স্বামীর কথিত ক্যাসিনো ব্যবসার আয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় খালাস পেয়েছেন সুমি রহমান নামের এক নারী।
মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্রের মধ্যে গুরুতর অসংগতি এবং তদন্ত কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী জবানবন্দির কারণে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে বলে রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
‘সুমি রহমান বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য’ শীর্ষক ফৌজদারি আপিলের শুনানি শেষে বিচারপতি শেখ তাহসীন আলীর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২৮ জুলাই এ রায় দেন। গত ১৮ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ২৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়েছে।
আদালতে আপিলকারী সুমি রহমানের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মো. আশরাফ আলী ও আইনজীবী মো. জিয়াউল করিম খান।
দুদকের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. ওমর ফারুক এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান।
মামলার পটভূমি
রায়ের বিবরণী অনুযায়ী, তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়, ঢাকা-১ এ এই মামলা দায়ের করা হয়। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের তৎকালীন উপপরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান বাদী হয়ে ঢাকার বাসিন্দা সুমি রহমান ও তার স্বামীকে আসামি করে এ মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে অভিযোগ আনা হয়, আসামি সুমি রহমান ২০১৮-২০১৯ কর বর্ষ পর্যন্ত নিজ নামে ১ কোটি ৩১ লাখ ১৬ হাজার ৫০০ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অবৈধ ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূতভাবে অর্জন করেছেন। বলা হয়, তার কোনো বৈধ আয়ের উৎস ছিল না; স্বামীর অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা ও অন্যান্য অবৈধ উৎস থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি এসব সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সুমি রহমানের ট্যাক্স ফাইল মূল্যায়নে দেখা যায় তার স্থাবর সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য ২৫ লাখ ৫১ হাজার ২৫৩ টাকা এবং মোট নিট সম্পদের আনুমানিক মূল্য ২ কোটি ৬৩ লাখ ৬২ হাজার ২১৮ টাকা। ২০১৫-২০১৬ কর বর্ষে তিনি প্রথম আয়কর দেওয়া শুরু করেন এবং ফাইলে ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা আয় দেখান। অথচ তিনি ২০১১ সালের ২৬ মে ১১ লাখ টাকায় ঢাকায় এক খণ্ড জমি এবং একই বছরের ৩০ অক্টোবর রাজধানীর শুক্রাবাদে একটি পাঁচতলা বাড়ি কেনেন।
তদন্তকালে ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তথ্যের বরাতে বলা হয়, সুমি রহমানের কাছে ১ কোটি ২ লাখ ২০ হাজার ৯৬৫ টাকা পাওয়া যায় এবং তার মোট স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২ কোটি ৬৩ লাখ ৬২ হাজার ২১৮ টাকা। এ ছাড়া তিনি মুরগির খামারে ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ দেখিয়ে পরের বছরই সেখান থেকে ১ কোটি ২৫ লাখ ২০ হাজার ৫০০ টাকা আয় দেখান, যা এজাহারে ‘অবিশ্বাস্য ও কাল্পনিক’ বলে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ করা হয়, স্বামীর ব্যাংক হিসাব থেকে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে তিনি এসব সম্পদ অর্জন করেন। সুমি রহমানের স্বামীর অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে পৃথক মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলেও জানানো হয়েছিল।
বিচারিক আদালতের রায় ও আপিল
দুদক অভিযোগপত্র দাখিল করার পর এই মামলা ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত থেকে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। আদালত সুমি রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করলেও তার স্বামীকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেন।
বিচার শেষে ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার বিচারিক আদালত সুমি রহমানকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তার নামে থাকা প্রায় ২ কোটি ৬১ লাখ ৬২ হাজার ২১৮ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে হাইকোর্টে ফৌজদারি আপিল করেন সুমি রহমান। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট তাকে ছয় মাসের জামিন দেন, যা পরবর্তীতে আরও বাড়ানো হয়।
আপিল শুনানিতে সুমি রহমানের আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন নিম্ন আদালতের রায় সাক্ষ্যপ্রমাণের সম্পূর্ণ পরিপন্থি এমন যুক্তি দেখিয়ে বলেন, এজাহার দায়েরের সময় বাদী অভিযোগ করেছিলেন যে, আপিলকারী তার স্বামীর অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসা থেকে এসব সম্পদ অর্জন করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে দাখিল করা অভিযোগপত্রে সেই ‘ক্যাসিনো ব্যবসা’ সম্পর্কে একটি শব্দও উল্লেখ করা হয়নি।
অন্যদিকে দুদকের আইনজীবী মো. ওমর ফারুক যুক্তি দেন, আপিলকারী যদি দাবি করেন যে তিনি বিতর্কিত সম্পত্তিগুলো তার ব্যবসায়ী বাবার কাছ থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছেন, তবে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(২) ধারা অনুযায়ী তাকে তার বাবার আয়ের বৈধ উৎস প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু বিচারিক আদালতে আপিলকারী তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও চূড়ান্ত রায়
নথিপত্র পর্যালোচনা করে রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (পিডব্লিউ-১) যদি আপিলকারীর বাবার আয়কর ফাইল যথাযথভাবে পরীক্ষা করতেন, তবে তার বাবার প্রকৃত আয়ের উৎস জানতে পারতেন। যে বাবা মেয়েকে অ্যাপার্টমেন্ট উপহার দিয়েছেন, তার আয়ের উৎস প্রমাণের দায় থেকে আপিলকারী অব্যাহতি পাবেন।
আদালত আরও পর্যবেক্ষণ দেন, মামলার এজাহার ও অভিযোগপত্রের বিবরণ এতটাই পরস্পরবিরোধী যে, একই ব্যক্তি তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দুই দফায় (পিডব্লিউ-১ ও পিডব্লিউ-১৩) আপিলকারীর আয়ের উৎসের বিষয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন জবানবন্দি দিয়েছেন। এটি মামলার বিচারে মারাত্মক ত্রুটি সৃষ্টি করেছে এবং প্রসিকিউশন আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
রায়ে বলা হয়, মামলার মূল ও সহ-আসামি সুমি রহমানের স্বামী দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৭(১) ধারার অভিযোগ থেকে আগেই অব্যাহতি পেয়েছেন। ফলে এই আপিলকারীও একই ধরনের আইনি সুবিধা পাওয়ার অধিকারী।
সার্বিক দিক বিবেচনা করে হাইকোর্ট সুমি রহমানের আপিল মঞ্জুর করেন। এর ফলে ঢাকার বিচারিক আদালতের দেওয়া কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ বাতিল করে সুমি রহমানকে খালাস দেওয়া হয়। একই সঙ্গে জব্দ করা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ প্রত্যাহার করে মামলার নথিপত্র দ্রুত নিম্ন আদালতে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
আরএনবি/এফএ




