সোশ্যাল মিডিয়ায় কখন যে কীসের ট্রেন্ড চলে তা ঠাওর করা মুশকিল। কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে যখন সবাই মতামত জানায় তখন তার ট্রেন্ড চলে। আবার কখনো এই পথের পথিক হয় হাস্যকর কোনো বিষয়। এই যেমন গেল কদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি খাবারকে কেন্দ্র করে চলছে অনলাইন দলাদলি।
ছোট গোলাকার মিষ্টান্নকে কেউ বলছেন বুন্দিয়া। আবার কেউ বলছেন বুরিন্দা। আসলে কোনটি সঠিক? চলুন ভাষা আর ইতিহাসের পাতায় ঘুরে আসা যাক-
বিজ্ঞাপন
বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় মিষ্টান্ন বুন্দিয়া বা বোঁদে বা বুরিন্দা। এটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ও ত্রিপুরায় পাওয়া যায়। বেসন তেলে ভেজে সিরায় ডুবিয়ে বুন্দিয়া তৈরি করা হয়।
উৎপত্তি
বুন্দ একটি হিন্দি শব্দ। এর বাংলা হচ্ছে ফোটা। যেহেতু এই মিষ্টি ফোটা-ফোটা বেসনের গোলায় তৈরি হয় তাই এর নাম বুন্দে। অনেকে যাকে বুন্দিয়া বলে।
‘বুন্দিয়া’ শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে সংস্কৃত শব্দ 'বিন্দুক' থেকে। বাংলাদেশ ও ভারতের অন্যতম প্রাচীন মিষ্টান্ন এটি। প্রাচীন সাহিত্যে এই মিষ্টান্নের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বিরিকলাই গুঁড়ো, চিনি আর ঘি এর মিশ্রণে এই মিষ্টান্ন প্রস্তুত করা কথা বলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন

কীভাবে বানানো হয়
চালের গুঁড়া আর বেসন মিশিয়ে তাতে পানি দিয়ে একটি থকথকে তরল মিশ্রণ প্রস্তুত করা হয়। এরপর একটি ছিদ্রযুক্ত ছানতা বা ঝাঁঝরির মধ্য দিয়ে বিন্দু বিন্দু তরল মিশ্রণ কড়াইয়ে ফুটন্ত তেল/ঘিয়ে ছাড়া হয়। কড়া করে ভাজা হলে গোলকৃতি দানাগুলো সামান্য চিনির সিরায় ডুবিয়ে রাখা হয়। এভাবেই তৈরি হয় বুন্দিয়া বা বুরিন্দা।
প্রকারভেদ
সাধারণত এই মিষ্টান্নটি লালচে রঙের হয়। তেল বা ঘিয়ে ভাজা বুন্দিয়া জাফরান মেশানো (বাধ্যতামূলক নয়) চিনির রসে ডোবালে লালচে হয়। তবে এর আরেকটি প্রকারভেদ হলো সাদা বুন্দিয়া।
বাংলাদেশে হলদে আর লালচে মিশ্রণের বুন্দিয়া বেশি প্রচলিত। সারা দেশেই এটি পাওয়া যায়। সবসময় বানানো হলেও রমজানে এর চাহিদা বেড়ে যায় বহুগুণ। পশ্চিমবঙ্গে সাদা বুন্দিয়া কিছু বিশেষ অঞ্চলেই প্রসিদ্ধ। এর মধ্যে হুগলি জেলার জনাই ও কামারপুকুর-জয়রামবাটী অন্যতম।
জনাইয়ের বড়ো বোঁদে পটলাকৃতি, কামারপুকুর-জয়রামবাটীর সাদা বোঁদে গোলাকৃতির হয়ে থাকে। জয়রামবাটীর সাদা বুন্দিয়ার মূল উপাদান বরবটি দানার গুঁড়ো বা বরবটি বেসন, আতপ চাল ও গাওয়া ঘি। বরবটির বেসন আর আতপ চালের গুঁড়ো ১:২ অনুপাতে মিশিয়ে সারা রাত ভিজিয়ে রাখতে হয়। পরের দিন সেই মিশ্রণকে ঝাঁঝরির ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে কড়াইয়ে ফুটন্ত গাওয়া ঘিতে ফেলা হয়। ভাজা হলে চিনির রসে ডুবিয়ে রাখা হয়। ভারতে এটি সাদা বোঁদে হিসেবে পরিচিত।
বুরিন্দা নাকি বুন্দিয়া?
ছোট গোলাকার বিন্দু বিন্দু মিষ্টান্নটির প্রমিত বাংলা হলো বুঁদিয়া বা বোঁদে (বুদে)। বুরিন্দা বা বুন্দিয়া কোনটিই সঠিক নয়। এই দুটো শব্দই প্রচলিত অশুদ্ধ।
বোঁদের জনপ্রিয়তা
কথিত আছে যে রামকৃষ্ণ পরমহংস সাদা বোঁদে খেতে অত্যন্ত ভালবাসতেন। জয়রামবাটীর সাদা বোঁদে ভক্ত ও ভ্রমণার্থীদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত কল্যাণী কাব্যগ্রন্থের ঔদারিক গানে রজনীকান্ত সেন বাংলার বিভিন্ন প্রকার মিষ্টান্নের উল্লেখ করেছেন। ঔদারিক গানে বুঁদিয়া বা বোঁদের উল্লেখ পাওয়া যায়-
‘যদি, কুমড়োর মত, চালে ধ’রে র’ত,
পান্তোয়া শত শত;
আর, সরষের মত, হ’ত মিহিদানা
বুঁদিয়া বুটের মতো!’
বুন্দিয়া বলুন আর বুরিন্দা- দুটো একই জিনিস। তবে ভাষাগত দিক থেকে যদি কোনটি সঠিক তা জানতে চান তাহলে উত্তর হবে বোঁদে বা বুঁদিয়া।
এনএম




