শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার আসামি ও দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল আগামী ২৩
জুলাই (বৃহস্পতিবার) সকাল ১০টার মধ্যে তাকে হাজির করার এই আদেশ দেন। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এর আগে বর্তমানে মিলিটারি পুলিশের হেফাজতে থাকা মোজাফফরকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট জারির আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
পরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এই পলাতক আসামির সন্ধান পাওয়ার পেছনের চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ১/১১-এর অন্যতম কুশীলব মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর কল রেকর্ড ধরে ‘জন ডো’ ছদ্মনামের এক ব্যক্তির সন্ধান পায় তদন্ত সংস্থা; যিনি আসলে মেজর (অব.) মোজাফফর।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মিস কেসে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্ত সংস্থা যখন তার বিরুদ্ধে ইনভেস্টিগেশন করে, তখন তার এক পিএ-র (ব্যক্তিগত সহকারী) কল রেকর্ডের সূত্র ধরে জানতে পারে যে, মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং তার পিএ-র কথোপকথনের মধ্যে আরেকজন ব্যক্তি আছেন, যার নাম ‘জন ডো’। এটি একটি ফেক নাম।’
বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে তদন্ত সংস্থা খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, এই ‘জন ডো’ আর কেউ নন, তিনি মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন।
আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘গত ১৬ বছর এই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং মেজর মোজাফফরের মধ্যে বিভিন্ন সময় কথাবার্তা হয়েছে। মোজাফফর হোসেন একাধিকবার পার্শ্ববর্তী দেশে যাওয়া-আসা করেছেন এবং মাসুদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। একজন কর্মরত কর্মকর্তার সঙ্গে একজন পলাতক খুনির এই যোগসাজশ এবং তৎকালীন সরকারের সঙ্গে মাসুদের সুসম্পর্কের সমীকরণ আমরা তদন্ত করছি।’
কেন তাকে ট্রাইব্যুনালে আনা হচ্ছে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘১/১১ থেকে শুরু করে ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর অনেক সংশ্লিষ্টতা ইতোমধ্যে আমাদের তদন্ত সংস্থা পেয়েছে। সেই সময়ে এই আসামির (মোজাফফর) সঙ্গে মাসুদের সংশ্লিষ্টতা ছিল। মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে তার কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এসব উদঘাটনের স্বার্থেই তাকে প্রোডাকশন ওয়ারেন্টে হাজির করার আবেদন করা হয়েছে।’
বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করার পর মোজাফফরকে গ্রেফতার দেখানোর (শোন অ্যারেস্ট) আবেদন করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তাকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হবে। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকেও জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন হতে পারে। এমনও হতে পারে যে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে এই দুজনকে একত্রে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদেরও প্রয়োজন হতে পারে।’
এর আগে গত সোমবার রাজধানীর পিলখানায় এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মোজাফফরকে গ্রেফতারের পর সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেনা আইনে জেনারেল কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে তার বিচার নিশ্চিত করা হবে।
বিচার নিয়ে কোনো আইনি জটিলতা বা সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না—এমন প্রশ্নে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘কোনো কনফ্লিক্ট (দ্বন্দ্ব) নেই। দুইটা অপরাধ আলাদা। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিচার সেনা আইনে হবে এবং সেখানে আলাদা রায় হবে। আর আমাদের বিষয়টি হলো, গত ১৬ বছরে তৎকালীন সরকারের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সময় তার কর্মকাণ্ড কী ছিল—সেটি ইনভেস্টিগেশন করা।’
সামরিক আদালতে বিচার দ্রুত শেষ হয়ে গেলে ট্রাইব্যুনালের বিচার বাতিল (অ্যাবেট) হয়ে যাবে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘একজন আসামির একাধিক আইনে, একাধিক কোর্টে বিচার হতে পারে। যেটা আগে অ্যাডজুডিকেশন (নিষ্পত্তি) হয়ে যাবে, সেখানে শেষ হবে।’
দীর্ঘ ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর গত ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে মেজর (অব.) মোজাফফরকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন তাকে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এদিন ট্রাইব্যুনালে শুনানির সময় প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, সহিদুল ইসলাম সরদার, শাইখ মাহদী ও মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন।
আরএনবি/এমআই




