ইরানের সঙ্গে সংলাপ শুরুর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
তবে আট মাস ধরে চলা যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কোনো পরিকল্পনা এখনো নেই বলে জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা উড়িয়ে না দিয়ে সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরান প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাঘচি এসব কথা বলেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পাঠানো চিঠি ইরানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরানের শর্তও তুলে ধরা হয়েছে। এসব শর্ত পূরণ হলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার পথ তৈরি হতে পারে।
এদিকে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা চলছে। এর অংশ হিসেবে ইরানের একটি প্রতিনিধিদল দোহায় গেছে। আরাঘচি জানান, তার একজন সহকারী পরামর্শ অব্যাহত রাখতে কাতারে অবস্থান করছেন। এর এক দিন আগে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা তেহরান সফর করেন।
আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সংলাপ ও বৃহত্তর বোঝাপড়ার পথ খোলার চেষ্টা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্য যদি এই চিঠির মাধ্যমে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে সেটি হবে আগের ভুলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়া আরেকটি ভুল।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকের প্রয়োজন দেখছে না ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আসন্ন বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে ছড়িয়ে পড়া খবরকে গণমাধ্যমের জল্পনা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন আরাঘচি। তিনি বলেন, এ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকের কোনো প্রয়োজন দেখছে না ইরান। তেহরানের শর্তগুলো স্পষ্ট এবং মধ্যস্থতাকারীরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনা হবে কি না, তা নির্ভর করছে তেহরানের শর্ত পূরণের ওপর। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মধ্যস্থতাকারীরা কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন। দ্বিতীয় পর্যায়ের অংশ হিসেবে ইরান সেগুলো পর্যালোচনা করছে।
কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের শর্ত নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি। লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও মানবাধিকার অধ্যয়ন বিভাগের সংশ্লিষ্ট গবেষক এবং ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক রুজবেহ পারসি আলজাজিরাকে বলেন, শুক্রবার তেহরানে অনুষ্ঠিত আলোচনায় অগ্রগতি হয়ে থাকলে তা মূলত আস্থা তৈরির প্রাথমিক পদক্ষেপগুলোর ক্রম নির্ধারণের বিষয়ে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তার মতে, পারস্পরিক আস্থা ছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়।
হরমুজ প্রণালি খুলতে ইরানের শর্ত
আরাঘচি বলেন, কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনার ফলে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের প্রস্তাব বাস্তবায়নের সময়সীমা কমেছে।
তিনি বলেন, ইরানের প্রস্তাব বাস্তবায়নের সময় পাঁচ দিনে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছিল কাতার। তবে আলোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে দুই দিনে আনার একটি প্রস্তাবে পৌঁছানো গেছে।
ইরানের শর্তের মধ্যে রয়েছে, ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের পর আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানো। এ ছাড়া ইরানের তেল রফতানিতে ছাড় পুনর্বহাল এবং কাতারসহ বিভিন্ন দেশে জব্দ থাকা সব অর্থ ছাড় করার দাবি জানিয়েছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ওমানের সঙ্গে আলোচিত নির্দিষ্ট রুটগুলো স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি অন্য রুটগুলো বন্ধ করার দাবিও জানিয়েছে ইরান।
তেহরান থেকে আলজাজিরার প্রতিনিধি রেসুল সারদার আতাস জানান, আলোচনার মধ্যেও ইরানের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য কোনো নমনীয়তা দেখা যায়নি। আগের দাবিগুলোতেই অনড় রয়েছে দেশটি।
তিনি বলেন, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ওয়াশিংটন ইরানের তেল রফতানিতে ছাড় অব্যাহত রাখার নিশ্চয়তা দিয়েছিল। একই সঙ্গে তেল রফতানিতে নতুন কোনো বিধিনিষেধ আরোপ না করার প্রতিশ্রুতিও ছিল। তবে কয়েক মাস পর ওই সমঝোতা ভেঙে গেলে যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের ছাড় বাতিল করে।
আতাস আরও বলেন, কাতারে থাকা ৬০০ কোটি ডলারসহ বিদেশে জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে এখনো অনড় ইরান। শুধু জ্বালানি ও পারমাণবিক কর্মসূচিসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা নয়, সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর আরোপ করা অন্যান্য নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহার চায় তেহরান। এসব নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবি, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে ইরানকে। দুই পক্ষই শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও নিজেদের দাবির বাস্তবায়ন চায় বলে জানান আলজাজিরার এই প্রতিনিধি।
এআরএম




