দেশের বিচারব্যবস্থায় মামলাজট ও দীর্ঘসূত্রতা কমাতে সরকারি আইনি সহায়তা বা লিগ্যাল এইড কার্যক্রম গত দেড় দশকে সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৮ লাখের বেশি মানুষকে বিনামূল্যে আইনি সেবা দিয়েছে সংস্থাটি। একই সময়ে মামলা ও বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রায় ৩৮৮ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণও আদায় করে দেওয়া হয়েছে। ফলে বিচারপ্রার্থীদের আর্থিক ও সময়ের চাপ কমানোর ক্ষেত্রে লিগ্যাল এইডের ভূমিকা ক্রমেই বিস্তৃত হয়েছে।
তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি লিগ্যাল এইডের কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো নিয়ে নতুন করে আইনি বিতর্কও সামনে এসেছে। বিশেষ করে আদালতের বাইরে মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির ক্ষমতা লিগ্যাল এইড অফিসকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আইনজীবী মহলে দেখা দিয়েছে ভিন্নমত। এক পক্ষ মনে করছে, এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মামলার দ্রুত ও কম খরচে নিষ্পত্তির পথ আরও সহজ হবে। অন্য পক্ষের আশঙ্কা, বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির এমন ব্যবস্থা বিচারপ্রার্থীর সাংবিধানিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
এরই মধ্যে গত ১২ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসকে মেডিয়েশন বা মধ্যস্থতার মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির সুযোগ দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আল ইমরান খান স্বাক্ষরিত এক সার্কুলারে জানানো হয়, প্রাথমিক পর্যায়ে সাতটি আইনের আওতাভুক্ত মামলায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর—বিশেষ করে মধ্যস্থতা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি।
সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসের ভাষ্য, আদালতের দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির এই ব্যবস্থা অনেকটা ‘বাইপাস রোডের’ মতো—যেখানে বছরের পর বছর মামলা চালানোর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানে পৌঁছাতে পারবে। এতে বিচারপ্রার্থীর সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে এবং আদালতের ওপর মামলার চাপও কমবে।
তবে আইনজীবীদের একটি অংশ বিষয়টিকে এতটা সরলভাবে দেখছে না। তাদের কেউ কেউ এটিকে বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে ‘অসাংবিধানিক বাধা’ হিসেবে দেখছেন। আবার কারও অভিযোগ, মধ্যস্থতার নামে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বিচারিক ক্ষমতার পরিধির বাইরে গিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়াবে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের ক্ষমতাও বাড়ানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
আরও পড়ুন: ৩ কার্যদিবসে নিষ্পত্তি ৬০ হাজারের বেশি পুরোনো ফৌজদারি মামলা
ফলে একদিকে ১৮ লাখের বেশি মানুষকে বিনামূল্যে আইনি সেবা এবং শত শত কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়ের সাফল্য, অন্যদিকে মধ্যস্থতার নতুন ক্ষমতা নিয়ে সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্ন—দুই বিপরীত বাস্তবতার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এখন লিগ্যাল এইড কার্যক্রম। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে এই নতুন পদ্ধতি কতটা কার্যকর হবে, আর তা করতে গিয়ে বিচারপ্রার্থীর সাংবিধানিক অধিকার ও আদালতের এখতিয়ার কতটা সুরক্ষিত থাকবে—সেটিই এখন সামনে আসা বড় প্রশ্ন।
১৮ লাখ সুবিধাভোগী ও ৩৮৭ কোটি টাকা আদায়
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদফতরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত মোট ১৮ লাখ ১ জন বিচারপ্রার্থী বিনামূল্যে আইনি সেবা ও পরামর্শ পেয়েছেন। এর মধ্যে সরাসরি আইনি পরামর্শ পেয়েছেন ৬ লাখ ১৩ হাজার ৯২১ জন।
সংস্থাটি জানায়, এ পর্যন্ত বিভিন্ন আদালতে সরকারি খরচে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৭২টি মামলা পরিচালনা করা হয়েছে, যার মধ্যে ২ লাখ ৪০ হাজার ৭২০টি মামলার সফল নিষ্পত্তি হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন কারাগারে থাকা ১ লাখ ৪২ হাজার ৪৫৭ জন কারাবন্দীকে বিনা খরচে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ আদায়ের ক্ষেত্রেও বড় সাফল্য এসেছে। এডিআর ও মামলার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের মোট ৩৮৭ কোটি ৮১ লাখ ৯২ হাজার ৭৪৫ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসগুলো আদায় করেছে ৩৮০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং শ্রমিক আইনি সহায়তা সেল আদায় করেছে ৭ কোটি ৩ লাখ টাকা।
বিশেষভাবে ১৭ বছরে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে পরামর্শ গ্রহণ করেছেন ২৭ হাজার ৫৮০ জন। তবে আইনগত সহায়তা প্রাপ্ত উপকারভোগীর সংখ্যা ৩১ হাজারের বেশি বলে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদফতরের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
৭ ধরনের মামলায় মধ্যস্থতার সুযোগ
নতুন করে যে সাত ধরনের মামলায় মধ্যস্থতার সুযোগ পেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড সেগুলো হলো—পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩; পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩; যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮; নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০; দণ্ডবিধি, ১৮৬০; সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ এবং নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১।
সার্কুলারে বলা হয়েছে, পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ৫ ধারার আওতায় বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, খোরপোষ এবং শিশুসন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত-সংক্রান্ত মামলা মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা যাবে।
আইনটির ৫ ধারায় এই পাঁচ ধরনের বিষয়ে পারিবারিক আদালতের এখতিয়ার নির্ধারণ করা হয়েছে। পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩-এর ৫ ধারার মামলাও মধ্যস্থতার আওতায় রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: আলিফ হত্যা মামলায় ৩য় সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ, চিন্ময়ের জামিন নামঞ্জুর
কোনো সন্তান বাবা-মায়ের দেখভাল না করলে বাবা বা মা সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। এমন মামলা আপিল বা রিভিশনে হাই কোর্টে এলে আদালত চাইলে তা লিগ্যাল এইডের মধ্যস্থতার জন্য পাঠাতে পারে।
যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ও ৪ ধারা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(গ) ধারার মামলাও এ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে।
কেউ যৌতুক দাবি করলে, কিন্তু মারধর না করলে তা যৌতুক নিরোধ আইনের আওতায় পড়ে। আর যৌতুকের দাবিতে সাধারণ বা ‘সিম্পল’ আঘাত করা হলে তা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) ধারার মামলা হয়।
তবে হত্যা, ধর্ষণ বা দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারার মতো গুরুতর ও আপস-অযোগ্য অপরাধ এ ব্যবস্থার আওতায় থাকবে না।
দণ্ডবিধির যেসব ধারা
সার্কুলার অনুযায়ী, দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১৪৩ ধারায় বেআইনি সমাবেশের সদস্য হওয়ার শাস্তি, ৪৪৭ ধারায় অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশ, ৪৪৮ ধারায় গৃহে অনধিকার প্রবেশ, ৩২৩ ধারায় স্বেচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করা, ৩২৪ ধারায় বিপজ্জনক অস্ত্র বা উপকরণ দিয়ে স্বেচ্ছাকৃতভাবে আঘাত করা এবং ৩২৫ ধারায় স্বেচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর আঘাত করার অপরাধের মামলা মধ্যস্থতার আওতায় নেওয়া যাবে।
এছাড়া ৩৫৪ ধারায় নারীর ‘শালীনতা’ নষ্ট করার অভিপ্রায়ে আক্রমণ বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ, ৩৭৯ ধারায় চুরি, ৩৮০ ধারায় বাসগৃহ, ভবন, তাঁবু বা জলযানে চুরি এবং ৩৮১ ধারায় কর্মচারী বা ভৃত্যের চুরির মামলাও মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ থাকছে।
সার্কুলারে দণ্ডবিধির ৪০৬ ধারার অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, ৪১৭ ধারার প্রতারণা, ৪২০ ধারায় প্রতারণা করে সম্পত্তি প্রদান করানোর শাস্তি, ৪৯৪ ধারায় স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় পুনর্বিবাহ, ৫০০ ধারায় মানহানি এবং ৫০১ ধারায় মানহানিকর বিষয় মুদ্রণ বা খোদাই-সংক্রান্ত মামলাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া দণ্ডবিধির ৫১১ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করার চেষ্টার মামলাও সার্কুলারে রাখা হয়েছে।
তবে কোনো মামলায় একাধিক ধারা থাকলে পুরো মামলাটি মধ্যস্থতার আওতায় আসবে কি না, তা মামলার সামগ্রিক প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান এবং সার্কুলারে নির্ধারিত শর্তের ওপর নির্ভর করবে।
দেওয়ানি ও অন্যান্য মামলা
সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৮ ও ৯ ধারায় সম্পত্তির দখল ফিরে পাওয়া, ১২ ধারায় চুক্তির সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন, ৩৯ ধারায় দলিল বাতিল, ৪২ ধারায় মালিকানা বা অধিকার সম্পর্কে ঘোষণামূলক ডিক্রি এবং ৫৪ ধারায় নিষেধাজ্ঞার মামলাও মধ্যস্থতার আওতায় রাখা হয়েছে।
এছাড়া নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারার চেক ডিজঅনারের মামলাও এ ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে।
ওই ধারায় ব্যাংকে অপর্যাপ্ত অর্থ বা নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত অর্থের কারণে চেক অনাদায়ী হওয়ার বিষয়টি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
গুরুতর বা কগনিজেবল অপরাধ এ ধরনের মিডিয়েশনের আওতায় আসবে না। মূলত পারিবারিক বিরোধ বা সাধারণ মারামারির মত ছোটখাটো বা পেটি নেচারের মামলায় মধ্যস্থতার সুযোগ রাখা হয়েছে বলে জানান সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসের চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার মো. ইমতিয়াজুল ইসলাম।
লিগ্যাল এইড: ‘বিনামূল্যের বাইপাস রোড’
সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসের চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার মো. ইমতিয়াজুল ইসলাম সংস্থাটির কর্মপরিধি তুলে ধরে ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘লিগ্যাল এইড অফিস সারাদেশেই আছে। জেলা পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও কমিটি কাজ করে। আমাদের এই সুপ্রিম কোর্ট অফিস মূলত আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে পেন্ডিং থাকা মামলাগুলো দেখভাল করে।’
তিনি জানান, এখানে গরিব-অসহায়, পরিচয়হীন ব্যক্তি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর (ইন্ডিজেনাস পিপল) মানুষদের আর্থিক ও আইনি সহায়তা দেওয়া হয়। বার্ষিক আয় যাদের আয়কর সীমার নিচে (সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকার মধ্যে), তারা এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা, সাম্প্রতিক ‘জুলাই আন্দোলনের’ যোদ্ধা এবং শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিরা এই সুবিধা পাবেন।
ইমতিয়াজুল ইসলাম সেবার ধরন ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এখানে মূলত দুই ধরনের সেবা দেওয়া হয়। প্রথমটি লিগ্যাল অ্যাডভাইস বা আইনি পরামর্শ, যা ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য উন্মুক্ত। অন্যটি হলো মামলা পরিচালনা। যদি কেউ মামলা করতে চায় বা তার বিরুদ্ধে মামলা হয়, তবে তাকে বিনামূল্যে প্যানেল আইনজীবী দেওয়া হয়। মামলা দায়ের, দরখাস্ত প্রস্তুতি, পেপার বুক রেডি করা থেকে শুরু করে শুনানিতে লড়বেন আইনজীবী, যার খরচ বহন করবে সরকার।’
তিনি এডিআর বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তিকে নিজের ‘ব্রেন চাইল্ড’ অভিহিত করে বলেন, ‘শহরের জ্যাম এড়াতে যেমন বাইপাস রোড থাকে, লিগ্যাল এইডও মামলার দীর্ঘ পথ এড়ানোর তেমন একটি বাইপাস। কোর্টে ৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগলেও এখানে ২-৩ মাসেই আপস সম্ভব। এতে দুই পক্ষই জয়ী হয় এবং এর বিরুদ্ধে আর কোনো আপিল থাকে না।’
ইমতিয়াজুল ইসলাম আরও জানান, ২০২৫ সালে অধ্যাদেশ এবং ২০২৬ সালে আইন সংশোধনীর মাধ্যমে এই সমঝোতাকে আদালতের ডিক্রির সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: নুসরাত হত্যা মামলা: হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় সোমবার
তবে সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমার আন্ডারে অফিসার নেই, স্টাফ সংকট চরম। ৩-৪ জন স্টাফ দিয়ে বিশাল চাপ সামলানো সম্ভব নয়। এমনকি পর্যাপ্ত কম্পিউটার ও লজিস্টিক সাপোর্টও আমাদের নেই।’
ম্যানপাওয়ার ও লজিস্টিক সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘১০০ জন বিচারপতি যদি পাঁচটি করে মামলাও পাঠান, তবে তা সামলানোর মতো পর্যাপ্ত কর্মকর্তা বা কম্পিউটার আমাদের নেই।’
বিচার পাওয়ার পথে বাধা!
তবে লিগ্যাল এইডের এই বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা বা সরাসরি কোর্টে মামলা করার পথ সংকুচিত করার বিষয়টিকে ‘অসাংবিধানিক ও অযৌক্তিক’ বলে দাবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু।
তিনি বলেন, ‘সংবিধানে তো কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে আইডেন্টিফাই (চিহ্নিত) করা নেই। রাষ্ট্র যদি মনে করে কোর্টে মামলা করতে দেবে না, তবে এক ধরণের মানুষের সুযোগ বন্ধ হয়ে গেল।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে পুলিশ প্রায়ই আমলযোগ্য মামলা নিতে চায় না। তখন বিকল্প পথ ছিল কোর্ট। এখন যদি কোর্টে মামলা করার এখতিয়ার বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে মানুষের বিচার পাওয়ার পথ ব্লক (বন্ধ) হয়ে যাবে।’
বিচারিক বিলম্বের দায় বিচারকদের ওপর চাপিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে অযোগ্য বিচারকদের অদক্ষতার কারণে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকে। আমাদের দেশে অযোগ্য বিচারক নিয়োগ বন্ধ করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য লোক নিতে হবে। বিচারকদের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের উন্নতি না করে কেবল আইনের মাধ্যমে বাধা সৃষ্টি করলে তা কোনো সুফল দেবে না।’
পুলিশের ওপর একক নির্ভরশীলতা বাড়ার ঝুঁকি নিয়ে তিনি বলেন, ‘৩৮০ বা ৩৮১ ধারার মতো মামলাগুলোর ক্ষমতা পুরোপুরি পুলিশের হাতে দিলে মানুষের হয়রানি বাড়বে। পুলিশকে টাকা না দিলে তদন্ত প্রতিবেদন জমা হবে না, নোটিশ যাবে না। এতে আইনি জটিলতা ১০০ শতাংশ বাড়বে। কোর্টের পথ বন্ধ হলে মানুষ পুলিশের কাছে গিয়ে নেগোশিয়েট (সমঝোতা) করবে, ফলে দুর্নীতির জ্যাম বাড়বে এবং বিচারহীনতার পরিবেশ তৈরি হবে।’
আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ‘বিচারকার্যের নিশ্চয়তা সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু আপনি এক রাস্তা বন্ধ করে আরেক রাস্তায় চাপ বাড়াচ্ছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি হবে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট হবে।’
এই আইনজীবী বলেন, ‘আদালতে সরাসরি মামলা করার এখতিয়ার বন্ধ করে দেওয়া সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি ব্যারিয়ার বা ব্লক তৈরি করবে। রাষ্ট্র যদি সরাসরি কোর্টে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়, তবে মানুষ বাধ্য হয়ে থানায় যাবে। এতে পুলিশের ওপর একক নির্ভরশীলতা তৈরি হবে, যা ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করবে।’
পরিসংখ্যান বলছে, আদালতের বাইরে আপস-মীমাংসা বা এডিআরের মাধ্যমে ২ লাখ ৬২ হাজার ৫২৫টি মামলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৫টি বিরোধ সফলভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মাধ্যমে ৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৬ জন বিচারপ্রার্থী সরাসরি উপকৃত হয়েছেন। তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে এ পর্যন্ত ৩,৭৮৮টি সচেতনতামূলক সভা ও গণশুনানি করা হয়েছে।
লিগ্যাল এইডের এই সাফল্য একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গা তৈরি করছে, অন্যদিকে আইনজীবীদের উত্থাপিত সাংবিধানিক ও পদ্ধতিগত প্রশ্নগুলো বিচার বিভাগের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিকল্প পথ কি আসলেই জট কমাবে নাকি বিচারপ্রার্থীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করবে—তা নিয়ে আইনি মহলে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
আরএনবি/জেবি




