শুক্রবার, ২১ জুন, ২০২৪, ঢাকা

মৌমাছি থেকে মধু: সৃষ্টির এক অপার বিস্ময়

নিশীতা মিতু
প্রকাশিত: ১৪ জুন ২০২২, ১০:৫৮ এএম

শেয়ার করুন:

মৌমাছি থেকে মধু: সৃষ্টির এক অপার বিস্ময়

পরিচিত একটি ছোট পতঙ্গ মৌমাছি। ইংরেজিতে যাদের বলা হয় হানি বি আর আরবিতে নাহাল। এই পতঙ্গ যে রস সঞ্চয় করে তাকে আমরা বলি মধু। মৌমাছি তার নির্দিষ্ট মৌচাকে মধু সংগ্রহ করে এই কথা আমরা সবাই জানি। এই পুরো প্রক্রিয়াটিই রহস্যে ভরপুর। ক্ষুদ্র এই প্রাণীটি থেকে অতি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উপাদান পাওয়ার যাত্রাপথ অপার বিস্ময়ে ভরা। 

মৌমাছির প্রকারভেদ


বিজ্ঞাপন


সামাজিকভাবে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করে মৌমাছি। তাদের প্রতিটি কাজ হয় সুগঠিত। সাধারণত তিন ধরনের মৌমাছি মিলে একটি মৌচাক তৈরি করে। রানী মৌমাছি, কর্মী মৌমাছি ও ড্রোন। 

রানী মৌমাছি: একটি মৌচাকে মাত্র একটিই রানী মৌমাছি থাকে। এটি স্ত্রী মৌমাছি এবং আকারে অন্যদের চেয়ে বড়। রানী মৌমাছির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ডিম পাড়া। এছাড়াও রাসায়নিক বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করে এটি। 

honey beeকর্মী মৌমাছি: আকারে ছোট আকৃতির হয়ে থাকে এ ধরনের মৌমাছি। এরাও স্ত্রী লিঙ্গের হলেও বন্ধ্যা প্রকৃতির বলা যায়। সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা এদের থাকে না। মৌচাকের ভেতরে ও বাইরে সবচেয়ে বেশি কাজ করে কর্মী মৌমাছি। মৌচাক সৃষ্টি থেকে শুরু করে মধু সংগ্রহ করে তা বয়ে আনা- সব কাজ করে তারা। মৌচাকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও কর্মী মৌমাছির দায়িত্ব। 

ড্রোন: দলের পুরুষ সদস্যদের বলা হয় ড্রোন। এদের স্টিংগার নেই। এদের একমাত্র কাজ হলো রানীকে গর্ভধারণে সাহায্য করা। 


বিজ্ঞাপন


মৌমাছির জীবনচক্র

ডিম থেকে পূর্ণতা পেতে বিভিন্ন ধরনের মৌমাছির আলাদা সময় লাগে। ড্রোনরা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ১৪ দিনে। কর্মীদের ক্ষেত্রে লাগে ২১ দিন। আর রানী মৌমাছিটির জন্য লাগে ১৬ দিন। 

honey beeরানী মৌমাছির জীবনের প্রায় পুরোটা সময় কাটে ডিম পাড়া এবং ড্রোনদের মাধ্যমে তা নিষিক্ত করার মাধ্যমে। একটি রানী মৌমাছি দৈনিক প্রায় ২০০০টির মতো ডিম পাড়তে সক্ষম। ডিম পাড়ার আগেই এটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে কোনগুলো নিষিক্ত করবে আর কোনগুলোকে অনিষিক্তই রেখে দেবে।

মৌচাকের প্রতিটি খোপের ভেতরে একটি করে ডিম পাড়ে রানী মৌমাছি, সেখানেই ডিম থেকে লার্ভা এবং লার্ভা থেকে ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ মৌমাছির জন্ম হয়। এদের ডিম দেখতে চাল আকৃতির হয়ে থাকে। রানীর জন্য উপযুক্ত খোপ তৈরি করার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে কর্মী মৌমাছি। কারণ খোপে বিন্দুমাত্র ময়লা থাকলেও, রানী সেখানে ডিম পাড়বে না। 

রানী তার ইচ্ছামতো খোপ বাছাই করে ডিম পাড়ে। অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের খোপগুলোতে পাড়ে নিষিক্ত ডিম আর অপেক্ষাকৃত বড় আকারের খোপগুলোতে অনিষিক্ত ডিম। নিষিক্ত ডিমগুলো থেকে যে লার্ভা বের হয় তা বড় হয়ে কর্মী মৌমাছি হয়। অন্যদিকে অনিষিক্ত ডিম থেকে বের হওয়া লার্ভা বড় হয়ে ড্রোন হয়।

honey beeডিমকে নিষিক্ত করার জন্য রানী মৌমাছি মৌচাকে থাকা পূর্ণাঙ্গ ড্রোনদের সাথে মিলনে লিপ্ত হয়। ড্রোনদের কাজ হলো শারীরিক মিলনের মাধ্যমে রানীর ডিমকে নিষিক্ত করা। কীভাবে রানীর সঙ্গে মিলিত হওয়া যায়- এই চিন্তাই থাকে তাদের মাথায়। যদি কোনো ড্রোন, রানী মৌমাছির সঙ্গে মিলিত হয়, তবে রানী থেকে আলাদা হবার সঙ্গে সঙ্গে তার মৃত্যু অনিবার্য। শারীরিক মিলন ব্যতীত একটি ড্রোন স্বাভাবিক অবস্থায় ৫-৭ সপ্তাহের মতো বাঁচে।

ডিম পাড়ার তিনদিনের মাঝে ডিম ফেটে লার্ভা বেরিয়ে আসে। এরা খুব দ্রুত বড় হয়। এসময় এদের খাদ্য গ্রহণের পরিমাণও বেড়ে যায়। সাধারণত কর্মী ও ড্রোন মৌমাছিদের জন্য খাবার হিসেবে মৌরুটি বরাদ্ধ থাকে। তবে লার্ভা হিসেবে আত্মপ্রকাশের তিনদিন পর্যন্ত সব লার্ভাকেই রাজকীয় জেলি খাওয়ানো হয়। এই জেলির কারণেই তারা দ্রুত বেড়ে ওঠে। তিনদিন পর লার্ভাদেরকে রাজকীয় জেলি খাওয়ানো বন্ধ করে দেওয়া হয়। কেবল যে লার্ভাটি রানী মৌমাছিতে পরিণত হবে তার জন্য এটির ব্যবস্থা রাখা হয়। 

একটি মৌচাকে যদি একাধিক রানী মৌমাছি বড় হতে থাকে তাহলে আগে যেটি পূর্ণাঙ্গ হয়, সেটি অন্যগুলোকে মেরে ফেলে নিজে রানী হবার আশায়। 

honey beeআবার রানীর যদি জীবন সংশয়ের ভয় থাকে তবে কর্মী মৌমাছিরা নিজেদের জীবন দিয়ে হলেও তাকে রক্ষা করে। কারণ, একটি মৌচাকে রানীই একমাত্র ডিম পাড়তে সক্ষম উর্বর মৌমাছি। সাধারণত একটি রানী মৌমাছি সাত বছরের মতো বাঁচে। তবে কর্মীরা চাইলে তাকে মেরে নতুন রানী নিয়োগ দিতে পারে। যখন কোনো রানী ডিম পাড়তে অক্ষম হয় বা ডিম পাড়ার হার কমিয়ে দেয়- তখন পরিস্থিতি বিবেচনায় কর্মীরা রানীকে প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়।

কর্মী মৌমাছি কতদিন বাঁচবে তা নির্ভর করে তাদের কাজের ওপর। বছরের কোন সময়ে জন্ম হয়েছে তার ওপর কাজ নির্ধারিত হয়। যেমন শীতের শুরুতে যেসব কর্মীর জন্ম হয়, তাদের কাজ হয় ঠান্ডা আবহাওয়া থেকে রানীকে রক্ষা করা। এরা শীতের সময়টুকুকে পার করে প্রায় পাঁচমাসের মতো বেঁচে থাকতে সক্ষম। সবচেয়ে কম আয়ু হয় গ্রীষ্মকালের মৌমাছিদের। তাদের প্রখর রৌদ্রতাপে কাজ করতে হয়। ফলে আয়ু হয় ৬ সপ্তাহের মতো।

মৌমাছিদের মধু সংগ্রহ প্রক্রিয়া 

কর্মী মৌমাছিদের একটি দল খুব ভোরেই মধুর খোঁজে বের হয়। এদের কেউ খাবারের সন্ধান পাওয়া মাত্র দ্রুত মৌচাকে ফিরে আসে এবং বিশেষ নৃত্যের মাধ্যমে অন্যদের জানায় কতদূরে খাবার আছে। যদি মাথার ওপরের দিকে নির্দেশ করে নাচে তাহলে বুঝায় যে ফুলগুলো সূর্যের দিকে মুখ করে আছে। মাথা নিচু করে নাচলে বুঝতে হবে সূর্যের বিপরীত দিকে তাকিয়ে তাদের মধু সংগ্রহ করতে হবে। যদি তারা চেনাশোনা নিয়মে ধীরে ধীরে নাচে- এর মানে হলো মধু সংগ্রহের ফুলগুলো কাছে ধারেই রয়েছে। আর দ্রুতগতিতে চক্রাকারে ঘুরলে বুঝতে হবে অনেক দূরে যেতে হবে। 

honey bee

মৌমাছি মাথার ওপর দুইটি অ্যান্টেনা থাকে। ফুলের কোন স্থানে বসবে সেই ব্যাপারে সাহায্য করে এগুলো। বিষয়টি অনেকটা বিমানের পাইলটকে এয়ারপোর্টের রানওয়ের সিগন্যাল যেভাবে বিমান কোথায় ল্যান্ড করবে সে ব্যাপারে সহযোগিতা করার মতো। 

মৌমাছির চোখেও রয়েছে বিস্ময়! এ কারণেই তারা ফুলের অতি ক্ষুদ্র অংশ থেকে মধু খুঁজে বের করতে পারে। মানুষের চোখে লেন্স সংখ্যা দুইটি। কিন্তু মৌমাছির ১টি চোখের লেন্সের সংখ্যা ৬ হাজার। অর্থাৎ ক্ষুদ্র এই পতঙ্গটির অতি ক্ষুদ্র দুই চোখেও রয়েছে ১২ হাজার লেন্স। মৌমাছি ফুলের এত ক্ষুদ্র অংশও দেখতে পারে যা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যেও দেখা সম্ভব নয়। এ কারণে তারা ফুলের অতি ক্ষুদ্র জীবাণুকে বাদ দিয়েও প্রকৃত রস বা অমৃত আহরণ করতে সক্ষম হয়। 

ফুলের রস আহরণের জন্য এদের টিউবের মতো জিহবা রয়েছে। আমরা যেভাবে স্ট্রর সাহায্যে শরবত পান করি, তেমনি এরা ফুলের রস পান করে। মৌমাছির পাকস্থলীর ওপর একটি বিশেষ অঙ্গ থাকে যাকে মধুথলি বলে। এখানে এরা মধু সংরক্ষণ করে। ফুলে মিষ্টি রস যা নেক্টার নামে পরিচিত, তা থাকে অতি স্বল্প পরিমাণে। মধুথলি পূর্ণ করতে একটি মৌমাছিকে ১০০০ এর বেশি ফুলের মধু সংগ্রহ করতে হয়। ফুলের মিষ্টি রসের সঙ্গে লালা গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন উৎসেচক মিশ্রিত হয়। ফলে এই রস আংশিক মধুতে পরিণত হয়। 

honey beeফুল থেকে মধু পানের সময় মৌমাছি তার পায়ে থাকা বিশেষ ঝাঁপি বা টুকরিতে ফুলের হলুদ রঙ বা পরাগ সংগ্রহ করে। এরপর চাকে ফিরে ফুলের রস আর হলুদ রঙের সাহায্যে তৈরি করে মধু। 

যেভাবে মধু তৈরি হয় 

মৌচাকের একটি খালি ঘরের তাপমাত্রা ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে থাকে। কর্মী মৌমাছি মধুথলিতে বয়ে আনা ফুলের রস এখানে সংরক্ষণ করে। এই রসে জলীয় অংশও মিশে থাকে। এরপর কর্মী মৌমাছিদের কাজ হলো রস থেকে আর্দ্রতার মাত্রা হ্রাস করা। তারা জোরে জোরে ডানা নেড়ে মধু থেকে বাড়তি পানি সরিয়ে দেয়। এই প্রক্রিয়াটি কয়েকদিন স্থায়ী হয়। আর্দ্রতা হারিয়ে পাতলা রস ঘন মধুতে পরিণত হয়।

মৌচাকের একটি ঘরে ৭০ শতাংশ ফুলের রস রাখলে তা ২০ শতাংশ মধুতে পরিণত হয়। মধুর মান নিশ্চিত হলে তারা মোমের খুব পাতলা আবরণের সাহায্যে প্রকোষ্ঠর মুখ আঁটকে দেয়। এই প্রক্রিয়াকে সেল ক্যাপিং বলা হয়। বাড়তি জলীয় অংশ সরিয়ে ফেলা হয় বলে মধু দীর্ঘদিন ভালো থাকে।

honey beeমৌমাছির মৌচাকও এক অপূর্ব সৃষ্টি। চাকের একটি প্রকোষ্ঠের সঙ্গে অন্যটি সমান্তরালভাবে অবস্থান করে। প্রকোষ্ঠগুলো হয় ষড়ভুজ আকৃতির। ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যায় নির্দিষ্ট নকশা ও মাপ অনুযায়ী এই প্রকোষ্ঠগুলো তৈরি। রানীর জন্য তৈরি করা হয় বেশ বড় প্রকোষ্ঠ। কর্মীদের জন্য অপেক্ষাকৃত মাঝারি প্রকোষ্ঠ বরাদ্ধ। ওপরের দিকের ঘরগুলোতে থাকে মধু আর নিচের প্রকোষ্ঠগুলোতে ডিম ও লার্ভা থাকে। 

সবমিলিয়ে বলা যায়, মৌমাছির শারীরিক গঠন থেকে শুরু করে জীবনচক্র, বাসস্থান, রস সংগ্রহ প্রক্রিয়া ও মধু সৃষ্টি- সবটা জুড়েই রয়েছে বিস্ময়। 

এনএম

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর