সংবিধানে সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা কিংবা বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম থাকবে কি না—এ ধরনের রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি নির্ধারণের বিষয় আদালতের নয়, বরং সংসদের সিদ্ধান্তের বিষয় বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির। তাঁর মতে, এসব বিষয়ে আদালত সিদ্ধান্ত দিলে তা সংসদের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপের শামিল হবে।
বুধবার (৮ জুলাই) সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল প্রশ্নে আপিল শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
আলোচিত এ মামলায় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন শিশির মনির। দীর্ঘ ছয় মাসের বেশি বিরতির পর গত সোমবার প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে মামলার শুনানি পুনরায় শুরু হয়। এরপর টানা তিন দিন আপিলকারী চার পক্ষ শুনানিতে অংশ নেয়। শুনানি শেষে রায়ের জন্য আগামী বৃহস্পতিবার দিন ধার্য করেছেন আদালত।
শুনানিতে শিশির মনির আদালতের কাছে পঞ্চদশ সংশোধনীর বিষয়গুলোকে আদালতের এখতিয়ার ও সংসদের এখতিয়ারের আলোকে পৃথকভাবে বিবেচনার আবেদন জানান।
তিনি বলেন, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম এবং সংবিধানের ৮, ৯, ১০, ১১ ও ১২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি কী হবে—এসব নীতিগত প্রশ্ন সংসদই নির্ধারণ করবে। আদালত যদি এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তা সংসদের কাজের ওপর বাড়তি দায়িত্ব পালন করার মতো হয়ে যাবে।
শিশির মনিরের ভাষ্য, আদালত এসব নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিলে তা আইন প্রণয়নের সামিল বলে সমালোচনার সুযোগ তৈরি হবে। অথচ সংবিধান সংশোধন বা রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা নির্ধারণের দায়িত্ব সংসদের। সংসদে পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কের মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে, সেটিই সংবিধানের অংশ হওয়া উচিত।
পুরো সংশোধনী বাতিল না করার আহ্বান
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে উল্লেখ করে শিশির মনির বলেন, পুরো সংশোধনী একযোগে বাতিল করলে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হতে পারে। এতে রাষ্ট্র পরিচালনায় জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, যেসব বিধান অসাংবিধানিক, কেবল সেগুলো বাতিল করা হোক। আর বাকি বিষয়গুলো বর্তমান নির্বাচিত সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত, যাতে সংসদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে কোন বিধান থাকবে এবং কোনটি বাদ যাবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আপিল বিভাগ ইতোমধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেছেন। ফলে এ ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন, প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টাদের শপথ এবং তাদের বেতন-ভাতাসংক্রান্ত বিধান বহাল থাকলে সাংবিধানিক অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হবে। তাই সংশ্লিষ্ট বিধানগুলোও বাতিলের আবেদন জানানো হয়েছে।
৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদের সমালোচনা
সংবিধানের ৭ক ও ৭খ অনুচ্ছেদের সমালোচনা করে শিশির মনির বলেন, এসব বিধানে সংবিধানের কিছু অংশ সংশোধনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং তা লঙ্ঘন করলে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তাঁর মতে, কোনো গণতান্ত্রিক সংবিধানে এমন বিধান থাকা উচিত নয়।
তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে সমাজ, রাষ্ট্র ও জনগণের চিন্তাভাবনা পরিবর্তিত হয়। ভবিষ্যতের সংসদ যদি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংবিধানের কোনো অংশ সংশোধন করতে চায়, তাহলে তাদের সেই সুযোগ থাকা প্রয়োজন। বর্তমান প্রজন্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সিদ্ধান্ত আগাম নির্ধারণ করে দিতে পারে না।
শিশির মনির আরও বলেন, রাষ্ট্রপক্ষও পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিলের পক্ষে নয়। রাষ্ট্রেরও মত হলো, সংসদের এখতিয়ারের বিষয়গুলো সংসদের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। আদালত ও সংসদের দায়িত্ব আলাদাভাবে নির্ধারিত হলে ব্যক্তি বা কোনো রাজনৈতিক দলের আধিপত্যের পরিবর্তে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।
আরএনবি/এআর




