সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ঢাকা

আলোচিত শিশু ধর্ষণ-হত্যা, দীর্ঘসূত্রতায় থমকে যায় ন্যায়বিচার

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ২৫ মে ২০২৬, ০৯:০১ পিএম

শেয়ার করুন:

Rape
শিশু ধর্ষণ ও হত্যার হার বেড়েই চলছে। ছবি: এআই

রাজধানীর পল্লবীর স্কুলছাত্রী রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি শিশু হত্যা ও ধর্ষণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এনেছে। সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিকতার স্খলনের কারণে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। প্রতি মাসে অপরাধের যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, এর একটা বড় অংশজুড়ে থাকে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার তথ্য। কোনো ঘটনা জাতীয়ভাবে আলোচিত হলে, মিডিয়ায় ভালো ফোকাস পেলে সেটা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। কিন্তু এর বাইরে অনালোচিত থেকে যায় অগণিত ঘটনা। এভাবে দিন দিন শিশু হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা বেড়েই চলেছে এবং সঙ্গে বাড়ছে বিচার না পাওয়ার হতাশা ও ক্ষোভ।  

এসব ঘটনায় অপরাধীরা ধরা পড়লেও রায় কার্যকর হওয়ার নজির খুবই কম। মামলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলার কারণে বিচারে স্থবিরতা দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে একই অপরাধ ঘটায়। এভাবে সমাজে অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষকরা। এ থেকে উত্তরণের জন্য বিচারে গতি, ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা এবং সামাজিক অবক্ষয় রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন

ঈদের পরই শুরু হচ্ছে রামিসা হত্যা মামলার বিচার: আইনমন্ত্রী

বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে দেশে ২ হাজার ৩৩৯টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তাদের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালে ৯৪টি, এর আগে ২০২৫ সালে ৪৫৬টি, ২০২৪ সালে ২৩৪টি, ২০২৩ সালে ৩১৪টি, ২০২২ সালে ৫৬১টি এবং ২০২১ সালে ৭৭৪টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। বিগত ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪৪৯ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ২০২৬ সালে ৩৪, ২০২৫ সালে ১৬৭, ২০২৪ সালে ৬৬, ২০২৩ সালে ৮৫, ২০২২ সালে ১০১ এবং ২০২১ সালে ১৮৫ জন। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালে দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২১ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে।

আলোচিত যত শিশু ধর্ষণ ও হত্যা

গত ১০ বছরে অনেক শিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে। কিন্তু হাতেগোনা কয়েকটি ঘটনা মিডিয়ায় আলোচিত হয়েছে এবং দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় তুলেছে। তাদের মধ্যে কিছু ঘটনায় অপরাধীদের সাজাও হয়েছে। কিন্তু সেই রায় এখনো কার্যকর হয়নি। ফলে পরিবারগুলোও বিচার পাবে কি না তা নিয়ে শঙ্কায় ভুগছে।


বিজ্ঞাপন


Sohel
রামিসা হত্যায় অভিযুক্ত সোহেল-স্বপ্না দম্পতির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে প্রতিবেশীর দ্বারা শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। নৃশংস এই ঘটনার পর খোদ প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী ছুটে যান রামিসার বাসায়। তার বাবা-মাকে সান্ত্বনা দেন এবং এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সেই আশ্বাসে ঘটনার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় ধর্ষণ ও হত্যা মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল হয়েছে। এক মাসের মধ্যে মামলাটির বিচারকাজ সম্পন্ন হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যায় রায় হলেও কার্যকর হয়নি

২০২৫ সালের ৫ মার্চ বোনের বাড়িতে গিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় মাগুরার আলোচিত শিশু আছিয়া। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের সেই ঘটনা দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করলে পুলিশ দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রধান অভিযুক্ত মেয়েটির ভগ্নিপতি হিটু শেখকে গ্রেফতার করে। এরপর বিচার চলে এবং দ্রুত রায়ও হয়। রায়ে হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।

আরও পড়ুন

রামিসা হত্যা: আসামিপক্ষে থাকবে না কোনো আইনজীবী

রায় ঘোষণার পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সেই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ জানা গেছে, বিচারিক আদালত প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও মামলাটি এখন উচ্চ আদালতের আপিলে আটকে আছে। ফলে কবে রায় কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছিয়ার পরিবার। তবে এ ঘটনায় আদালত তিনজনকে বেকসুর খালাস দেওয়ায় পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

গতি নেই সীতাকুণ্ডের ইরা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার

চলতি বছরের মার্চ মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় শিশু ইরা। পরে পাহাড়ি দুর্গম এলাকা থেকে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। আলোচিত এ ঘটনায় বাবু শেখ ওরফে মাহবুব আলম নামে একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি শিশুটির পরিচিত ও প্রতিবেশী ছিলেন। এ ঘটনার পর পুলিশ জানতে পারে, বাবু শেখের বিরুদ্ধে আগেও ধর্ষণ, পর্নোগ্রাফি, চুরি ও ছিনতাইসহ একাধিক মামলা ছিল। এমনকি পরিচয় গোপন করে একাধিক বিয়ের অভিযোগও ওঠে। সেই ব্যক্তি এখনো কারাগারে আছেন। আলোচিত মামলাটির বিচারকাজে তেমন একটা গতি নেই।

Achiya
আছিয়া হত্যায় রায় হলেও কার্যকর হয়নি। ছবি: সংগৃহীত

পিছিয়ে গেল চাটখিলের আসমা হত্যাকাণ্ডের রায়

২০২২ সালের ২৪ মার্চ চাটখিল উপজেলার মেঘা গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় শিশু আসমা।  নিখোঁজের পাঁচ দিন পর বাড়ির পেছনের একটি সেপটিক ট্যাংক থেকে তার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। আলোচিত এই ঘটনার পর একই বাড়ির বাবলু মিয়ার ছেলে শাহাদাতকে গ্রেফতার করা হলে বেরিয়ে আসে আসল ঘটনা। পরে শাহাদাত জবানবন্দীতে জানান, তিনি আসমাকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেছেন। এরপর মরদেহ লুকানোর জন্য সেটি সেপটিক ট্যাংকে ফেলে দেন। পরে তার তথ্যমতে সেই ট্যাংক থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আলোচিত এই ঘটনার রায় গত রোববার (২৪ মে) ঘোষণার কথা ছিল। কিন্তু আদালত সেই রায়ের তারিখ পিছিয়ে ২৪ জুন নির্ধারণ করেছে।

ফরিদপুরের ১০ বছরের শিশু ধর্ষণের রায় হলেও আসামি পলাতক

২০১৯ সালের ১৫ মে ফরিদপুরে ১০ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা আলোচিত হয়। বোনকে ডাকতে পাশের বাড়িতে যায় শিশুটি। সেখানে সম্পর্কের এক চাচা তাকে একা পেয়ে ধর্ষণ করেন। পরে শিশুটি বাড়িতে এসে সব খুলে বলে। এরপর মামলা হয়। সেই মামলায় শিশুটির চাচাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন আদালত।

আরও পড়ুন

রামিসা হত্যা: দোষ স্বীকার করে আদালতে রানার জবানবন্দি

দণ্ড পাওয়া ব্যক্তি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার নুরুল্যাহগঞ্জ ইউনিয়নের একটি গ্রামের বাসিন্দা। কারাদণ্ডের পাশাপাশি তাকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ওই ব্যক্তির জমিজমা বিক্রি করে দুই লাখ টাকা ভুক্তভোগী শিশুর পরিবারকে দেওয়ার জন্য জেলা কালেক্টরকে নির্দেশনা দেন আদালত। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। পরে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। কিন্তু পুলিশ আজও সেই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে পারেনি।  

টাঙ্গাইলের লিজার পরিবার বিচারই পায়নি!

২০১৮ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী লিজাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। পরে এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কিন্তু সেই মামলায় কিছুই হয়নি তাদের। জানা যায়, উপজেলাটিরন গাছাবাড়ি গ্রামের মিজানুর রহমানের মেয়ে লিজা (১১) বিলে গোসল করার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়। বিকেলে হয়ে গেলেও সে বাড়ি না ফেরায় তার পরিবারের লোকজন খোঁজাখুঁজি শুরু করে। পরে রাত ১০টার দিকে বাড়ির অদূরে একটি বাঁশঝাড়ে কলাপাতায় মোড়ানো অবস্থায় তার মরদেহ পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। পরে ২৯টি শুনানির পরও পুলিশ কোনো সাক্ষী হাজির করতে না পারায় অভিযুক্তর কিছু হয়নি। ফলে আসামিরা খালাস পেয়ে যায়।

Ramisa1
রামিসা হত্যা আলোড়ন সৃষ্টি করে দেশজুড়ে। ছবি: সংগৃহীত

২৯ কার্যদিবসে চূড়ান্ত রায়, বিরল ঘটনা

দেশে অনেক শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও মাত্র ২৯ কার্যদিবসে মামলার রায় ঘোষণার রেকর্ড নেই। সম্প্রতি যা ঘটেছে মেহেরপুরের আদালতে। ২০২৫ সালের ১৬ জুন গাংনী উপজেলা চাঁদপুর গ্রামের পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় শাকিল হোসেন নামে এক যুবকের ফাঁসি ও সঙ্গে আরও তিন লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরও এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। শুধু রায় নয়, জরিমানার টাকা ধর্ষকের স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি নিলামে বিক্রি করে অর্থ আদালতের মাধ্যমে ভিকটিমের পরিবারকে পরিশোধের আদেশ দেন বিচারক। দ্রুততার সঙ্গে রায় ঘোষণার পর থেকে আলোচনা চলছে। ঘটনাটিকে নজিরবিহীন উল্লেখ করে আইনজ্ঞরা বলছেন, সদিচ্ছা থাকলে সবই সম্ভব।

আরও পড়ুন

আমার শতভাগ বিশ্বাস মেয়ে হত্যার বিচার পাবো: রামিসার বাবা

৮৭ ভাগ মামলার চার্জশিট হয়, বিচার পেতে দীর্ঘ সময়

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য বলছে, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের মামলাগুলোর ৮৭ ভাগ তদন্তের পর চার্জশিট হয়। বাকি ১৩ শতাংশ মামলায় ঘটনার প্রমাণ মেলে না। ফলে সেগুলোতে ‍চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তারা। আবার  চূড়ান্ত রিপোর্ট হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে ৭০ ভাগ মামলার এজাহারে ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়। তার ৩০ ভাগই থাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ফলে সেই মামলাগুলো আর আলোর মুখ দেখে না। সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে ১০১টি। ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারাধীন মামলা দেড় লাখেরও বেশি।

Era
গতি নেই ইরা হত্যার বিচারকাজে। ছবি: সংগৃহীত

যথাযথ বিচার না হওয়ার আরও কিছু কারণ ওঠে এসেছে পুলিশের তদন্তে। সেগুলো হলো- সময় মতো ভিকটিমের মেডিকেল পরীক্ষা না হওয়া, ডিএনএ’র আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়া, কখনো বাদীর অনাগ্রহ। নানা ফিল্টারিংয়ের পর মামলা বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে আসে। তবে ধর্ষণ মামলাগুলো ১৮০ কার্য দিবসে শেষ করার নিয়ম থাকলেও সেটি সম্ভব হয় না নানা কারণে।

সমাধান কোন পথে?

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান মনে করেন, সরকার আসে সরকার যায়; কিন্তু কেউ বিচারব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কথা ভাবে না। দিনের পর দিন এভাবেই চলছে। সারাদেশে ৪৫ লাখ মামলা জমেছে, কিন্তু তার বিপরীতে বিচারক মাত্র আড়াই হাজার। যাদের একজনের ঘাড়েই ১ হাজার ৮০০ মামলা পড়ে। ফলে ৩৬৫ দিনে এসব মামলা শেষ করা কঠিন। প্রতিদিন নিত্যনতুন মামলা হচ্ছে, ফলে আবারো বাড়ছে মামলা। জট তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সেভাবে আদালত ও বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে না। অন্য দেশের আদালতে এমন চিত্র নেই একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া। ফলে সরকারকে যেকোনো ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করতে হলে আগে বিচারক ও আদালতের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

আরও পড়ুন

বছরের অর্ধেক সময়ই বন্ধ, মামলা জট কমবে কীভাবে?

এই আইনজীবী ঢাকা মেইলকে বলেন, মামলা হলে বিচার পেতে যে দীর্ঘসূত্রতা এটা আজকের সমস্যা না। বছরের পর বছর মামলা জমতে জমতে এখন ৪৫ লাখ মামলা পেন্ডিং। বিভিন্ন অ্যাপ্লিকেশন বাদেই ৪৫ লাখ। অ্যাপ্লিকেশন জামিনের আবেদনসহ অন্যান্য যে আবেদন সেগুলো ধরা হলে এই সংখ্যাটা অনেক বেশি। এখন এই বাংলাদেশে যেটা হয়েছে এত বছর ধরে মামলা বাড়ছে, কিন্তু মামলা অনুপাতে যে কোর্ট লাগবে, বিচারক লাগবে, সেটা নিয়োগ দেয় না সরকার। এটার যদিও তিনটা অর্গানের একটা অর্গান হচ্ছে বিচার বিভাগ। কিন্তু বিচার বিভাগের বাজেট বিটিভির চেয়েও কম। সেটা আইনমন্ত্রী স্বীকার করেছেন। যখন একটা পুরা অর্গানের বাজেট কমিয়ে তাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হচ্ছে, অকার্যকর করে রাখা হচ্ছে এবং আড়াই হাজার বিচারক দিয়ে ৪৫ লাখ মামলা ডিল করছে, যেটা আসলে মানুষের পক্ষে সম্ভব না। আড়াই হাজার বিচারক ৪৫ লাখ মামলা শেষ করবে কোনদিন? নতুন নতুন মামলা হবে, এগুলি আগামী ১ লাখ বছরও সম্ভব না।

মানুষ রাস্তায় নেমে আন্দোলন না করলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না—এমন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে মন্তব্য করে এই আইনজীবী বলেন, জনবিক্ষোভ তৈরি হলে, মিডিয়ায় বিষয়টি আলোচনায় এলে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তবেই কিছু মামলায় দ্রুত পদক্ষেপ দেখা যায়। কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় অধিকাংশ মামলার বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকে।

Case
মামলা জট ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে বড় বাধা। ছবি: সংগৃহীত

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আইনমন্ত্রী যখন বলেন চার্জশিট দিতে বলেছি, কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সাত দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা বলেন—তাহলে অন্য সব মামলায় কেন একই উদ্যোগ নেওয়া হয় না? তার মতে, এ ধরনের ‘বিশেষ নজরদারি’ শুধু জনচাপের কারণে সীমিত কিছু ঘটনায় দেখা যায়, যা ন্যায়বিচারের সমানাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশের বিচার বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটে ভুগছে। একটি সীমিতসংখ্যক বিচারক দিয়ে কোটি কোটি মামলার চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, উচ্চ আদালতে মাত্র অল্পসংখ্যক বিচারক দিয়ে হাজার হাজার আপিল ও রিভিশন মামলা নিষ্পত্তি করা কার্যত অসম্ভব।

আরও পড়ুন

মামলা জটে বিপর্যস্ত বিচার বিভাগ, নথি সংরক্ষণে হিমশিম

ইশরাত হাসান বলেন, বিচারপ্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে বারবার আদালতে হাজির হতে হয়, যা সময় ও অর্থ—দুটো দিক থেকেই বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক পরিবার আইনজীবী রাখার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে, ফলে তারা বিচারপ্রক্রিয়া থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তিনি উল্লেখ করেন, এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে অনেক ভুক্তভোগী শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে পড়ে এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলে।

তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বিচার বিভাগে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। বিচারকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি না করলে দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে মনে করে তিনি।

তিনি প্রস্তাব দেন, অন্তত দশ হাজার বিচারক নিয়োগ দিয়ে বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে এবং নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার মতো গুরুতর মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।

এমআইকে/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর