সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার আসামি এবং প্রায় ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে তদন্তের স্বার্থে তাকে দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) কড়া নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল শাখা থেকে মোজাফফরকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
পরে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের আবেদনের পর ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ তাকে গ্রেফতার দেখানোর পাশাপাশি দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম মোজাফফরকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করেন। একই সঙ্গে তাকে দুই দিন জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরও দুই মাস সময় চান। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেন।
ট্রাইব্যুনাল জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) বিধিমালার ৬১ বিধি অনুযায়ী তদন্ত কর্মকর্তা সুবিধাজনক সময়ে টানা দুই দিন অথবা পৃথক দুই দিনে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে পুনরায় সেনাবাহিনীর হেফাজতে পাঠানো হবে।
এদিন একই মামলার অপর আসামি লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুনানিতে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, শাইখ মাহদী ও মঈনুল করিম উপস্থিত ছিলেন।
কীভাবে মামলায় যুক্ত হলেন মোজাফফর
শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তে মোজাফফর হোসেনের সম্পৃক্ততার সূত্র পাওয়া যায়। তদন্তে ‘জন ডো’ নামে উল্লেখ থাকা ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করে তাকে মোজাফফর হোসেন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটরের দাবি, জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময়ে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও মোজাফফর হোসেনের মধ্যে একাধিকবার যোগাযোগ হয়েছিল। এছাড়া তৎকালীন সরকারের আমলে তিনি একাধিকবার পার্শ্ববর্তী দেশে যাতায়াত করেছেন এবং বাংলাদেশে আত্মগোপনে থেকেও বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।
তিনি আরও বলেন, সরকারের সহযোগিতা ছাড়া একজন পলাতক আসামির পক্ষে দেশে-বিদেশে অবাধ যাতায়াত ও আত্মগোপনে থেকে যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব নয়। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই মানবতাবিরোধী অপরাধে তার সম্পৃক্ততা তদন্ত করা হচ্ছে।
সেনা আদালত ও ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে
বর্তমানে মোজাফফর হোসেন সেনাবাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন। জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় সেনা আইনে তার বিচার চলছে। একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে সেনা আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলা নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা নেই বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর।
তিনি বলেন, দুটি মামলার অপরাধ ও এখতিয়ার সম্পূর্ণ আলাদা। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার সেনা আইনে হবে। অন্যদিকে গত ১৬ বছরে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে মোজাফফরের সম্পৃক্ততা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে তার ভূমিকা নিয়ে তদন্ত করছে ট্রাইব্যুনাল।
তিনি আরও বলেন, একজন আসামির বিরুদ্ধে একাধিক আইনে পৃথক আদালতে বিচার চলতে পারে। তবে কোনো মামলার রায় কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট আইনি বিধান অনুযায়ী অন্য কার্যক্রমের বিষয়ে তখন সিদ্ধান্ত হবে।
পটভূমি
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে ওই ঘটনায় অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মোজাফফর হোসেনের নাম উঠে আসে। ঘটনার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং তাকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।
গত ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ২১ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট চেয়ে আবেদন করা হলে আদালত বৃহস্পতিবার তাকে হাজির করার নির্দেশ দেন।
আরএনবি/এআর




