ইসরায়েলের ২৬তম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর)। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম নির্বাচন।
এই নির্বাচনকে ইহুদি রাষ্ট্রটির ৭৮ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এর ফলাফল ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা নেতা নেতানিয়াহুর কয়েক দশক দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটাতে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়র্টাসের প্রতিবেদনে বলা হয়, নেতানিয়াহুর সামনে এবার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট এবং বিরোধী রাজনীতির অন্যান্য নেতারা।
গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে রয়টার্সের তৈরি জরিপ বলছে, ইসরায়েলের সংসদ- নেসেটের মোট ১২০টি আসনের মধ্যে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ৬২টি আসন পেতে পারে।
জনমত জরিপের বরাতে রয়টার্স বলছে, এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী লিকুদ পার্টির সামনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ এসেছে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির কাছ থেকে।
আইজেনকট দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তাবিষয়ক অবস্থানের কারণে ভোটারদের কাছে নিজেকে বিকল্প নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন। গাজা যুদ্ধে নিজের ছেলেকে হারানোর ঘটনাও তার রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি নিজেকে নতুন নেতৃত্বের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন আইজেন কট।
অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ একসঙ্গে নির্বাচনী লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন। তাদের জোটের নাম ‘টুগেদার’। অতীতে এই দুই নেতা নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এবারও তাদের লক্ষ্য সরকার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সংসদীয় সমর্থন তৈরি করা।
এছাড়া সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান এবং সাবেক জেনারেল ইয়ার গোলানও নেতানিয়াহুবিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তবে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে আদর্শগত পার্থক্য থাকায় নির্বাচনের পর সরকার গঠনের প্রশ্নে তাদের ঐকমত্য কতটা কার্যকর হবে, সেটিও বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে দেশটির আরব রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব নাগরিক। তাদের প্রতিনিধিত্বকারী রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের মতো দলগুলো কোনো শিবির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে সংসদীয় হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
রয়টার্স বলছে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঘিরে। হামাসের নেতৃত্বে চালানো ওই হামলায় ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতা সামনে আসে। এরপর গাজায় দীর্ঘ সামরিক অভিযান, লেবাননে সংঘাত এবং ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি ইসরায়েলের রাজনীতি ও সমাজে গভীর প্রভাব ফেলে।
জেরুজালেম-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট’-এর জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬৮ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি জানিয়েছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার ঘটনাটি এবং এর পরবর্তী পরিস্থিতি তাদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে। অর্থাৎ, তারা কোন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করবেন, তা ৭ অক্টোবরের ঘটনার প্রতি ওই দলের ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে।
অন্যদিকে আরব ইসরায়েলিদের মধ্যে মাত্র ৩২ শতাংশের কাছে ৭ অক্টোবরের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর চেয়ে বড় সমস্যা হলো তাদের নিজেদের এলাকার অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। তারা মূলত অপরাধ দমনের বিষয়টিকে মাথায় রেখে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন।
নেতানিয়াহুর সমর্থকেরা তাকে নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তির প্রশ্নে অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে তুলে ধরেন। সমালোচকেরা হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার সরকারের ভূমিকা এবং জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এছাড়াও নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলা। তার বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে ইসরায়েলে বিচার চলছে। যদিও নেতানিয়াহু এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই নির্বাচনের গুরুত্ব রয়েছে। গাজায় সংঘটিত কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। পাশাপাশি নেতানিয়াহুর সরকার গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও ইরানকে ঘিরে ইসরায়েলের সামরিক নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নতুন সরকার গঠিত হলে এসব বিষয়ে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, নাকি কৌশলগত পরিবর্তন আসবে—তা নিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর আগ্রহ রয়েছে।
ইসরায়েলি নির্বাচন প্রক্রিয়া
ইসরায়েলের সংসদ- নেসেটের মোট আসনসংখ্যা ১২০টি। কোনো দলকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হলে অন্তত ৬১টি আসন পেতে হবে। তবে ৭৮ বছরের ইতিহাসে কোনো একক দলই কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে জোট সরকার গঠিত হয়। আর সংসদে স্থান পেতে হলে একটি দলকে বৈধ ভোটের কমপক্ষে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পেতে হয়।
ইসরায়েলিরা কোনো প্রার্থীকে নয়, বরং দলীয় তালিকা অনুযায়ী ভোট দেয়। প্রতিটি দল একটিমাত্র ব্যালটে তাদের প্রার্থীদের একটি ক্রমিক তালিকা তৈরি করে, যা ভোটারদের দল বা প্রার্থী তালিকা নির্বাচন করার সুযোগ দেয়।
নির্বাচনের পর দেশটির প্রেসিডেন্ট সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন আদায়ে সর্বাধিক ভোট পাওয়া দলের নেতাকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন। ওই নেতা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে পারলে সরকার গঠন করেন। ফলে ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো দল সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও সরকার গঠন নিশ্চিত হয় না; বরং কোন রাজনৈতিক জোট ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন অর্জন করতে পারছে, সেটিই প্রধানমন্ত্রী নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এমএইচআর




