শনিবার, ১৪ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

এমবিবিএস দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষা

কখনও চিন্তা করিনি এতো ভালো ফলাফল করবো: সুদীপ্ত সাহা

সাখাওয়াত হোসাইন
প্রকাশিত: ১৩ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩১ পিএম

শেয়ার করুন:

কখনও চিন্তা করিনি এতো ভালো ফলাফল করবো: সুদীপ্ত সাহা
সুদীপ্ত সাহা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত ৫৫টি মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষার ফলাফলে যৌথভাবে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন দুজন। তাদের একজন সুদীপ্ত সাহা। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) শিক্ষার্থী। এর আগে এমবিবিএস ফার্স্ট প্রফেশনাল পরীক্ষার তিনটি সাবজেক্টেই অনার্স মার্ক পেয়েছিলেন নাটোরের এই কৃতি সন্তান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ৫৫টি মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী। এর মধ্যে যৌথভাবে প্রথম হয়েছেন ডিএমসির কে-৮০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত সাহা। তিনি দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষার সিলেবাসে থাকা ফরেনসিক মেডিসিন ও ফার্মাকোলজি বিষয়ে অনার্স মার্ক পেয়েছেন।


বিজ্ঞাপন


শুক্রবার (১৪ মার্চ) ঢাকা মেইলের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা মেডিকেলের শিক্ষার্থী সুদীপ্ত সাহার। আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর সাফল্যের নানা গল্প।
 
ঢাকা মেইল: কেমন অনুভূতি হচ্ছে

সুদীপ্ত সাহা: এখন খুবই ভালো লাগছে, এই অনুভূতি ভাষায় বলার মত নয়। আমি মনে করছিলাম হয়তো এক সাবজেক্ট বা দুই সাবজেক্ট হচ্ছে অনার্স মার্ক পেতে পারি। কারণ পরীক্ষা মোটামুটি ভালো হয়েছিল। বিশেষ করে ভাইবাগুলো অনেক ভালো হয়েছিল। ভেবেছিলাম রেজাল্ট ভালো হবে কিন্তু এত ভালো হবে, এটা কখনোই আশা করি নাই। এরমধ্যে ফাস্ট হয়ে যাব এটা চিন্তা করি নাই কখনো। সবকিছু উপরওয়ালার প্রতি তিনি আমার প্রতি এতো অনুগ্রহ করেছেন, যার কারণে রেজাল্ট ভালো হয়েছে।

অনুপ্রেরণা 

সুদীপ্ত সাহা: ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখা ভালো লাগে এবং নিয়মিত করেছি আর পড়ালেখার সাথেই আছি। যাতে আমি মানুষের জন্য কাজ করতে পারি এবং মানুষের ভালোর জন্য যাতে কাজ করতে পারি। সেইসঙ্গে প্রতিটা মুহূর্তে এটা একটা তাড়না কাজ করে যে আমার ভুলের জন্য মানুষের জীবন না যায়। আমি মানুষকে হেল্প করতে পারি আর না পারি, এটা এমন একটা প্রফেশন আমার ভুলের জন্য একটা মানুষের জীবনও চলে যেতে পারে; সেটা যেন কখনো না হয়। এতটুকু যাতে অন্তত ঠিক থাকে যে ট্রিটমেন্ট খুব ভালো না করতে পারলেও মানুষকে কখনো ভুল ট্রিটমেন্ট না দিই। তো তার জন্য তো অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে।


বিজ্ঞাপন


পরিবারের সহযোগিতা

সুদীপ্ত সাহা: পরিবারের সাপোর্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো কিছুর জন্যই মানুষের যদি সফল হতে হয়, তাহলে পরিবারের সাপোর্ট অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম না। ফ্যামিলি সাপোর্ট শুরু থেকে অনেক বেশি ছিল। আমি হলে থাকি, পরিবারের সঙ্গে খুব কমই থাকা হয়। মোবাইলে সবসময় কথাবার্তা বলা হয়। আর আমাদের লাইফ অনেক স্ট্রেসফুল। সারাদিনই ক্লাস ওয়ার্ড সবকিছুই থাকে। দিনশেষে আপনজনের সঙ্গে যদি একটু টাইম স্পেন্ড করা যায়, সেটা অনলাইনে হলেও টাইম স্পেন্ড করা যায়, তাহলে অনেকটা স্ট্রেস রিলিভ হয়। 

পড়াশোনার কৌশল এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি

সুদীপ্ত সাহা: আমার মনে হয়, মেডিকেলে পড়ার ক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি যে জিনিসটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রেগুলারিটি। একজন স্টুডেন্টকে অবশ্যই নিয়মিত পড়ালেখা করতে হবে। প্রত্যেকদিন অল্প একটু হলেও নিয়মিত পড়াশোনা করতে হবে। রেগুলারিটির মধ্যে থাকতে হবে। কোনোভাবেই যেন পড়াশোনায় রেগুলারিটি ছুটে না যায়, একটা ট্র্যাক থেকে যাতে বের হয়ে না যায়, এটা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 

কারণ একদিন অনেক পড়াশোনা হলো, একদিন কিছু হলো না। এভাবে কিছু না হতে হতে যদি ট্রাক থেকে সে সরে যায়, তাহলে অনেক বেশি সমস্যা। নিয়মিত ক্লাস আর আইডেম দিতে হবে, কোনোটাই মিস করা যাবে না। ধৈর্যসহ লেগে থাকবে, তাতে ভালো ফলাফল আসবেই। তারপরে জানার আগ্রহ থেকে পড়ালেখা করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু পরীক্ষা পাশের জন্য যদি পড়ালেখা করি, এটা মনে হয় না মানুষের মাথা থাকে বা খুব একটা হেল্প করবে ভবিষ্যতে। 

34048
সুদীপ্ত সাহা

 

পড়াশোনায় চাপ

সুদীপ্ত সাহা: এখন চাপ তো আছে। চতুর্থ বর্ষে তিনটা সাবজেক্ট; প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি ও কমিউনিটি মেডিসিন। আর স্পেশালি হচ্ছে প্যাথোলজি, মাইক্রোবায়োলজি যেটা এটা হচ্ছে মেডিসিনের মেইন ভিত্তি। তো প্যাথোলজি, মাইক্রোবায়োলজির বেসিক যদি ভালো না থাকে, তাহলে পরবর্তীতে মেডিসিনে ভালো করাটা অনেক কঠিন হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই প্যাথোলজি মাইক্রোবায়োলজির ভালো বেসিক তৈরি করার জন্য চতুর্থ বর্ষে ইয়ারে ভালো পড়াশোনা করতে হবে এবং ভালোভাবে জানতে হবে। 

মেডিকেল লাইফ যেমন যাচ্ছে

সুদীপ্ত সাহা: মেডিকেলের সময়টা একেকজনের কাছে একেক রকম। অনেকের কাছে স্ট্রেসফুল লাগে, প্রতিদিন ক্লাস আর পরীক্ষা। এমন কোনো দিন নাই যেদিন আইটেম থাকে না। এরমধ্যেও ভালো লাগার কিছু বিষয় আছে যখন আমরা রোগীদের সঙ্গে কথা বলি। আর আমার কাছে যেটা ভালো লাগে, সেটা হলো আমার পড়াশোনাটা কখনও বৃথা যাবে না। দেখা গেল, একজন একটা সাবজেক্টে সারাজীবন পড়াশোনা করলো। কিন্তু ফিল্ডে ওই সাবজেক্টের কোনো কাজই করতে পারলো না, তাকে অন্য সেক্টরে চাকরি নিতে হলো। আর মেডিকেলে এমন নয়। আমি এখন যেটা পড়াশোনা করছি, সেটা আমার পেশাগত জীবনে কাজে লাগবে; এখানে ভালো লাগা কাজ করে। আর সবকিছুতেই স্ট্রেস আছে, মেডিকেলে একটু বেশি; মানিয়ে নিতে হয়।

যারা ভালো রেজাল্ট করতে চায়, তাদের জন্য পরামর্শ

সুদীপ্ত সাহা: মেডিকেলে আসলে পাস বা ফেল আসতেই পারে। এটা আসলে অস্বাভাবিক কিছু না। কারণ ৬০ শতাংশ মার্কে পাস করানো হচ্ছে। সবমিলিয়ে ৬০ শতাংশ নয়, রিটেনে শতাংশ, ভাইবায় ৬০ শতাংশ প্র্যাক্টিক্যালে আলাদাভাবে ৬০ শতাংশ মার্ক পেতে হবে। এখন যেকোনো একটা বিষয়ে সমস্যা হতেই পারে। এটাতে আসলে এমন কিছু মনে করার নাই, আমি একদম পিছায় গেছি। আমি আর কিছুই করতে পারবো না, এরকম আসলে চিন্তা করার কোন সুযোগ নাই। মেডিকেলে ফেল বলতে কিছু নাই, আবার প্রস্তুতি নিবে এবং পরীক্ষা দিবে। একটা সময় গিয়ে ভালো করা যাবে। সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে নিয়মানুবর্তিতা।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সুদীপ্ত সাহা: এখনও ঠিক করা হয়নি। আপাতত পড়াশোনা করছি, আরো পরে চিন্তা ভাবনা করবো। কোন দিকে আগাতে পারি। ভালো কিছু করার ইচ্ছা, যাতে আমার দ্বারা অনেক মানুষের উপকার হয়। আগে থেকে কার্ডিওলজির ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি কিছু টপিক আছে ভালো লাগতো। এখন যে শুধুমাত্র এই রিলেটেডই চিন্তাভাবনা তা না। মেডিকেলে আসার পরে আমি দেখি, প্রত্যেকটা সেক্টরই অনেক ডাইভার্সিফাই। প্রত্যেকটা জিনিস অনেক ইন্টারেস্টিং। এখানে শুধু কার্ডিওলজি না। নিউরোলজিও অনেক ইন্টারেস্টিং; আরো কিছু বিষয় আছে। এখন দেখা যাক দিনশেষে আসলে কোথায় টিকে থাকতে পারি। খালি তো চাইলে হবে না। অবশ্যই চান্সও পাওয়া লাগবে। 

মেডিকেল লাইফের চ্যালেঞ্জ

সুদীপ্ত সাহা: এখানে আপনাকে একই কাজ প্রত্যেকদিন করতে হবে, এটা হচ্ছে মূল সমস্যা। ধরেন, আপনাকে প্রত্যেকদিন আইটেম দিতে হবে। প্রত্যেক দিন ক্লাস করতে হবে। প্রত্যেকদিন একই রুটিন একই প্যাটার্ন; যে রকমটা মানুষের কাছে বিরক্ত লাগে। এটা অস্বাভাবিক কিছু না, বিরক্ত লাগতেই পারে। এই স্ট্রেসটা মানে কমার কোন চান্স নাই। দিন দিন যাচ্ছে আরো বাড়তেছে। এর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে এবং এখন তো কিছু করার নাই। এখানে এসেছি, এখানে এখন মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। নিজের মধ্যে মোটিভেশন রাখতে হবে আমি অনেক মানুষের জন্য কাজ করছি। চাপবোধ করা যাবে না। এখানে ভালো লাগছে এবং কাজ করা যাবে না; এমন মনে করা যাবে না।

বেড়ে উঠা

সুদীপ্ত সাহার জন্ম ও বেড়ে উঠা নাটোর জেলার বড়াইগ্রামের বনপাড়ায়। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান তিনি। ২০২০ সালে নাটোরের সেন্ট জোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি আর রাজশাহীর নিউ গভমেন্ট ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন তিনি। ২০২২ সালের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধায় ১৬তম হয়েছিলেন সুদীপ্ত সাহা।

এসএইচ/ক.ম 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর