লন্ডন প্রবাসী সিলেটিদের পছন্দের শীর্ষে ‘সাতকরার আচার’

ডি এইচ মান্না
প্রকাশিত: ১৩ মে ২০২২, ১০:৪৮ এএম
লন্ডন প্রবাসী সিলেটিদের পছন্দের শীর্ষে ‘সাতকরার আচার’

সিলেটের ঐহিত্য সাতকরা। স্থানীয়রা এতে হাতকরা নামেও চেনেন। সাতকরা এক ধরনের বিশেষ ঘ্রাণযুক্ত টক জাতীয় সবজি। স্বাদে টক ও কিছুটা তিতা হলেও এ সবজি ভীষণ জনপ্রিয়। শুধু দেশে নয় প্রবাসী সিলেটিদেরও পছন্দ তালিকার শীর্ষে সাতকরা। বিশেষ করে লন্ডন প্রবাসী সিলেটিদের কাছে সাতকরা যেনো সোনার হরিণ। তাদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে সাতকরার আচার। 

সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস রান্না খুব বেশি জনপ্রিয় হলেও এর সঙ্গে ছোট মাছ আর ডালও রান্না হয় সিলেটে। মসুর ডালের সঙ্গে সাতকরা রান্নার পর একধরনের ঘ্রাণ ভোজনপ্রমীদের মুগ্ধ করে। স্বাদে যোগ করে ভিন্নতা।

সাতকরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিলেটের বাজারের বিক্রি হওয়া সাতকরার বেশ কয়েকটি জাত রয়েছে ৷ তবে চেলা, লুছাই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। 

চেলা জাতের সাতকরা দেখতে প্রথমে কড়া সবুজ কালারের হয় এবং স্বাদ তিতা হয়। লুছাই জাতের সাতকরা বড় আকৃতির এবং দেখতে হলদে বর্ণের হয়। স্বাদে মিষ্টি হয় লুছাই।

সিলেট নগরীর বন্দর বাজারের প্রায় ৪৫ বছর ধরে সাতকরা বিক্রি করেন দুদু মিয়া। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, এখন সাতকরার দাম তুলনামূলক কিছুটা ভাবে কম। ছোট আকারের সাতকরা ৮০ টাকা। বড় আকারের সাতকরার হালি ২০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। সাতকরার সিজন মাত্র শুরু হয়েছে। আগামীতে দাম আরও কমবে।

SATKORAতিনি জানান, কোরবানির ঈদের সময় সাতকরার ভরা মৌসুম থাকে।  

সিলেটে কাঁচা সাতকরার পাশাপাশি প্যাকেটজাত শুকনা সাতকরাও মেলে।
  
বন্দর বাজারের আরেক ব্যবসায়ী ছালেক আহমদ জানান, তিনি দীর্ঘদিন থেকে সাতকরা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি প্রতি হালি সাতকরা আকারভেধে ৫০ থেকে ১২০ টাকা বিক্রি করছেন। 

তিনি বলেন, বাজারে বর্তমানে যে সাতকরা বিক্রি হচ্ছে তা এই সিজনের নতুন সাতকরা। এগুলো ছোট মাছের সঙ্গে রান্না করলে স্বাদে ভিন্নতা পাওয়া যাবে।

সাতকরার উপকারিতা

সাতকরায় আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস। যা মানব দেহের জন্য দারুণ উপকারী। এছাড়াও বহু রাসায়নিক গুণেসমৃদ্ধ সাতকরা। যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। 

ঈদে বাড়ে কদর

সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস। সঙ্গে চালের গুড়ার পরোটা। এছাড়া যেনো সিলেটিদের ঈদ জমেই না। তাই কোরবানির ঈদে সাতকরার চাহিদা ও দাম দুটিই বেড়ে যায় বহুগুণ। 

সাতকরার আচার

সিলেটে দিনদিন সাতকরার দিয়ে তৈরি আচার জনপ্রিয় হয়ে ওঠছে। অনেক সিলেটি বাসায় নিজে নিজে সাতকারার দিয়ে এই বিশেষ আচার তৈরি করেন। তবে বর্তমানে সিলেটে বাণিজ্যিকভাবে সাতকরার আচার প্রস্তুত করছে কয়েকটি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি মাসে কয়েক হাজার বোতলজাত আচার যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এসব আচারের ক্রেতা মূলত প্রবাসী সিলেটিরা।

সিলেটের কোথায় মেলে সাতকরা?

সিলেটের জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা এমনকি গ্রামের বাজারে সাতকরা পাওয়া যায় সারাবছর। তবে সিলেট নগরীর সোবহানীঘাটে পাইকারি সাতকরার সবচেয়ে বড় বাজার। যেটি সিলেটে কাঁচাবাজার হিসেবে পরিচিত। সোবহানীঘাটের এই বাজারে সাতকরাসহ সবধরনের শাকসবজির পাইকারি কিনতে পাওয়া যায়। এছাড়াও খুচরা বিক্রি হয় সিলেট শহরের বন্দরবাজার, আম্বরখানা, সুবিদবাজার, পাঠানটোলা, শিবগঞ্জ, টিলাগড়সহ সবগুলো  সুপারশপে। তবে সুপারশপে দাম হবে তুলনামূলক একটু  বেশি।

SATKORAসাতকরা চাষাবাদ

আঠারো শতকে সিলেটের সীমান্তের ওপারে ভারতের আসাম রাজ্যে ব্যাপকভাবে ‘সাতকরা’ চাষ হতো। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ‘সাতকরা’ চাষ শুরু হয় সিলেটের পাহাড়ি এলাকায়। সিলেটের জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাটের জাফলং, বিয়ানীবাজার ও মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় একসময় ভালো চাষ হত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিলেটের চাহিদার তুলনায় কমেছে সাতকরার চাষ। তাই বর্তমানে 
পার্শ্ববর্তী ভারতের আসাম-করিমগঞ্জ থেকে আমদানিকৃত সাতকরাই সিলেটের বড় চাহিদা মেটাচ্ছে। 

পাহাড়-টিলা অঞ্চলে সাধারণত সাতকরার চাষ হয়। গাছের উচ্চতা সাধারণত ২০ থেকে ২৫ ফুট পর্যন্ত হয়। সাতকরা সাধারণত বসন্ত ঋতুতে সাতকরার গাছে ফুল ফোটে এবং শ্রাবণ থেকে ভাদ্র মাসে এ সবজি পরিপক্ব হয়।  

সাতকরা সংরক্ষণের উপায়

সাতকরা লম্বালম্বিভাবে কেটে কয়েকদিন প্রচন্ড রোদে শুকিয়ে নিন। এরপর কৌটায় ভরে রাখুন। রান্নার এক ঘণ্টা আগে পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। এরপর এটা দিয়ে মাছ কিংবা মাংস রান্না করলে তাজা সাতকরার স্বাদ পাবেন। 

এজেড