ইসরায়েলের নির্বাচনে ৯৩ শতাংশ গণনাকেন্দ্রে প্রায় ৮৬ শতাংশ ভোটগণনা সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলে কোন দল বা জোট সরকার গড়বে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এখন পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি আসন পেতে চলেছে।
আর গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৮টি আসন পাচ্ছে। ইসরায়েলের পার্লামের্ট ‘নেসেটের’ মোট আসনসংখ্যা ১২০। তাই সে দেশে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় জাদুসংখ্যা (ম্যাজিক ফিগার) ৬১। কোনও দল বা জোটই অতগুলি আসন পায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ইসরায়েলে রাজনৈতিক অনিয়শ্চতার আবহে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে পারে আরব দলগুলি।
প্রাথমিক গণনার পর দেখা যাচ্ছে, তিন আরব দল হাদাশ, তাল এবং বালাদের জোট ১২টি আসন পাচ্ছে। আরেক আরব দল র্যাম পাচ্ছে সাতটি আসন। অর্থাৎ, আরব দলগুলির হাতে রয়েছে মোট ১৯টি আসন।
কিন্তু নেতানিয়াহু তো বটেই, বিরোধী জোট আরব দলগুলির সাহায্য নিয়ে সরকার গঠন করবে কি-না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে অনেকেরই। আরবেরা ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ মাত্র। আরব বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি নাগরিকদের বড় অংশের অভিযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান-সহ একাধিক ক্ষেত্রে তারা ‘বঞ্চিত’। তাদের ‘বঞ্চনার’ কথা তুলে ধরেই মূলত রাজনৈতিক প্রচার চালিয়েছিল আরব দলগুলি।
ইতিমধ্যেই মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্র্যাটদের নেতা ইয়াইর গোলান আরব দলগুলির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী আইজেনকট এই প্রস্তাব কতটা মানবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কারণ একদিকে গাজায় হামাসের সঙ্গে সংঘাত, অপর দিকে সিরিয়ায় ইরান প্রভাবিত হিজবুল্লাহ'র সঙ্গে সংঘাতের আবহে নেতানিয়াহু সরকারের সঙ্গে নীতিগত কিছু বিষয়ে স্পষ্টতই মতপার্থক্য রয়েছে আইজেনকটের। কিন্তু প্রধান বিরোধী শিবিরের আশঙ্কা, আরব দলগুলির সাহায্যে সরকার গঠন করলে ইহুদি ভোটাররা রুষ্ট হতে পারেন।
এর মধ্যে আবর দলগুলির বিরুদ্ধে ‘ভোটচুরির’ অভিযোগ তুলেছেন নেতানিয়াহু। সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করে তিনি দাবি করেছেন, আরব জনবসতিপূর্ণ এলাকার গণনাকেন্দ্রগুলিতে নির্বাচনী কারচুপি হয়েছে। ভুয়া নথি দেখিয়ে, অন্যদের হুমকি দিয়ে ভোট লুটের অভিযোগ করেছেন তিনি।
যদিও আরব দলগুলি নেতানিয়াহুর এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে। আরব দলগুলির বক্তব্য, নেতানিয়াহুকে গদিচ্যুত করতে তারা বিরোধী জোটকে সমর্থন করতে প্রস্তুত।
প্রসঙ্গত, আরব দল র্যামের নেতা মনসুর আব্বাস ২০২১ সালে ইসরায়েলি নেতা নাফতালি বেনেট এবং ইয়াইর লাপিদের নেতৃত্বাধীন শাসকজোটে শামিল হয়েছিলেন। কিন্তু অতি দক্ষণপন্থীরা সমর্থন তুলে নেওয়ায় এক বছরের মধ্যেই সেই সরকার পড়ে যায়। ফের প্রধানমন্ত্রী হন নেতানিয়াহু।
ইসরায়েলের নির্বাচনী পদ্ধতি বিশ্বের অন্যান্য সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার থেকে আলাদা। এখানে ভোটাররা সরাসরি কোনও একজন প্রার্থীকে নির্বাচিত করেন না। করেন একটি দল বা যৌথ ভাবে ঘোষিত হওয়া প্রার্থিতালিকাকে, যাকে ‘লিস্ট’ বলা হয়।
ইসরায়েলের আইনসভা ‘নেসেট’-এ প্রতিনিধিত্ব করতে হলে একটি দল বা জোটকে অবশ্যই অন্তত ৩.২৫ শতাংশ ভোট পেতে হবে। এই ভোট শতাংশের নিরিখে আসন বণ্টন হবে। কোনও দল বা জোট ন্যূনতম ৩.২৫ শতাংশ ভোট না পেলে অন্য দলগুলির মধ্যে সেগুলি বণ্টন করে দেওয়া হবে।
ইসরায়েলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যা জোগাড়ের জন্য কোনও দল বা জোটের নেতাকে ২৮ দিন সময় দেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট।

প্রয়োজনে আরও দু’সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়। তবে ওই সময়ের মধ্যে বৃহত্তম দল বা জোট সরকার গঠন করতে না-পারলে অন্য একজন নেতাকে বেছে নিতে পারেন প্রেসিডেন্ট।
যদি তিনিও জোট গঠন করে সরকার গড়তে ব্যর্থ হন, তবে ‘নেসেট’-এর সদস্যেরা তৃতীয় নেতা বাছার জন্য আবেদন করতে পারেন প্রেসিডেন্টের কাছে। আর সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলে আবার নির্বাচন হতে পারে ইসরায়েলে।
যত দিন না সরকার গঠন হচ্ছে, ততদিন অবধি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট। সেই হিসেবে আপাতত নেতানিয়াহুই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী থাকবেন বলে মনে করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইসরায়েলে পাঁচবার নির্বাচন হয়। প্রতিবারই জোটের মধ্যে অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছিল। ২০২২ সালের নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন লিকুদ পার্টি ৩২টি আসন পেয়ে বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে আসে।
পরবর্তী সময়ে নেতানিয়াহু বেশ কয়েকটি কট্টর দক্ষিণপন্থী দলের সঙ্গে জোট গঠন করেন, যার ফলে তিনি ও তার মিত্রেরা মোট ৬৪টি আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন। এবারের নির্বাচন সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেতানিয়াহু ধরে রাখতে পারছেন না বলেই ইঙ্গিত মিলছে।
ইসরায়েলের নির্বাচনী ফলাফল আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষিত হবে ৪ নভেম্বর (বুধবার)। তবে শুক্রবারের মধ্যেই গোটা ছবিটা অনেকাংশে স্পষ্ট হয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
-এমএমএস




