সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

রেকর্ড টিকা দিয়েও কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না বাংলাদেশের হাম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম

শেয়ার করুন:

রেকর্ড টিকা দিয়েও কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না বাংলাদেশের হাম
ঢাকার একটি হাসপাতালে উপচে পড়া হামের রোগী: ছবি এপি

বাংলাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করা হামের প্রাদুর্ভাবে চলতি বছরের মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেড় লাখের বেশি শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলা গত কয়েক মাসে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়া হলেও সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা থামানো যাচ্ছে না। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে বা হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু পরীক্ষায় হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার পর হয়েছে; বাকি ৯০৯ জনকে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যু হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

বিপরীতে, এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে।

এত টিকা দেওয়ার পরও হাম নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন—এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অবমূল্যায়ন

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে হামের ঝুঁকি রাতারাতি তৈরি হয়নি। একদিকে, টিকার প্রয়োজন এমন শিশুদের প্রাথমিক অনুমানটি অনেক কম ছিল। অন্যদিকে, জাতীয় পর্যায়ে টিকার আওতাভুক্তির পরিসংখ্যান এমন অনেক এলাকাকে আড়াল করে দিতে পারে যেখানে বিপুল সংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ শিশু রয়ে গেছে।

২০২৩ সালের বাংলাদেশ কভারেজ ইভ্যালুয়েশন জরিপ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে হামের প্রথম ডোজের টিকা গ্রহণের হার ছিল ৮৮ দশমিক ৬ শতাংশ; ২০২৩ সালে তা কমে ৮৬ শতাংশে দাঁড়ায়। 

দ্বিতীয় ডোজের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পতন দেখা যায়—৮৯ শতাংশ থেকে তা নেমে আসে ৮০ দশমিক ৭ শতাংশে। হাম ঠেকাতে প্রয়োজনীয় প্রায় ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজের নিচে দীর্ঘদিন অবস্থান করায় ধীরে ধীরে বিপুলসংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।

কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি টিকা নিয়ে ভুল তথ্য ও অনীহাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে বলে উল্লেখ করেছে ইউনিসেফ।

এছাড়াও ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত সর্বশেষ হাম-রুবেলা সম্পূরক কর্মসূচির পর আর কোনো কর্মসূচি পরিচালনা করেনি সরকার। ফলে, হামের সংক্রমণ রোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ৯৫ শতাংশের নিচে এর আওতা থেকে যায়, যার কারণে পরবর্তী বছরগুলোতে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

২০২৪ সালের জুলাই মাসের অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সমস্যাটি আরও তীব্র হয় এবং দেশের টিকাদান কর্মসূচিতেও বিঘ্ন ঘটে।

বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেছেন, সরকার পরিবর্তনের কারণে ভ্যাকসিন সংগ্রহে বিলম্ব হয়েছে। এর ফলে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ভ্যাকসিনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। মার্চে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে গেলে ৪ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে (ডব্লিউএইচও) দেশব্যাপী প্রাদুর্ভাবের কথা জানায় বাংলাদেশ। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৫ এপ্রিল উচ্চঝুঁকির এলাকাগুলোতে জরুরি টিকাদান শুরু হয় এবং ২০ এপ্রিল দেশব্যাপী কর্মসূচি চালু করা হয়।

কর্তৃপক্ষ ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। তবে প্রায় দুই মাস পর ২৮ জুন, সরকারের ‘ভিটামিন এ’ প্রদানের কর্মসূচিতে একই বয়সের প্রায় ২ কোটি ৪০ লক্ষ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়– যা প্রায় ৬০ লক্ষের একটি পার্থক্য। 

এই অসামঞ্জস্যটিই ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে যে, কীভাবে বাংলাদেশ এখন তার মূল লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার কথা জানালেও, এখনও ঝুঁকিতে রয়ে গেছে বিপুল সংখ্যক শিশু। 

আইইডিসিআর-এর সাবেক কর্মকর্তা মুসতাক হোসেন টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বলেছেন, প্রাথমিকভাবে ১৮ মিলিয়ন শিশুকে টিকার আওতায় আনার যে হিসাব করা হয়েছিল, বাস্তবে প্রয়োজনীয় সংখ্যা ছিল আরও বেশি, যা ভাইরাসের বিস্তার অব্যাহত রাখছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন মহামারী বিশেষজ্ঞ বলেছেন, কর্তৃপক্ষের উচিত বয়স, টিকা গ্রহণের ইতিহাস ও অবস্থান অনুযায়ী আক্রান্তদের বিশ্লেষণ করা এবং প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করা।

তিনি আরও বলেছেন, ওই জনগোষ্ঠীগুলোকে লক্ষ্য করে টিকাদান কর্মসূচি না চালানো হলে, সার্বিকভাবে আক্রান্তের সংখ্যা কমে এলেও সংক্রমণ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। রোগীদের চিকিৎসাকারী ডাক্তাররা এই ঘাটতিগুলোর প্রমাণ দেখতে পাচ্ছেন।

ঢাকার আইডিএইচ-এর চিকিৎসক শ্রীবাশ পাল আলজাজিরাকে বলেছেন, বর্তমানে ভর্তি হওয়া হামের রোগীদের অধিকাংশই টিকা নেয়নি। বর্তমানে চিকিৎসাধীন কিছু শিশু অসুস্থ থাকার কারণে টিকাদান কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেনি।

তবে তিনি উল্লেখ করেছেন, হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কমে এসেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে টিকাদান কর্মসূচির একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে।

নিয়মিত টিকা দেওয়ার আগে শিশুদের মৃত্যু

আইডিএইচ-এর মৃত্যুহার পর্যালোচনা থেকে এই প্রাদুর্ভাবটি কেন এত মারাত্মক হয়েছে, তার আরও একটি সূত্র পাওয়া যায়।

চলতি বছরের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৩ হাজার ১৬৭টি সন্দেহভাজন হামের ঘটনা, ৫৩৭টি পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া ঘটনা এবং ৫৭টি নিশ্চিত বা সন্দেহভাজন হামে মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

মৃত্যুগুলোর সিংহভাগই ছিল খুব ছোট শিশুদের মধ্যে। মৃত ৫৭ জনের মধ্যে ৪৯ জন—অর্থাৎ প্রায় ৮৬ শতাংশ—ছিল ১৫ মাসের কম বয়সী, আর ৩১ জন ছিল নয় মাসের কম বয়সী; বাংলাদেশে এই বয়সেই শিশুদের সাধারণত হাম-রুবেলার প্রথম টিকা দেওয়া হয়।

হাসপাতালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মৃত ৫৭ জনের মধ্যে ৪৭ জন অর্থাৎ ৮৩ শতাংশ হামের টিকা নেননি। নথিভুক্ত মৃত্যুগুলোর মধ্যে ৫০টিতে নিউমোনিয়া শনাক্ত করা হয়েছে, যা মৃত্যুর জন্য দায়ী প্রধান জটিলতা।

 শ্রীবাশ পাল বলেছেন, যেসব শিশু নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়সে এখনো পৌঁছায়নি, তাদের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ে চিকিৎসকরা বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন।

এদিকে পাঁচ মাসের জরুরি টিকাদান কর্মসূচির পরও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আবারও দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের (ডিজিএইচএস) রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক হালিমুর রশিদ বলেছেন, কর্তৃপক্ষ টিকাদানের আরও একটি পর্বের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো কোনো শিশুকে টিকার বাইরে না রাখা এবং যেসব এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে দ্রুত কভারেজ বাড়ানো।

আরেকটি টিকাদান কর্মসূচি কি এটিকে থামাতে পারে?

পরবর্তী চ্যালেঞ্জ হবে আগের দফাগুলোতে বাদ পড়া শিশুদের কাছে পৌঁছানো। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাফল্য আরেকটি বড় জাতীয় কভারেজ পরিসংখ্যানের চেয়ে ক্ষুদ্র পরিকল্পনার ওপর বেশি নির্ভর করবে– অর্থাৎ, এলাকাভিত্তিক ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের চিহ্নিত করা এবং টিকাদানকারীরা যেন তাদের কাছে পৌঁছাতে পারে তা নিশ্চিত করা।

মুসতাক হোসেন বলেছেন, নজরদারির মাধ্যমে যেখানে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উল্লেখযোগ্য ঘাটতি চিহ্নিত হয়, সেখানে কর্তৃপক্ষের উচিত বড় শিশুদের ক্ষেত্রেও টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মহামারী বিশেষজ্ঞ বলেছেন, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

সূত্র: আলজাজিরা

এমএইচআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর