জুলাই আন্দোলনে 'মানবতাবিরোধী অপরাধে'র মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে দেওয়া ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। এই রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়ে আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষ—উভয়ই।
রায়ের অনুলিপি পাওয়ার কথা জানিয়ে ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ বলেন, পাঁচশ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় আমরা হাতে পেয়েছি। এখনো সেটি পড়া হয়নি। পর্যালোচনা করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে।
অন্যদিকে প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম বলেন, দুই-তিন দিন আগে পূর্ণাঙ্গ রায়টি আমরা হাতে পেয়েছি। ট্রাইব্যুনালের রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ হয়েছি। আগামী এক মাসের মধ্যে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করা হবে।
প্রসিকিউশনের অসন্তোষ যে জায়গায়
রায়ের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের অসন্তোষের জায়গাটি স্পষ্ট করে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, হাসানুল হক ইনু ১৪ দলীয় জোটের প্রধান না হলেও তিনি ছিলেন এর অন্যতম সংগঠক এবং জাসদের ‘সুপ্রিমো’। তার ও ১৪ দলের অন্যান্য নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে তৎকালীন মহাজোট সরকার আন্দোলন দমনে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তের আগে তারা ষড়যন্ত্র করেছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে গণভবনে মিটিং করে আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেনা মোতায়েন করে কারফিউ জারি করা হয়েছিল।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রীর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে এই প্রসিকিউটর বলেন, তিনি (মন্ত্রী) এসে আমাদের অবহিত করেছিলেন যে, কারফিউ মানেই গুলি করে হত্যা। অর্থাৎ, আন্দোলনকারীদের গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। আর এই নির্দেশের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন জাসদের সুপ্রিমো (প্রধান) হাসানুল হক ইনু।
ট্রাইব্যুনালের রায়ের একটি পর্যালোচনার বিরোধিতা করে মিজানুল ইসলাম বলেন, মাননীয় ট্রাইব্যুনাল-২ তার রায়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, ওই মিটিংয়ে তার (ইনুর) উপস্থিতি কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স (ফৌজদারি অপরাধ) ঘটায়নি। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল ওই মামলারই পরবর্তী একটি পর্যায়ে—অন্য একটি দলকে নিষিদ্ধ করার ঘটনায়—তার কারফিউ সমর্থন করে দেওয়া বক্তব্যকে আমলে নিয়ে শাস্তি দিয়েছেন। অথচ আগের ঘটনায় এটিকে আমলে (রিল্যাই) নেননি।
ট্রাইব্যুনালের এই সিদ্ধান্তকে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার ক্রিমিনাল দায় সৃষ্টি হয়নি মর্মে ট্রাইব্যুনাল যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা আমাদের দৃষ্টিতে যথার্থ ও আইনসঙ্গত বলে মনে হয়নি। আমরা মাননীয় ট্রাইব্যুনালের ওই আদেশে সংক্ষুব্ধ (এগ্রিভড) হয়েছি। আগামী এক মাসের মধ্যে আমরা আপিল দায়ের করব।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১ (৩) ধারা অনুযায়ী, খালাস বা যেকোনো দণ্ডের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। এই সময়সীমা পার হওয়ার পর আপিল করার সুযোগ নেই। আর আইনের ২১ (৪) ধারা অনুযায়ী, আপিল দায়েরের তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে।
যে অপরাধে সাজা পেলেন ইনু
গত ৩০ জুন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করে।
মামলার একমাত্র আসামি ইনুর বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের সময় শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখকে হত্যাসহ উসকানি, ষড়যন্ত্র, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার ও নিপীড়নমূলক কৌশলে সমর্থনের মোট ৮টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
এর মধ্যে ১, ২, ৪, ৫ ও ৮ নম্বর অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষ আসামির ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে না পারায় তাকে এসব অভিযোগ থেকে খালাস দেয় ট্রাইব্যুনাল।
অন্যদিকে ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগে রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত প্রমাণকে যথেষ্ট বলে মনে করেছে আদালত। এই তিনটি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে পৃথকভাবে ১০ বছর করে সাজা দেওয়া হয়। তবে সবগুলো সাজা যুগপৎ (একসঙ্গে) কার্যকর হবে বিধায় আসামিকে মোট ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
তৃতীয় অভিযোগ: ২০ জুলাই দুপুরে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন দিয়ে আন্দোলনকারীদের ভিডিও দেখে শনাক্ত করে দমন, আটক, নির্যাতন ও হত্যার নির্দেশ দেন ইনু। ৬ জন ভুক্তভোগীসহ অন্যদের গুরুতর আহত করা, নির্যাতন, অত্যাচার এবং রাজনৈতিক কারণে নিপীড়নের এই দায়ে তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ষষ্ঠ অভিযোগ: আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিতে ২৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে আন্দোলনকারীদের 'জামায়াত, সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক' ট্যাগ দেন তিনি। একই সভায় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে তিনি মূলত আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে ষড়যন্ত্র, উসকানি ও সহায়তার এই দায়ে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
সপ্তম অভিযোগ: ৪ আগস্ট বিকালে আন্দোলনকারীদের 'জঙ্গি' তকমা দিয়ে কারফিউ জারির মাধ্যমে গুলি চালানোর কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে অধস্তনদের নির্দেশ দেন ইনু। মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্রের এই দায়ে আরও ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলেছে ট্রাইব্যুনাল
রায়ের শুরুতে মামলার বিচারিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে ট্রাইব্যুনাল জানায়, ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়। ডিসচার্জ আবেদন খারিজ করে তার বিরুদ্ধে ৮টি অভিযোগ গঠন করা হয়।
মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ মোট ১০ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে এবং আসামিপক্ষ ৯ জন সাক্ষীকে জেরা করে ও নিজেদের পক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষী হাজির করে। চলতি বছরের ২ এপ্রিল থেকে ১৪ মে পর্যন্ত ১৪ কার্যদিবসে যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল।
ট্রাইব্যুনাল জানায়, মৌখিক সাক্ষ্যের পাশাপাশি ভিডিও ক্লিপ, ডিজিটাল তথ্য, টেলিফোনে আড়িপাতা কথোপকথন, গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন দলিল আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব প্রমাণ আইনসম্মতভাবে সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং যথাযথ সাক্ষীর মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে আদালত এর সত্যতা নিয়ে সন্তুষ্ট।
পর্যবেক্ষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আসামির দুটি টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে ট্রাইব্যুনাল বলেছে, এসব কথোপকথন থেকে প্রতীয়মান হয়, আসামি নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ছিলেন না। বরং ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে কৌশলগত, সাংগঠনিক ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে সক্রিয়ভাবে পরামর্শ দিয়েছেন।
ইনু আন্দোলনের নেতাদের শনাক্ত করে তালিকা প্রস্তুত, রাতে গ্রেপ্তার এবং আন্দোলন দমনে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে মতামত দিয়েছিলেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
পারিপার্শ্বিক প্রমাণ, অভিন্ন পরিকল্পনার প্রমাণ এবং উসকানির প্রমাণ বিশ্লেষণ করে আদালত বলেছে, ইনু তথ্য সংগ্রহ, বিপুলসংখ্যক সমর্থক মোতায়েন, দেশব্যাপী সমন্বিত অবস্থান গ্রহণ এবং আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসবাদ’, ‘উগ্রবাদ’ ও ‘রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে উপস্থাপনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এসব বক্তব্য আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণকে বৈধতা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই হয়েছিল এবং তা উসকানির পর্যায়ে পড়ে।
ট্রাইব্যুনাল নিশ্চিত হয়েছে যে, আসামি জেনে-শুনে ও ইচ্ছাকৃতভাবে ছাত্র-জনতার আন্দোলন অবৈধ উপায়ে দমনের অভিন্ন পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি কেবল একজন নিষ্ক্রিয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ছিলেন না, বরং সচেতনভাবে এমন একটি বয়ান প্রচার ও সমর্থন করেছেন, যেখানে আন্দোলনকে রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি প্রকাশ্য বক্তব্য, সাক্ষাৎকার ও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে ওই অভিন্ন অপরাধমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উৎসাহ ও সহায়তা করেছেন।
জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সেই থেকে তিনি কারাগারেই রয়েছেন।
আরএনবি/এআরএম




