বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলা: হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ৪ আসামির আপিল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৩৪ পিএম

শেয়ার করুন:

ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলা: হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ৪ আসামির আপিল
সুপ্রিম কোর্ট ও ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলাসহ চার আসামির পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়ের করা হয়েছে।

আপিলকারী অন্য তিন আসামি হলেন- যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত উম্মে সুলতানা পপি (তুহিন), জাবেদ হোসেন (সাখাওয়াত হোসেন) এবং সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের।

রোববার (৩০ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী শিশির মনির আপিল দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এসময় তিনি মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া, মৃত্যুকালীন জবানবন্দি এবং পিবিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন তোলেন।

২০১৯ সালের ৬ এপ্রিলের এই ঘটনায় ওই বছরেরই ২৪ অক্টোবর নিম্ন আদালত ১৬ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। তবে চলতি বছরের ২৪ আগস্ট দেওয়া রায়ে হাইকোর্ট বিভাগ ১০ জনকে বেকসুর খালাস দেন এবং ৬ জনের সাজা বহাল রাখেন। এর মধ্যে সিরাজ উদ-দৌলাসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড এবং চারজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, ‘নিম্ন আদালতের রায়টি যে কতটা কাণ্ডজ্ঞানহীন ছিল, তা হাইকোর্টের রায়েই প্রমাণিত। হাইকোর্ট বিভাগ তাদের লিখিত রায়ে নিম্ন আদালতের রায়কে ‘মিসক্যালকুলেটেড জাজমেন্ট (ভুল হিসাবের রায় ‘ এবং ‘মাইন্ডলেস অ্যান্ড রেসপনসিবল সেন্টেন্সিং (কাণ্ডজ্ঞানহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন সাজা)’ বলে মন্তব্য করেছেন। বিনা প্রমাণে ১৬ জনকে ফাঁসি দেওয়া আসামিদের পরিবারগুলোর ওপর একটি ‘ডিভাস্টেটিং ইফেক্ট (বিধ্বংসী প্রভাব)’ ফেলেছিল বলে হাইকোর্ট উল্লেখ করেছেন। এ কারণেই নিম্ন আদালতের ওই বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।’

আসামিপক্ষ আপিলে যেসব গ্রাউন্ড বা যুক্তি তুলে ধরেছেন, তা সাংবাদিকদের সামনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।

শিশির মনির বলেন, ‘সিরাজ উদ-দৌলাকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অন্য একটি মামলায় ২৯ মার্চ ২০১৯ তারিখে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়। অথচ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ৬ এপ্রিল। যিনি ২৯ মার্চ থেকে জেলবন্দি, তিনি ৬ এপ্রিলের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার সুযোগ নেই। তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। আমাদের প্রশ্ন হলো, জেলের ভেতর থেকে যদি ষড়যন্ত্র হয়েই থাকে, তবে জেল কর্তৃপক্ষ তার দায় নেবে না কেন?’

নিহত ছাত্রীর মৃত্যুকালীন জবানবন্দির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ভিকটিম তার ডায়িং ডিক্লারেশনে বলেছিলেন, তিনি সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে চারজন বোরকা পরিহিত ‘মেয়ে’ দেখেছিলেন। কিন্তু যাদের সাজা দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে পপি ছাড়া শামীম, নুরুদ্দীন, জুবায়ের- সবাই পুরুষ। মূল সাক্ষ্য অনুযায়ী হামলাকারীরা নারী হলে, সাজাপ্রাপ্তরা পুরুষ হয় কীভাবে? পুরুষ কীভাবে মহিলা হলো আর মহিলা কীভাবে পুরুষ হলো, এটি একটি রহস্য।’

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ‘মানি’ নামের এক নারী দোকান থেকে বোরকা কিনে এনেছিলেন। তিনি তার ছোট শিশুসহ ৭ বছর জেলে ছিলেন। হাইকোর্টের রায়ে মানিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। শিশির মনির প্রশ্ন রাখেন, ‘বোরকা সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা মানি যদি খালাসই পেয়ে যান, তাহলে ওই বোরকাগুলো কোথা থেকে এল? মানি খালাস পাওয়ার পর এই বোরকা স্টোরি তো আর টেকে না।’

মামলায় ১২ জন আসামির কনফেশনাল স্টেটমেন্ট (স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি) ছিল। শিশির মনির দাবি করেন, আসামিদের পিবিআই টর্চার করে এসব জবানবন্দি আদায় করেছে, যা আসামিরা পরে ৩৪২ ধারায় প্রত্যাহার (রিট্র্যাক্ট) করেছেন।

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, যে ১২ জনের জবানবন্দি ছিল, হাইকোর্ট তাদের মধ্য থেকে ৬ জনকে খালাস দিয়েছেন। অর্থাৎ, আদালত তাদের কনফেশন বিশ্বাস করেননি। একই ঘটনায় কয়েকজনের কনফেশন বিশ্বাসযোগ্য না হলে, বাকিদের কনফেশন কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়?’

সিসিটিভি ফুটেজ গুম ও আত্মহত্যার দাবি

আইনজীবী শিশির মনির দাবি করেন, ঘটনার দিন ওই মাদ্রাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা চালু ছিল। কিন্তু পিবিআই সেই ফুটেজ কখনোই আদালতে উপস্থাপন করেনি।

তিনি বলেন, ‘সিসিটিভি ক্যামেরাটা কেন আদালতে উপস্থাপন করা হলো না, তা মামলা নিষ্পত্তির পরও এক বড় রহস্য হয়ে থাকবে। এই ফুটেজটি আদালতে এলে স্পষ্ট হয়ে যেত যে, এটি কি হত্যা নাকি আত্মহত্যা। আমাদের ডিফেন্সের সাজেশন ছিল, এটি একটি সুনির্দিষ্ট আত্মহত্যার ঘটনা (ক্লিয়ার কেইস অব সুসাইড)। সিসিটিভি ফুটেজ গুম করে অস্বাভাবিক তদন্তের মাধ্যমে যা ইচ্ছা তাই করা হয়েছে।’

তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক দেশে মামলা নিষ্পত্তির পরও সাংবাদিকরা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম করেন। আপনারা যদি ওই সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজটির খোঁজ করেন, তবে আসল সত্য বেরিয়ে আসতে পারে এবং দেশের বড় উপকার হতে পারে।’

আপিল বিভাগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এই বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে আসামিদের প্রতি সুবিচার করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

আরএনবি/এএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর