রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

হুথিদের উত্থান ইরান যুদ্ধে কী প্রভাব ফেলবে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম

শেয়ার করুন:

হুথিদের উত্থান ইরান যুদ্ধে কী প্রভাব ফেলবে?

ইয়েমেনের উপকূলীয় সমতলভূমি তিহামাহর দক্ষিণাংশজুড়ে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা অধিকাংশ পর্যবেক্ষককেই বিস্মিত করেছে। সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স নামে পরিচিত হুথিবিরোধী জোট ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলজুড়ে উল্লেখযোগ্য এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত। কয়েক দিনের মধ্যেই এর বড় অংশ হুথিদের দখলে চলে গেছে।

কিছু হিসাব অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত বিদ্রোহীরা দেশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলরেখার প্রায় ১৩০ কিলোমিটার (৮১ মাইল) দখল করেছে।

এটি কয়েক বছরের মধ্যে গোষ্ঠীটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সামরিক সাফল্য। ১২ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের বিধ্বংসী বিমান হামলা এবং মার্কিন, ইসরায়েলি ও ব্রিটিশ বাহিনীর আক্রমণ সত্ত্বেও হুথিরা যে এখনও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকে আছে, সেটিই এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।

প্রতিপক্ষ যখন হতভম্ব ও মনোবলহীন, তখন অদূর ভবিষ্যতে হুথিদের সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।

ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বলেন, ‘এখন তারা সেখানে অবস্থান নিয়েছে এবং তারা নিজেদের অবস্থান সুসংহত করবে। আর তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে দিতে খরচও অনেক বেশি হবে।’

অবশ্য হুথিরা একা নয়। ইয়েমেনের হুথিরা ইরানের সমর্থন পেয়ে থাকে এবং তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর অন্য অংশগুলো, অর্থাৎ লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজায় হামাস এবং সিরিয়ায় আসাদ সরকারের অভিজ্ঞ বিপর্যয় ও পরাজয়ের পর তেহরানের জন্য এই সমর্থন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আল-ওমেইসি বলেন, ‘তাই তারা হুথিদের জন্য তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং অবশ্যই তাদের সেই সমর্থন প্রয়োজন।’

বেশিরভাগ বিশ্লেষকই একমত যে হুথিদেরকে কেবল ইরানের পুতুল হিসেবে বর্ণনা করা ভুল হবে। তবে গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ একটি অস্বস্তিকর নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যৌথ হামলা চালানোর সাত মাস পর, তেহরানের শাসকগোষ্ঠী এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করছে। একটি হলো পারস্য উপসাগরের মুখে হরমুজ প্রণালি, অন্যটি হলো লোহিত সাগর (এবং সুয়েজ খাল)-এর প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাব।

লন্ডনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষণা ফেলো ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, ‘এখন ইরান সরাসরি এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগত দুটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ নিয়ন্ত্রণ করছে।’

তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও তেল বাণিজ্যের ৩৫ শতাংশেরও বেশি এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এটি একটি পারমাণবিক বোমার বিপর্যয়ের সমপর্যায়ের প্রভাব হতে পারে।’

যদি হুথিরা লোহিত সাগরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপেরও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে পেরিম, যা বাব আল-মান্দাবের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের মাঝখানে অবস্থিত, তাহলে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনে হস্তক্ষেপ করার তাদের সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।

গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলকে ঘিরে হুথিদের কর্মকাণ্ডই দেখিয়েছে যে, লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজ হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং ছোট আক্রমণকারী নৌযানের কাছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ আইওনা ক্রেগ বলেন, ‘এই ভৌগোলিক অগ্রগতি ছাড়াই তারা বাব আল-মান্দাব হয়ে সুয়েজের দিকে যাওয়া ও আসা জাহাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল। কিন্তু এখন তারা বাব আল-মান্দাবের ওপর সরাসরি নজরদারির সুযোগ থাকা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, যা তাদের আরও বেশি প্রভাব দিচ্ছে।’

শুক্রবার বিকেলে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে হুথি সামরিক বাহিনী বলেছে, ‘যেসব কোম্পানির জাহাজ সৌদি নয়, তাদের জন্য নৌ চলাচল নিরাপদ।’ তবে সৌদি জাহাজগুলো আগে থেকেই অবরোধের আওতায় রয়েছে। এই বক্তব্যের আন্তরিকতা নিয়ে শিপিং কোম্পানিগুলোর সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক।

তাদের আগের হামলাগুলোতে হুথিরা বলেছিল তারা শুধু ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। কিন্তু বাস্তবে তারা এমন জাহাজেও হামলা চালায় যার সঙ্গে ইসরায়েলের কোনো সম্পর্ক ছিল না, যার মধ্যে একটি নরওয়েজীয় পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজও ছিল।

তবে ক্রেগ বলেন, হুথিরা হয়তো নির্বিচারে হামলা থেকে বিরত থাকতে পারে। কারণ তারা ২০২৫ সালের বসন্তে ছয় সপ্তাহব্যাপী বড় মার্কিন বিমান ও নৌ হামলা, ‘অপারেশন রাফ রাইডার’-এর পুনরাবৃত্তি চাইবে না।

তিনি বলেন, ‘তারা ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত প্রতিক্রিয়া অনুভব করেছে।’

তবে যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও জড়াতে চাইবে?— এই প্রশ্ন উঠেছে। 

ইরানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ ইতোমধ্যেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করায় নতুন একটি সংঘাতমুখী পরিস্থিতি তার জনসমর্থন বা নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাবনাকে খুব একটা শক্তিশালী করবে বলে মনে হয় না।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ চেয়ে করা আবেদনগুলো এখন পর্যন্ত সাড়া পায়নি।

অ্যাক্সিওস লিখেছে, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে ক্রমবর্ধমান সংঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং একদিকে সৌদি আরবকে সমর্থন জোরদার করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চাইছে।"’

তবে সৌদি আরবে উদ্বেগের কারণ শুধু বাব আল-মান্দাবের সম্ভাব্য হুমকি নয়।

সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনে হুথিদের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার স্যাটেলাইট চিত্র ইঙ্গিত করে যে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প এই রুটকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

এর মধ্য দিয়ে ইরানের ইয়েমেনি মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরান সরাসরি হামলার নির্দেশ না দিয়ে থাকলেও, এর সুফল যে তারা পাবে তা স্পষ্ট।

লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ও বিশ্লেষক বারাআ শাইবান বলেন, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে বড় এই সংঘাত বৃদ্ধির সূত্রপাত জুলাই মাসে। তখন হুথিদের একটি প্রতিনিধিদল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে ফিরে আসে।

তিনি বলেন, ‘এর পরপরই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে এবং খুব স্পষ্টভাবেই মনে হয়েছে যে (ইরান) এখন লোহিত সাগরে আরও বড় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’

ইয়েমেন যখন আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, সৌদি আরব যখন লোহিত সাগরে তার অর্থনৈতিক জীবনরেখা রক্ষায় উদ্বিগ্ন, এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দৃশ্যত এই সংঘাতে জড়াতে অনাগ্রহী, তখন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত নতুন এবং সম্ভাব্য বিপজ্জনক এক মাত্রা পেয়েছে।

আর ইয়েমেনের জনগণের জন্য, যারা ১২ বছরের গৃহযুদ্ধে বাস্তুচ্যুত, বিপর্যস্ত, ক্ষুধার্ত এবং দারিদ্র্যপীড়িত হয়ে পড়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলবে।— বিবিসি বাংলা


এমএইচআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর