আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে মামলায় সাক্ষ্য দিচ্ছেন, সেই মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে ঠিক কত তারিখে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, তা জানেন না বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে ১৫তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষের জেরায় এ কথা বলেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম।
এদিন আদালতে উপস্থিত আসামি জিয়াউল আহসানের পক্ষে ওই সাক্ষীকে জেরা করেন আইনজীবী মো. সাহিদুর রহমান। জেরার এক পর্যায়ে আইনজীবী জানতে চান, আইসিটি বিডি ০৯/২০২৫ নম্বরের এই মামলায় জিয়াউল আহসানকে কবে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে?
জবাবে সাক্ষী বলেন, ‘এই মামলায় কত তারিখে জিয়াউল আহসানকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে জানি না।’
ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে তার জেরা চলমান রয়েছে। এ নিয়ে এই মামলায় তৃতীয় দিনের মতো তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ অনুষ্ঠিত হল। অবশিষ্ট সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ট্রাইব্যুনাল আগামী মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।
এদিন রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর এম এইচ তামিম, শাইখ মাহাদীসহ অন্যরা।
প্রসিকিউশন জানায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ওইদিন তিনি আংশিক জবানবন্দি দেন। বৃহস্পতিবার তার জবানবন্দি শেষ হওয়ার পর আসামিপক্ষ জেরা শুরু করেন।
তবে এর আগে, আদালতে দেওয়া দীর্ঘ জবানবন্দিতে এই সাক্ষী ও তদন্তকারী কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুম, খুন, পেট ফেড়ে নদীতে লাশ ডুবিয়ে দেওয়া এবং বানোয়াট ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে অন্তত ১৫০ জনকে হত্যার বিবরণ তুলে ধরেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে জানান এই তদন্তকারী কর্মকর্তা।
অভিযোগ ১: স্বহস্তে চার বন্দিকে গুলি করে হত্যা
রফিকুল ইসলাম তার জবানবন্দিতে জানান, ২০১১ সালের ১১ জুলাই দিবাগত রাতে র্যাবের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-৩ এর একটি দল অবৈধ হেফাজতে থাকা সজলসহ তিন বন্দিকে নিয়ে সদর দফতর থেকে টঙ্গী হয়ে ঢাকা বাইপাস সড়ক ধরে রওনা হয়। পথে একটি ব্রিজের ওপর গাড়ি থামিয়ে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে এক বন্দিকে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় নামানো হয়। সেখানে জিয়াউল আহসান নিজেই তাকে গুলি করে হত্যা করে লাশ ব্রিজের নিচে পানিতে ফেলে দেন।
কিছুদূর গিয়ে আরেকটি বড় ব্রিজের ওপর আরেক বন্দিকে নামানো হয়। জিয়াউল আহসান তার এক সহকর্মীকে গুলি করার নির্দেশ দিলে তিনি অস্বীকৃতি জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে জিয়াউল নিজেই ওই বন্দিকে গুলি করে হত্যা করে লাশ নিচে ফেলে দেন।
একইভাবে আরও এগিয়ে তৃতীয় বন্দীকেও তিনি নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করেন। পরবর্তীতে তার নির্দেশে অপর এক বন্দিকে র্যাবের দুই সদস্য গুলি করে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয়' বলে ট্রাইব্যুনালে উল্লেখ করেন তিনি।
অভিযোগ ২: পেট ফেড়ে নদীতে লাশ, গুম হলেন ট্রলার মাঝিও
এই তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলাম মল্লিক নাম গোপন করে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় মধুমতি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করতেন। ২০১০ সালের ১৫ মার্চ র্যাব তাকে আটক করে গোপন স্থানে রাখে। ১০-১৫ মে’র মধ্যে নজরুলসহ ৩-৪ জনকে নিয়ে জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে র্যাবের গোয়েন্দা দল ও র্যাব-৮ এর সদস্যরা বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী খালের বরফকল ঘাট থেকে ট্রলারযোগে বলেশ্বর নদীতে যান।
তিনি জানান, সেখানে ট্রলারের ওপর নজরুলসহ ওই বন্দিদের জিয়াউল আহসানের নির্দেশে গুলি করে হত্যার পর পেট ছুরি দিয়ে ফেড়ে সিমেন্টের ব্লক বেঁধে পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। ১৭ মে বাগেরহাটের শরণখোলার চর রায়েন্দা (বা চাল রায়েন্দা) গ্রামে বলেশ্বর নদীর তীরে একটি বিকৃত লাশ উদ্ধার করে অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করে পুলিশ। পরে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে সেটি নজরুল ইসলাম মল্লিকের বলে শনাক্ত হলে পরিবার লাশটি উত্তোলন করে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করে।
এই ‘গেস্টাপো পদ্ধতির’ হত্যাকাণ্ডের জন্য র্যাব-৮ এর মাধ্যমে আলকাছ মল্লিকসহ বিভিন্ন মাঝির ফিশিং বোট ভাড়া করা হয়েছিল। আলকাছ বিষয়টি পরিচিতদের জানিয়ে দিলে ক্ষিপ্ত হন জিয়াউল আহসান। তার নির্দেশে ২০১১ সালের ১৫ জুন আলকাছ মল্লিককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় র্যাব। এরপর তার আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। র্যাবের আচরণে পরিবারের বিশ্বাস, তাকেও নদীতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে তুলে ধরেন এই মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা এই সাক্ষী।
অভিযোগ ৩: সুন্দরবনে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ত্রিমাত্রিক নাটক
রফিকুল ইসলামের ভাষ্য, ২০১১ সালের ১২ নভেম্বর খুলনার দাকোপের নিশানখালীতে বনদস্যু দমনের নামে মাসুম (বা মাসুদ) ও মান্নান নামের দুই বন্দিকে চোখ ও হাত বেঁধে চরদুয়ানী থেকে ট্রলারযোগে জঙ্গলে নিয়ে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়।
২০১২ সালের ১৬ মার্চ বাগেরহাটের শরণখোলায় মরাভোলা খালের পাড়ে একইভাবে আগে থেকে আটক জিহাদ, সোহাগ, আল-আমিন, আসাদ ও বেল্লালকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডকে বনদস্যু অভিযান হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য করতে র্যাব হেলিকপ্টারও ব্যবহার করেছিল। হত্যার পর তাদের লাশ থানায় জমা দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন এর আগে ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে চরদুয়ানী থেকে সুন্দরবনের কটকা যাওয়ার পথে শিশির কুমার মণ্ডল ওরফে মন্টু মেম্বার, বাচ্চু, জামাল মুন্সীসহ ৮ জন বন্দিকে ট্রলারে ওঠানো হয়।
রাত ১-২টার দিকে অজ্ঞাত ৪ জনকে ট্রলারের ওপর গুলি করে হত্যা করে পেট ফেড়ে বলেশ্বর নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে কটকার দুধমুখী গাং সংলগ্ন এলাকায় নিয়ে মন্টু মেম্বার, বাচ্চু, জামাল মুন্সী ও অজ্ঞাত আরও একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া তার প্রতিবেদনে বলা হয়, বিচারবহির্ভূত এসব হত্যার ঘটনা সামনে এলে লোক দেখানো নির্বাহী তদন্তের মাধ্যমে তা বৈধতা দেওয়া হতো। সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পরিবর্তন করে অসত্য প্রতিবেদন দিতে বাধ্য করা হতো; যার প্রমাণ ভিকটিম নজরুলের সুরতহাল ও পোস্টমর্টেম রিপোর্টে পাওয়া গেছে, যার সাথে জিয়াউল আহসান সরাসরি জড়িত বলে দাবি তার।
ট্রাইব্যুনালে তদন্ত প্রতিবেদন
তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, আইন ও বিচারের তোয়াক্কা না করে ভিকটিম সজল, নজরুল, আলকাছ, মাসুম, মান্নান, জিহাদ, সোহাগ, আল-আমিন, আসাদ, বেল্লাল, মন্টু মেম্বার, বাচ্চু ও জামাল মুন্সীসহ অন্তত ১৫০ জনকে হত্যা ও হত্যার নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, ‘১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(২) এর সংশ্লিষ্ট উপধারা ও ৪(১), (২), (৩) ধারায় অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় বিচারের জন্য গত ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে চিফ প্রসিকিউটর বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে তদন্ত অব্যাহত রাখেন।’
মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা এই সাক্ষী জানান, অন্য একটি মামলায় কারাবন্দি থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে জিয়াউল আহসানকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয় এবং পরে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। বর্তমানে তিনি কাস্টডিতে আছেন।
আরএনবি/এএম




