বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের বলে থাকে রোহিঙ্গা শরণার্থী, তবে বাংলাদেশের কাছে তারা জোরপূর্বক বিতাড়িত মিয়ানমারের নাগরিক। কক্সবাজারে ঘনবসতিপূর্ণ ৩৩টি ক্যাম্প রয়েছে। যেখানে বসবাস করছেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ১১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭৫ জন।
এ ছাড়া নোয়াখালী জেলার ভাসানচরে আছেন আরও ৩৩ হাজার ৬৫৯ জন রোহিঙ্গা। প্রতিবছর ক্যাম্পগুলোতে প্রায় তিন হাজার শিশুর জন্ম হচ্ছে। সেই হিসাবে ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ ৬৬ হাজার ৩৩৪ শিশুর জন্ম হয়েছে ক্যাম্পে। তাদের ক্যাম্পের বাইরে যাওয়া কিংবা কাজের সুযোগ সীমিত। এই জনগোষ্ঠীর তরুণরা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ শঙ্কায় দিনানিপাত করছেন।
সংকটের শুরু
১৯৮২ সালে আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয় মিয়ানমার। সেই নাগরিকত্ব আইনে উল্লেখ করা হয়, ১৮২৩ সালের আগে থেকে যেসব নৃগোষ্ঠী মিয়ানমারে বসবাস করছে তারাই হবে দেশটির নাগরিক। যদিও এর আগে থেকেই রোহিঙ্গা বা রাখাইন মুসলিমরা যে দেশটিতে বসবাস করছে, তা বেমালুম উপেক্ষা করে মিয়ানমার সরকার। ১৩৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে নাগরিকত্ব দেওয়া হলেও রোহিঙ্গা বা মুসলিমদের নাগরিকত্ব দেয়নি দেশটির কাউন্সিলর অব স্টেট।
মিয়ানমার থেকে পালাচ্ছে শরণার্থীরা
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা জানাচ্ছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত নিরাপত্তার জন্য ৩ লাখ ৮৭ হাজার ২০০ জন রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়েছে। এরমধ্যে স্থলপথে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬০০ জন আর সমুদ্রপথে ২৯ হাজার ৫০০ জন। আর বেপরোয়া সমুদ্রযাত্রায় এখন পর্যন্ত মারা গেছেন প্রায় ৩ হাজার ১০০ জন।
শুধু চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত, মিয়ানমার ছেড়েছেন ১৫ হাজার ৭০০ জন। এরমধ্যে স্থল পথে ৯ হাজার ৯০০ জন আর সমুদ্রপথে দেশটি ছেড়েছেন ৫ হাজার ৮০০ জন। আর প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে নৌকাডুবিতে প্রাণ গেছে প্রায় ৮০০ জনের।
সমুদ্রপথে যাত্রা
ইউএনএইচসিআর বলছে ২০২৬ সালে ১১৪টি নৌকায় করে ৫ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি মানুষ মিয়ানমার ছাড়ার চেষ্টা করেছেন। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে এটিই ছিল যেকোনো বছরের সর্বোচ্চ সংখ্যক সমুদ্রপথে যাত্রার ঘটনা।
চলতি বছরে মোট মিয়ানমার ছাড়াদের প্রায় ৫৯ শতাংশই ছিলেন নারী ও শিশু। দেশ ছাড়ার জন্য প্রায় ৭৮ শতাংশ মিয়ানমার ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার সমুদ্রপথ ব্যবহার করেছেন।
স্থলপথে যাত্রা
২০২৬ সালে আনুমানিক ৯ হাজার ৯০০ জন মানুষ স্থলপথে মিয়ানমার থেকে পালানোর চেষ্টা করেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৭৯ শতাংশ বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। ইউএনএইচসিআর বলছে এই সংখ্যার মধ্যে রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও থাকতে পারেন, যারা স্থলপথে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কাছে বাধাপ্রাপ্ত বা আটক হয়েছেন।
২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত, স্থলপথে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের ৭৯ শতাংশই ছিলেন নারী ও শিশু।
প্রত্যাবাসনই সমাধান
রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান তাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশও বলছে একই কথা। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে বর্তমান সংকট তীব্র হয়। এরপর থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও একজন রোহিঙ্গাও ফেরত যাননি নিজ দেশে।
বাংলাদেশ সরকারের তথ্য বলছে, ১৯৯১-১৯৯২ সালে ২ লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন। এরমধ্যে নিজ দেশে ফেরত যান ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজারের কুতুপালং ও নয়াপাড়া ক্যাম্পে ছিল ৩৩ হাজার ৫৪২ জন। কিন্তু ২০১৭ সালের আগস্টের পর সেই সংখ্যা এখন ১২ লাখেরও বেশি।
জেনোসাইড, বিচার ও দীর্ঘসূত্রিতা
অন্যায়, অত্যাচার আর নির্যাতনের দগদগে ক্ষত নিয়ে জীবন্ত সাক্ষী হয়ে ক্যাম্পে বসবাস করছেন রোহিঙ্গারা। তাদের দাবি বিচার, যারা এইসব নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জেনোসাইড হয়েছে, পরিকল্পিতভাবে একটি জাতিগোষ্ঠীকে নির্মূল করার চেষ্টা করছে মিয়ানমার।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার জেনোসাইড করেছে, জেনোসাইড কনভেনশন ভঙ্গ করেছে এমন অভিযোগ এনে ২০১৯ সালের সেপ্টম্বরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করে গাম্বিয়া। যেখানে অভিযোগ করা হয়, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী বিস্তৃত এবং পরিকল্পিতভাবে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জেনোসাইড করেছে। শুনানি শেষে ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি মিয়ানমারকে জেনোসাইড কনভেনশন মেনে চলা এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলা অপরাধ বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তবে চূড়ান্ত শুনানি শেষ হয়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। কিন্তু ২৫ আগস্ট পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আদেশ দেননি আন্তর্জাতিক বিচার আদালত।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতেও এই বিষয়ে একটি মামলা চলছে। যেখানে আসামি করা হয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের। ২০১৯ সালের নভেম্বরে আইসিসি’র প্রি-ট্রায়াল চেম্বার তদন্তের অনুমতি দিলেও সেটি এখনও চলমান।
মানবিক সহায়তার তহবিল
ক্যাম্পে এবং ভাসানচরে থাকা রোহিঙ্গাদের জীবনধারণের জন্য নির্ভর করতে হয় অনুদানের ওপর। আর এই সহায়তা করে থাকে বিভিন্ন দেশ। তবে এই সহায়তা কমছে।
২০২৬ সালে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার জন্য যে জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে, এ বছর দরকার ৭১০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এরমধ্যে পাওয়া গেছে ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। চাহিদার ৫০ শতাংশ তহবিল এখনও পাওয়া যায়নি। এরমধ্যে রোহিঙ্গাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য দরকার ২৪৭.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, পাওয়া গেছে মাত্র ২১.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
২০২৫ সালে মোট তহবিল প্রয়োজন ছিল ৯৩৪.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যেখানে পাওয়া গেছে ৪৯৬.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ ছাড়া বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের ৬৬ শতাংশ এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
শুরু থেকেই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের প্রত্যাশা করছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশ। প্রতিটি দেশই বলছে, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়াই একমাত্র সমাধান। কিন্তু ২০১৭ সালের পর একজন রোহিঙ্গাও ফেরত যাননি। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাসহ বিভিন্ন দেশ বলছে রাখাইনে রোহিঙ্গা ফেরত যাবার মত পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যাতে টেকসই, মর্যাদার হয় এবং আবার কেউ ফেরত না আসে এমন অবস্থা চায় সবাই।

তবে রাখাইন রাজ্যটির ওপর মিয়ানমার সরকারের কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আরাকান আর্মিসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় আছে রাখাইনে। ফলে কবে সেখানকার পরিস্থিতি শান্ত হবে, প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে তা কেউ বলতে পারছে না।
রোহিঙ্গাদের দাবি ও প্রত্যাশা
রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ছিল বসতবাড়ি, ছিল আবাদি জমি, ছিল দোকানপাট। কিন্তু দেশটির সামরিক বাহিনী আর আরাকান আর্মির নির্যাতনে রোহিঙ্গারা হারিয়েছেন তাদের আপনজন, আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের ঘরবাড়ি। ১৯৭৮ সালে ড্রাগন কিং নামে এক অভিযান পরিচালনা করে দেশটির সেনাবাহিনী। সেই থেকে শুরু তাদের ওপর নির্যাতন।
সংবাদ সংগ্রহের কারণে বেশ কয়েকবার যেতে হয়েছে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। কথা বলেছি, বিভিন্ন বয়সের রোহিঙ্গাদের সঙ্গে। তাদের সবার বক্তব্য এক ও অভিন্ন, আর সেটি হলো তারা ন্যায় বিচার চান। তাদের দাবি, যে অন্যায়, অবিচার তাদের বিরুদ্ধে হয়েছে সেইসব অপরাধীরা উপযুক্ত শাস্তি পাক।
এ ছাড়া তরুণ প্রজন্মসহ প্রাপ্তবয়স্ক রোহিঙ্গারা চান নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত যেতে। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রোহিঙ্গা তরুণরা বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশ তাদের দেশ নয়। বিপদে আশ্রয় দেওয়ার জন্য রোহিঙ্গারা বরাবরই বাংলাদেশ এবং এদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
রোহিঙ্গারা আধুনিক বিশ্বের এক হতভাগ্য জনগোষ্ঠী; যাদের নেই কোনো দেশ, নেই নাগরিকত্ব। বর্তমানে তাদের জীবন যেন অনিশ্চয়তার মেঘে ঢাকা আর ভবিষ্যৎ যেন অদৃষ্টের হাতে।
লেখক: সাংবাদিক




