যটন, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা সবকিছুতেই নিশীথ সূর্য প্রভাব ফেলে।  

পর্যটন:

এই বিশেষ প্রাকৃতিক ঘটনার কারণে নরওয়ে এবং অন্যান্য উত্তরীয় দেশগুলোতে প্রচুর পর্যটক আসে। তারা মধ্যরাতে সূর্যের আলো উপভোগ করেন। কেউবা ফটোগ্রাফির মাধ্যমে এই মুহূর্তগুলোকে ধারণ করতে পছন্দ করেন। 

norway4

সংস্কৃতি:

স্থানীয় সংস্কৃতিতে নিশীথ সূর্য বিশেষ ভূমিকা রাখে। এসময় নরওয়ে, সুইডেন ইত্যাদি দেশে ‘মিডসামার ফেস্টিভ্যাল’ নামক উৎসব পালন করা হয়। এদিন গান, নাচ করা হয়। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে দিনটি উদযাপন করেন সবাই। ফলের মুকুট পরেন মাথায়। ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন করা হয়। 

এখানেই শেষ নয়। মিডসামার ফেস্টিভ্যালের রাতকে জাদুকরী বলে মনে করা হয়। নরওয়ের একটি ঐতিহ্য হলো, অবিবাহিত মেয়েরা সাত বা নয় ধরনের ফুল তুলে বালিশের নিচে রেখে দেন, যেন তারা তাদের ভবিষ্যতের জীবনসঙ্গীকে স্বপ্নে দেখতে পায়।

জীবনযাত্রা:

দিনের অতিরিক্ত আলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পরিবর্তন আনে। ঘুমের প্যাটার্ন, কাজের সময়সূচি এবং সামাজিক কার্যকলাপে এর প্রভাব পড়ে।

norway5

নরওয়ে ছাড়াও যেসব দেশে নিশীথ সূর্য দেখা যায়:

সুইডেন: আর্কটিক সার্কেলের উত্তরের অংশে এই ঘটনা দেখা যায় (বিশেষ করে কিরুনা শহরে)।

ফিনল্যান্ড: এই দেশটির উত্তরাংশে যেমন ল্যাপল্যান্ডে নিশীথ সূর্যের দেখা মেলে। 

আইসল্যান্ড: যদিও পুরো দেশ আর্কটিক সার্কেলের মধ্যে নয়, তবে আইসল্যান্ডের উত্তরাংশে এই ঘটনা ঘটে।

russia 

রাশিয়া: এই দেশটির মুরমানস্ক এবং সাইবেরিয়ার কিছু অঞ্চলে নিশীথ সূর্য দেখা যায়।

নরওয়েকে ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ বলা হয় কারণ তার উত্তরাঞ্চলে গ্রীষ্মকালে ২৪ ঘণ্টা ধরে আকাশে সূর্য থাকে এবং রাতেও তা অস্ত যায় না। পৃথিবীর অক্ষের ঢাল এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই বিশেষ প্রাকৃতিক ঘটনা ঘটে। এটি কেবল একটি প্রাকৃতিক বিস্ময় নয়, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা এবং পর্যটনের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।

আপনি যদি ভ্রমণপিপাসু হয়ে থাকেন তাহলে ঘুরে আসতে পারেন নিশীথ সূর্যের দেশ নরওয়েতে। 

এনএম

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর