শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

‘সাংবিধানিক শূন্যতার অজুহাতে অবৈধ পঞ্চদশ সংশোধনী বহাল রাখা উচিত নয়’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৫:২১ পিএম

শেয়ার করুন:

‘সাংবিধানিক শূন্যতার অজুহাতে অবৈধ পঞ্চদশ সংশোধনী বহাল রাখা উচিত নয়’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। ছবি: ঢাকা মেইল

বহুল আলোচিত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটাই বাতিল করার পক্ষে মত দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া। অন্য আইনজীবীদের ‘সাংবিধানিক শূন্যতা’ তৈরির আশঙ্কার জবাবে তিনি বলেছেন, কোনো ছোটখাটো কারণ বা শূন্যতার অজুহাতে একটি অবৈধ সংশোধনীকে বহাল রাখা আদালতের ঠিক হবে না।

বুধবার (৮ জুলাই) সাংবাদিকদের দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের বিষয়ে আদালতে উপস্থাপন করা নিজের যুক্তিগুলো তুলে ধরেন এই আইনজীবী।

আলোচিত এই আপিল মামলার শুনানিতে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শরীফ ভুঁইয়া ।

দীর্ঘ ছয় মাসের বেশি সময় পর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে গত সোমবার পুনরায় মামলাটির শুনানি শুরু হয়। এরপর আপিলকারী ৪ পক্ষ গত তিন ধরে শুনাতিতে তাদের যুক্তি তর্ক তুলে ধরেন। আজ রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল শুনানিতে তার যুক্তিতর্ক স্থাপন করেন। এর মধ্য দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর শুনানি আজ বুধবার শেষ হয়েছে এবং রায়ের জন্য আগামী বৃহস্পতিবার দিন নির্ধারিত রয়েছে। আপিলকারী চার পক্ষের মধ্যে কেবল আইনজীবী শরীফ ভুঁইয়া দুটি বিষয়ে আর্জি সাপেক্ষে এই সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল চেয়েছেন।

শরীফ ভূঁইয়া বলেন, ‘এই সংশোধনীটা একটা অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সংবিধানকে ধ্বংস করার জন্য করা হয়েছে। দেশে একটা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা চালু করার জন্য এটা করা হয়েছে।’

পঞ্চদশ সংশোধনী পাসে আইনি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মানা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সংবিধানে এমন কিছু বিষয়ে (প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ ৮ এবং ১৪২) পরিবর্তন আনা হয়েছিল যার জন্য ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গণভোট বাধ্যতামূলক ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হতো, তাহলে জনগণের কাছে যে প্রশ্নটা যেত, সেটা হলো—জনগণ পঞ্চদশ সংশোধনী সমর্থন করে কিনা? নির্দিষ্ট করে কোনো অনুচ্ছেদের বিষয়ে না, পুরো সংশোধনীর ব্যাপারে গণভোট হতো। ভোটের ফলাফল ‘না’ হলে সংশোধনী সেখানেই বাতিল হয়ে যেত। গণভোটের প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় পুরো সংশোধনীটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।’

এছাড়া সংসদে কোনো বিতর্ক না হওয়া এবং সংসদীয় কমিটির মতামত ‘একজনের ইচ্ছায়’ উপেক্ষা করার বিষয়টিকেও সংবিধানের সাথে ‘প্রতারণা’ বলে আখ্যায়িত করেন তিনি।

পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল হলে সংবিধানে ‘শূন্যতা’ তৈরি হতে পারে বলে আদালতে যে সাবমিশন অন্য আইনজীবীরা রেখেছেন, তার সাথে দ্বিমত পোষণ করেন শরীফ ভূঁইয়া। উদাহরণ হিসেবে তিনি ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ যুক্ত করার আইনি ইতিহাসের প্রসঙ্গ টানেন।
তিনি বলেন, ‘পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের পর ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় দেড় বছর সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘আপিল বিভাগের রায়ের কারণে দেড় বছর সংবিধানে বিসমিল্লাহ ছিল না, তাতে তো কোনো সমস্যা হয়নি। আমরা বাংলাদেশে যারা মুসলমান, তারাও মুসলিম হয়েই ছিলাম।’

আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়ার বলেন, ‘যেহেতু সংশোধনীটা অবৈধ, এটাকে অবৈধই ঘোষণা করা উচিত। অবৈধ সংশোধনী এই ধরনের (শূন্যতার) যুক্তির মাধ্যমে বহাল রাখা হলে আদালত তার প্রকৃত দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবে। এ ধরনের শূন্যতা তৈরি হলে সংসদ দ্রুততম সময়ে তা পূরণ করতে পারে।’

পুরো সংশোধনী বাতিলের পক্ষে থাকলেও দুটি বিষয়ে আদালতকে ‘সুরক্ষা’ দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন তিনি। এর একটি হলো— সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এবং অপরটি অনুচ্ছেদ ১০২ এর অধীনে মানবাধিকার রক্ষায় আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার এখতিয়ার।

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘এই দুটো বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের রায় আছে। ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ব্যাপারটি আছে। আর অষ্টম সংশোধনীর মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্টের অবিভাজ্য এখতিয়ারের বিষয়টি বলা আছে। আপিল বিভাগ তার নিজেরই পুরাতন রায়ের ভিত্তিতে এগুলোকে সেভ করতে পারেন। আর বাকি সমস্ত কিছু অসাংবিধানিক ঘোষণা করে দিতে পারেন।’

পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হলে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত ‘একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বা বাকশাল’ ফিরে আসার যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, সে বিষয়েও কথা বলেন শরীফ ভূঁইয়া। 

তিনি মনে করেন, আদালত চাইলে এ বিষয়েও সুরক্ষা দিতে পারেন, তবে সুরক্ষা না দিলেও তিনি আপাতত কোনো সমস্যা দেখছেন না।

এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাষ্ট্রপতির সন্তোষ প্রয়োজন হয় এবং গ্যাজেট করে তা চালু করতে হয়। আমার মনে হয় না বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল আবার একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা চালু করবে; আর চালু করলে আমরা জনগণ নাগরিক হিসেবে সেটা প্রতিরোধ করব।’

আরএনবি/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর