২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সেনা অভিযান ও ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে লাখো রোহিঙ্গা। সময়ের সঙ্গে পুরনোদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন করে আসা জনগোষ্ঠীও। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি শরণার্থী শিবিরে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ২ হাজার ২৪ জন। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত নতুন করে নিবন্ধিত হয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৬৯০ জন।
কাঁটাতারের বেড়ায় বছরের পর বছর বন্দিজীবন কাটাতে কাটাতে রোহিঙ্গাদের এখন একটাই আকাঙ্ক্ষা—নিজভূমি আরাকানে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ীভাবে ফিরে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে অবস্থান করা। কিন্তু সেই প্রত্যাবাসনের পথে এখনো বড় বাধা হয়ে আছে রাখাইনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। ২০২৩ সাল থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে তীব্র সংঘাত চলছে। এরই মধ্যে রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও অনুকূল পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—রোহিঙ্গাদের নিজভূমিতে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের আদৌ রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে কি না? প্রত্যাবাসনের দীর্ঘসূত্রতা, রাখাইনের চলমান সংঘাত এবং মিয়ানমারের অবস্থান—সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে? রোহিঙ্গাদের নতুন করে বাংলাদেশে আগমন, মিয়ানমারের প্রত্যাবাসন জটিলতা ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা মেইলের মুখোমুখি হয়েছেন অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বোরহান উদ্দিন।
ঢাকা মেইল: দেখতে দেখতে অনেক দিন হলো, কিন্তু রোহিঙ্গাদের ফেরার কোনো খবর নেই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কি আসলে সম্ভব?
আসিফ মুনীর: প্রথমত, প্রত্যাবাসনকে তো শুধু ‘প্রত্যাবাসন’ হিসেবে দেখলে হবে না। এখানে যে কারণে তাদের দেশ ছাড়তে হয়েছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যদি আল্টিমেটলি তাদের অধিকারের জায়গা থেকে কোনো অগ্রগতি না হয়, তাহলে এটা একটা অনিশ্চিত জায়গা যে, তারা ফেরত যাবে। এই জন্য অনেকে একটা বিশ্লেষণ করেন, তৃতীয় কোনো দেশে যদি তাদের নেওয়া যায় এবং ভলেন্টারি-অর্থাৎ তারা নিজেরা স্বেচ্ছায় যেতে যদি রাজি হয়। এখন এটার বিরোধিতা অনেকে করেন। কেননা তাহলে তারা কোনোদিন তাদের দেশে ফেরত যেতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবতাটাও বুঝতে হবে; মিয়ানমারে তো এটা কেবল ২০১৭ সালের ঘটনা না, এর পেছনে কয়েক শত বছরের একটি ইতিহাস আছে, তারা সেখানে সব সময় নিপীড়িত হয়েছে।
ওই অঞ্চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে চলা ধারায় তাদের যে কেবল সেখানকার রাষ্ট্র জাতিগত স্বীকৃতি দেয় না তা-ই নয়, সেখানকার জনগণও দেয় না। যেহেতু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাদের একটা ভূমিকা ছিল এবং তারা কার পক্ষ নিচ্ছে-সেটি নিয়ে একটা বিভাজন ছিল, তাই তাদের সেখানে দেশের জন্য অলমোস্ট ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে দেখা হয়।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, রাষ্ট্রীয়ভাবে এটার জন্য মিয়ানমারকে বলা হচ্ছে এটা তাদের দায়িত্ব। কিন্তু মিয়ানমার যদি তা না করে তবে আন্তর্জাতিক মহলের ভূমিকা কী? আন্তর্জাতিক মহল তো সেই জায়গাটায় তেমন কিছু করছে না। এই জায়গাটি নিশ্চিত করতে গেলে আন্তর্জাতিক একটি ভূমিকা দরকার। মিয়ানমার যে সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলছে, এটা দ্বিপাক্ষিক ইস্যু, তা মূলত তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি; কারণ তারা আল্টিমেটলি চূড়ান্ত সমাধানে যেতে চায় না। সেই জায়গা থেকে এখানে আন্তর্জাতিকভাবেই একটি সমাধান লাগবে।
আরও পড়ুন
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী: অনিশ্চয়তার পথে যাত্রা
রোহিঙ্গা সংকট: মালয়েশিয়ার ঘোষণায় আশার আলো ও বাংলাদেশের করণীয়
তবে যেটাকে চাপ বলা হয়, শুধু চাপের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন হবে না; এখানে একটি নেগোসিয়েশন লাগবে। এখনকার বাজার অর্থনীতির যুগে, যেখানে সবার নিজস্ব স্বার্থ আছে, বিশেষ করে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ-সেটির ভেতর থেকে যদি একটি নেগোসিয়েশনে আসা যায়, তবেই সমাধান সম্ভব। তা না হলে হবে না। এই কাজ করতে হলে শেষ পর্যন্ত সহায়তার প্রয়োজন হবে। এটি কেবল সিকিউরিটি কাউন্সিল, চাপ বা স্যাংশন দিয়ে হবে না। তার মানে বিষয়টিকে এভাবে না দেখে মাল্টিফ্যাসেটেড বা বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। আমাদের স্বাভাবিক কূটনীতির পাশাপাশি ‘ট্র্যাক টু কূটনীতি’র মাধ্যমে চেষ্টা করতে হবে, যেন মিয়ানমারের বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে তাদের কনভিন্স করানো যায়।
অন্যদিকে তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের অপশনটি কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন বা প্রক্রিয়ার কোথাও বাধাগ্রস্ত নয় যে, পার্শ্ববর্তী বা আঞ্চলিক কোনো তৃতীয় দেশে তাদের নেওয়া যাবে না। চর্চার দিক থেকে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে আমেরিকান ইনভলভমেন্টের কারণে উন্নত বিশ্বের কথা আসে, তবে তা লোকালি বা রিজিয়নালিও হতে পারে-যেমন মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়া হতে পারে, যেখানে তারা যেতে রাজি হতে পারে। পুরো জনগোষ্ঠী না হলেও এটিকে সাময়িক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। যেমন এখানে আমরা ১০ বছর ধরে সাময়িক আশ্রয়ের কথা বলছি; ঠিক সেভাবেই অন্য কোথাও সাময়িকভাবে যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে যদি কোনোদিন পরিস্থিতির উন্নতি হয়, তবে তারা নিজ দেশে ফেরত যাবে, আর না হলে অল্টারনেটিভ বা বিকল্প জায়গায় থাকবে।
এই জায়গায় কূটনৈতিক যোগাযোগগুলো এখনো সেভাবে শুরু হয়নি এবং আজ পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনও হলো না। ২০২৫ সালে জাতিসংঘের সাইডলাইনে একটি আলোচনা হলেও আঞ্চলিক কোনো সম্মেলন হয়নি, এমনকি বাংলাদেশের লিডারশিপেও হয়নি। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো যৌথভাবে আলোচনার টেবিলে বসেনি। মিয়ানমারের স্বার্থ রক্ষা করে কীভাবে নেগোসিয়েশনের জায়গায় আসা যায়, সেটি ভাবতে হবে। কারণ অনেকেই মিয়ানমারের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রাখতে চায়-চায়নার ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ ইনিশিয়েটিভসহ নানা বাণিজ্যিক স্বার্থ রয়েছে। কাজেই সেসব বাণিজ্যিক দিক ব্যবহার করে কূটনীতি চালানোর প্রয়োজনীয়তা আছে। অর্থাৎ সরাসরি সাধারণ রিপ্যাট্রিশনের ভাবনায় সমাধান আসবে না, তবে বিকল্প প্রক্রিয়া তৈরি করলে একসময় সুফল পাওয়া যেতে পারে। মিয়ানমারে একটি স্থিতিশীল অবস্থা না এলে তো আলাপ-আলোচনার প্রশ্নই আসে না, কারণ সেখানে এখনো চরম অস্থিতিশীলতা চলছে এবং আমাদের সীমান্তের ভেতরেও তাদের গোলাগুলি চলে আসছে।
ঢাকা মেইল: রাজনৈতিক সমাধান কেমন হতে পারে?
আসিফ মুনীর: এখনো নিয়মিত লোক ঢুকছে, কারণ সেখানে যুদ্ধের তীব্রতা আগের চেয়ে বেশি। কখনো আরাকান আর্মি লিড করছে, কখনো মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ। এটিকে একটি নিয়ন্ত্রণের জায়গায় আসতে হবে। সরকার যে রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলছে, তা তৃতীয় কোনো মাধ্যমের সাহায্যে হতে পারে-যেমন ‘আসিয়ান’ বা ‘ওআইসি’-এই প্ল্যাটফর্মগুলোকে কাজে লাগানো যেতে পারে। পলিটিক্যাল সমাধান মানে ‘পলিটিক্যাল নেগোসিয়েশন’, পলিটিক্যাল প্রেসার বা চাপ নয়। কারণ মিয়ানমারের চাপ প্রতিহত করার ক্ষমতা আছে এবং চাপ দিতে গেলে দেখা যাবে তাদের ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো বলবে, তারা চাপ দিতে রাজি নয়। কাজেই আমাদের ভাষার প্রয়োগে পরিবর্তন আনতে হবে। এখন পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে আমরা তেমন জোর চেষ্টা চালাইনি। আর সামরিক সমর্থিত সরকার থাকায় রাজনৈতিকভাবে মিয়ানমারের সাথে নেগোসিয়েশন করাও বেশ কঠিন।
ঢাকা মেইল: মিয়ানমার দাবি করেছে সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাঙালি-এটি কোনো কূটকৌশল কি না?
আসিফ মুনীর: এটা তাদের পুরোনো গেম। দেখা যায় ওরা সরাসরি বক্তব্য না দিয়ে নিজেদের ওয়েবসাইটে বা ফেসবুক পেজে প্রেস স্টেটমেন্ট দেয়; এটি তারা আগে থেকেই করে আসছে। তাদের ন্যারেটিভটা কী? ২০১৭ সালে যে কজন এসেছে, তারা শুধু তখনকার হিসাবটাকেই গণনায় ধরছে। এরপর এতদিন ধরে যে আরও মানুষ এসেছে, সেটা তারা স্বীকার করছে না। তাদের পুরনো ন্যারেটিভের ভিত্তিতেই তারা বলছে, এরা ‘বাঙালি’ এবং এখানে এসে বাস করতে পারে। কিন্তু তারা কোথায় বাস করবে? তাদের নিজেদের জায়গা-জমি তো ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে, ফলে শেষ পর্যন্ত তাদের ক্যাম্পের মতো জায়গাতেই থাকতে হবে।
আরও পড়ুন
মিয়ানমারের বিবৃতি কি রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল করে তুলল?
রোহিঙ্গা সংকটের বিষফল: মাদকের আগ্রাসন, চাপে পরিবেশ-অর্থনীতি-নিরাপত্তা
কাজে মিয়ানমার এক ধরনের ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে। তাদের উদ্দেশ্য হলো, সহযোগী রাষ্ট্রগুলোকে একটি বার্তা বা ন্যারেটিভ দেওয়া, যাতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ (ইউএনএসি) বা আন্তর্জাতিক আদালতে কোনো প্রসঙ্গ উঠলে তারা সেই বক্তব্য ব্যবহার করতে পারে। এটি মিয়ানমারের মিত্রদের জন্য একটি পরোক্ষ বার্তা-‘এটি আমাদের ভাষ্য, তোমরা এটিকে প্রমোট করো।’
প্রত্যাবাসন নিয়ে তাদের বার্তার উদ্দেশ্য ভালো নয়। তারা আগের জায়গাতেই আছে-তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই, তারা উদাসীন। এটি কেবল প্রত্যাবাসন বিলম্বিত করার একটি কৌশল। তাছাড়া সম্প্রতি তাদের ওখানে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে; তারা হয়ত জাহির করতে চাইছে যে, তারা একটি ‘গণতান্ত্রিক সরকার’, সামরিক নয়। সামনে জাতিসংঘের অধিবেশন এবং তাদের নির্বাচনের সময়ক্রম বিবেচনা করলে বোঝা যায়-মিত্রদের কাছে নিজেদের অবস্থান ঠিক রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার সদিচ্ছা মিয়ানমারের নেই।
ঢাকা মেইল: আপনাকে ধন্যবাদ
আসিফ মুনীর: ঢাকা মেইলকেও ধন্যবাদ।
বিইউ/জেবি




