বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

হানিফের রায়কে ‘সময়োপযোগী’ বলল প্রসিকিউশন, রায়ে ‘হতাশ’ স্টেট ডিফেন্স

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম

শেয়ার করুন:

হানিফের রায়কে ‘সময়োপযোগী’ বলল প্রসিকিউশন, রায়ে ‘হতাশ’ স্টেট ডিফেন্স

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়কে ‘ঐতিহাসিক ও সময়োপযোগী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে এ রায়কে ‘অপ্রত্যাশিত’ উল্লেখ করে হতাশা প্রকাশ করেছেন আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি) আতাউর রহমান আতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত।

পাশাপাশি পলাতক এই চার আসামির প্রত্যেকের অর্ধেক (৫০ শতাংশ) স্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা ‘জুলাই ফাউন্ডেশন’ বা বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে শহীদ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রসিকিউশন ও স্টেট ডিফেন্স- উভয়পক্ষই নিজেদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেন।

‘হানিফের নির্দেশেই কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ড, রায় সময়োপযোগী’: চিফ প্রসিকিউটর

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে রায়কে স্বাগত জানিয়ে ‘অত্যন্ত সময়োপযোগী’ বলে উল্লেখ করেছেন। 

আসামিদের সাজার কারণ ও অপরাধের মাত্রা ব্যাখ্যা করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আসামিদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগই (কাউন্ট) সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এক নম্বর অভিযোগে মাহবুবউল আলম হানিফের ব্যক্তিগত দায় এবং সহযোগীদের দায় প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বাকি দুটি অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে অন্য তিনজন আসামিকে এক নম্বর অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং বাকি দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে।’

হানিফের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই, ১৭ জুলাই, ৩১ জুলাই এবং পাঁচ আগস্ট তৎকালীন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে হানিফ সক্রিয় সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে বলপ্রয়োগ ও গুলির যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে মাহবুবউল আলম হানিফ উপস্থিত ছিলেন। তিনি জাতীয় প্রেসক্লাবে বসেও আন্দোলন দমনে নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।

কুষ্টিয়ার হত্যাকাণ্ডের নির্দেশনার সংযোগ তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘হানিফ ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কাছে নির্দেশনা পাঠান। সেই নির্দেশনার প্রেক্ষিতে গত বছরের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়ায় সদর উদ্দিন খান, আজগর আলী ও আতাউর রহমান আতার উপস্থিতিতে জেলা আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে মিটিং হয়। সেখানে আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়। তারই ধারাবাহিকতায় আন্দোলন চলাকালে কুষ্টিয়ায় পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা করা হয়। ফলে অধস্তনদের ওপর নির্দেশনার দায় এবং ব্যক্তিগত দায় উভয়ই হানিফের ওপর বর্তেছে।’

সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আসামিদের স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্তের স্পষ্ট আদেশ হয়েছে। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়ার পর আমরা সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি লিখব, যাতে এই সম্পত্তিগুলো সরকারের আয়ত্তে এনে দ্রুত বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। এরপর বিক্রয়লব্ধ অর্থ জুলাই ফাউন্ডেশন বা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ও শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে বণ্টন করা হবে।’

হানিফের বিদেশে থাকা সম্পদ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, দেশের বাইরে হানিফের সম্পত্তি থাকলে তা সরকার আইনগতভাবে খুঁজে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

দণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামিই অনুপস্থিত থাকা প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি এবং পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিসহ সব আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়েছিল। কিন্তু তাদের বাংলাদেশে শনাক্ত করা যায়নি। আমরা মনে করি, তারা দেশে নেই, সীমান্ত পেরিয়ে বাইরে চলে গেছেন। তাদের গ্রেফতার করে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য যে আইনগত প্রক্রিয়া রয়েছে, তা নেওয়া হবে।’

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর মামলার সাজা নিয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট করে বলেন, ‘ইনু সাহেবকে ১০ বছর নয়, তিনটি কাউন্টে মোট ৩০ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছিল। তবে আদালত তার নিজস্ব এখতিয়ার (ডিসক্রেশন) প্রয়োগ করে সাজাগুলো একত্রে কার্যকর (কনকারেন্টলি) করার আদেশ দিয়েছিলেন। আইনগতভাবে তিনটি কাউন্টেই তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। প্রসিকিউশন মনে করে তার সাজা বাড়ানো উচিত, তাই ওই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা ইতোমধ্যে আপিল করেছি।’

‘রায় অপ্রত্যাশিত, আমি হতাশ’: আসামিপক্ষের আইনজীবী

অন্যদিকে, অনুপস্থিত চার আসামির পক্ষে আইনি লড়াই চালানো রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী (স্টেট ডিফেন্স) মো. আমির হোসেন রায়ের প্রতিক্রিয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ‘আপনারা সবাই এজলাসে উপস্থিত ছিলেন এবং ট্রাইব্যুনালের রায় শুনেছেন। রায় সম্পর্কে বিস্তারিত আমার আর কিছু বলার নেই। তবে এটুকু বলব, এই রায়টি আমার কাছে অপ্রত্যাশিত মনে হয়েছে এবং আমি হতাশ।’

মামলার প্রেক্ষাপট ও বিচারিক পথপরিক্রমা

এর আগে গত ৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি-পাল্টা যুক্তি খণ্ডন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২৭ অক্টোবর রায় ঘোষণার দিন হিসেবে ২৯ অক্টোবর ধার্য করা হয়।

চলতি বছরের ১০ জুন যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি প্রথমবারের মতো রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। তবে প্রসিকিউশন অতিরিক্ত কিছু তথ্য-প্রমাণ দাখিল করায় পুনরায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ দেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত ২৩ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তার জেরা সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে মামলায় মোট ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত হয়েছিল।

২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। ৬ অক্টোবর অভিযোগ আমলে নিয়ে ২ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।

কুষ্টিয়ায় যে হত্যাকাণ্ডে এ দণ্ড

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কুষ্টিয়ায় হাজারো মানুষ শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে হাসপাতাল মোড় থেকে চৌড়হাস হয়ে মজমপুরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তখন আসামিদের পূর্বপরিকল্পনা ও নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা পুলিশের ছত্রছায়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালান।

এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ। শহরের বক চত্বর, বার্মিজ গলি, হরিপুর সড়কের আড়ংয়ের সামনে, তুলাপট্টির গলি ও ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত সড়কের বিভিন্ন স্থানে তারা গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। হত্যাকাণ্ডে নির্দেশ, উসকানি ও প্ররোচনা দেওয়ায় আসামিদের বিরুদ্ধে এই ঐতিহাসিক রায় দেন ট্রাইব্যুনাল।

আরএনবি/এসআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর