রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

‘জন ডো’ থেকে ৪৫ বছরের রহস্যের জট খুলল: ট্রাইব্যুনালে মোজাফফর 

রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি
প্রকাশিত: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১০:১৪ এএম

শেয়ার করুন:

‘জন ডো’ থেকে জট খুলল ৪৫ বছরের রহস্যের: ট্রাইব্যুনালে মোজাফফর
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেন

একটি কাল্পনিক ছদ্মনাম—‘জন ডো’। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তারা প্রথমে একে সাধারণ কোনো সাংকেতিক নাম ভাবলেও, এর সূত্র ধরেই উন্মোচিত হয়েছে টানা সাড়ে চার দশক ধরে ঝুলতে থাকা এক রহস্য।

শনাক্ত হয়েছেন ১৯৮১ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর মোজাফফর হোসেন (৭৭)।

দীর্ঘ ৪৫ বছর পর পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়া এই আসামিকে এবার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তলব করা হয়েছে।

দীর্ঘ সাড়ে চার দশক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন মোজাফফর। গত ১৫ জুলাই রাত ১০টা ১০ মিনিটে রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ডিএমপি জানায়, বিশ্বস্ত সোর্স ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর, ১৬ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের (এমপি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সেনা হেফাজতে রয়েছেন।

মোজাফফরকে শনাক্ত করার নেপথ্যে ছিল ১/১১-এর অন্যতম নেপথ্য কুশীলব হিসেবে পরিচিত সাবেক সেনাকর্তা ও ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কল রেকর্ড। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত ৭ মে ট্রাইব্যুনাল-২ মাসুদ উদ্দিনকে গ্রেফতার দেখানোর আদেশ ও জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়।

প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানান, তদন্তের অংশ হিসেবে মাসুদ উদ্দিন ও তার প্রাক্তন ব্যক্তিগত সহকারীর (পিএ) মুঠোফোনের ফরেনসিক ও সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড) বিশ্লেষণ করা হয়। 

এতে দেখা যায়, ২০২৩ সাল থেকে বনানী ও মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার একই অবস্থান থেকে ভুয়া নামে নিবন্ধিত একাধিক সিম ব্যবহার করে ‘জন ডো’ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে মাসুদ উদ্দিনের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত যোগাযোগ ও খুদেবার্তা আদান-প্রদান হচ্ছিল।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা সন্দেহজনক নম্বরগুলো শনাক্ত করতে না পেরে পুলিশ সদর দফতরে পাঠায়। এরপর পুলিশের নিজস্ব তদন্তেই বেরিয়ে আসে, ওই ‘জন ডো’ ছদ্মনাম ব্যবহারকারী ব্যক্তিই হলেন জিয়া হত্যা মামলার পলাতক আসামি মেজর (অব.) মোজাফফর।

গত মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ আগামী ২৩ জুলাই (বৃহস্পতিবার) মোজাফফরকে আদালতে হাজির করতে সেনা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারি করেছেন।

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, বিশেষ করে ১/১১ পরবর্তী সময়ে সাবেক সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে মোজাফফরের গভীর যোগাযোগ ছিল।

১/১১ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে মোজাফফরের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতেই তাকে ট্রাইব্যুনালে তলব করা হয়েছে। সেখানে তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে প্রয়োজনে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও তাকে মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।

এদিকে, সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিনের পক্ষে তার আইনজীবী শামীম হায়দার পাটোয়ারী ‘কমিউনিকেশন প্রিভিলেজ’-এর আবেদন করলেও চিফ প্রসিকিউটর এর ঘোর বিরোধিতা করেছেন।

আত্মগোপন ও জিয়া হত্যায় ভূমিকা

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে নির্মমভাবে নিহত হন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

প্রকাশিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় সার্কিট হাউসে যাওয়া সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে মোজাফফর অন্যতম এবং হত্যার মুহূর্তে তিনি জিয়ার কাছাকাছিই ছিলেন। এরপরই তিনি পালিয়ে যান এবং তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তখন পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।

প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, দীর্ঘ সময় ধরে জাল কাগজপত্র ও ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে তিনি দেশে-বিদেশে অবস্থান পরিবর্তন করতেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলেও বিগত সরকারের আমলে মাসুদ উদ্দিনের মতো প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে তিনি মাঝেমধ্যেই গোপনে বাংলাদেশে যাতায়াত করতেন। গোয়েন্দা নজরদারি এড়াতে ডিজিটাল যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের আসল নাম ব্যবহার করতেন না তিনি।

সম্প্রতি পিলখানায় এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, মোজাফফরকে গ্রেফতারের পর সেনা আইনে ‘জেনারেল কোর্ট মার্শাল’-এর মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে আইনি পদক্ষেপ চলমান রয়েছে।  

তবে একই আসামির বিরুদ্ধে সামরিক আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হবে কি না—এমন প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

তিনি বলেন, এখানে কোনো আইনি সংঘাত বা দ্বন্দ্ব নেই। অপরাধ দুটি পুরোপুরি আলাদা। ১৯৮১ সালের জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে সেনা আইনে সামরিক আদালতে। 

আর ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে বিগত ১৬ বছরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের। তবে সেনা আইনে বিচার ও দণ্ড যদি আগে কার্যকর হয়ে যায়, তবে ট্রাইব্যুনালের এই নির্দিষ্ট মামলার আইনি কার্যক্রম 'অ্যাবেট' (Abate) বা বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালে হাজির হলে গ্রেফতার হবেন জিয়া হত্যার আসামি সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা৷ এরপর বিচারিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ভাগ্য নির্ধারণ হবে তার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সামরিক আদালতের বিচারের কথা বললেও পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনালে তলবের বিষয় সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিচার নিয়ে সরকারের মধ্যে কোনো টানাপোড়েন তৈরি করেছে কি না সেটিও  সামনের দিনে পরিষ্কার হবে। 

আরএনবি/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর