শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

সুড়ঙ্গ থেকে ভেসে আসছিল কণ্ঠস্বর, ৯ দিন পর জীবিত উদ্ধার দুই শ্রমিক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

সুড়ঙ্গ থেকে ভেসে আসছিল কণ্ঠস্বর, ৯ দিন পর জীবিত উদ্ধার দুই শ্রমিক
দুই শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের নয় দিন পর নেপালে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া সুড়ঙ্গ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে দুই শ্রমিককে। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) নুওয়াকোটের আপার ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়।

উদ্ধারের আগে সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা যাওয়ায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছিল। উদ্ধারকারীরা ভেতর থেকে সাড়া পাওয়ার পর অভিযান আরও জোরদার করেন। কয়েক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত দুই শ্রমিককে জীবিত অবস্থায় বাইরে নিয়ে আসতে সক্ষম হন তারা।

উদ্ধার হওয়া দুই শ্রমিক হলেন—৩০ বছর বয়সী সঞ্জয় শাহ এবং ৪৫ বছর বয়সী কবির মহার্জন। সঞ্জয় শাহ ত্রিশুলি-৩এ প্রকল্পে মেকানিক্যাল ফোরম্যান হিসেবে কাজ করতেন। আর কবির মহার্জন ছিলেন প্রকল্পটির মেকানিক্যাল সুপারভাইজার। তাদের সুড়ঙ্গের প্রায় ১৭০ মিটার ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

উদ্ধারের পর সঞ্জয় শাহ জানান, বন্যার পানি প্রকল্প এলাকায় ঢুকতে শুরু করলে তিনি প্রথমে অন্য শ্রমিকদের নিরাপদে বের হয়ে যেতে বলছিলেন। অন্যরা বের হয়ে গেলেও তাদের নিরাপদে সরিয়ে দিতে গিয়ে তার নিজের বের হওয়ার সময় ফুরিয়ে যায়।

নেপালি সেনাবাহিনীর চিকিৎসকদের তিনি বলেন, ‘আমার দায়িত্ব ছিল সবার জীবন রক্ষা করা। আমি সবাইকে দৌড়ে বের হতে বলছিলাম। কিন্তু অন্যদের বের করে দিতে গিয়ে আমার সময় চলে যায়। শেষ পর্যন্ত আমি আর বের হতে পারিনি।’

সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে থাকার নয় দিন তিনি উদ্ধার হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। এ সময় তিনি একটি ধর্মীয় মন্ত্র পাঠ করছিলেন বলেও জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন

নেপাল-চীনে বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১২৭০ ছাড়িয়েছে, নিখোঁজ ৪৭০০

সঞ্জয়ের কাছে জানতে চাওয়া হলে সুড়ঙ্গের ভেতরে আরও কেউ আছেন কি না, তিনি জানান, কাছাকাছি অবস্থানরত তিন থেকে চারজনের সঙ্গে বিভিন্ন সময় কথা বা শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন। তবে সুড়ঙ্গের আরও গভীরে এবং পাওয়ারহাউসের আশপাশে আরও মানুষ আটকা থাকতে পারেন বলে তিনি ধারণা করছেন।

সুড়ঙ্গ থেকে ভেসে আসে ক্ষীণ কণ্ঠস্বর

দুই শ্রমিককে উদ্ধারের আগে উদ্ধারকারী দল সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। উদ্ধারকারীরা ভেতরের লোকজনকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘চিন্তা করবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করতে এসেছি।’ এর জবাবে ভেতর থেকে ক্ষীণভাবে সম্মতিসূচক শব্দ শোনা যায়।

Nepal2

রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির আইনপ্রণেতা শ্রী রাম নেউপানে, যিনি শুরু থেকেই উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে যুক্ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান—সুড়ঙ্গের ভেতর একাধিক ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শোনা গেছে। এরপর নেপালি সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করে উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করেন।

গত ২৬ আগস্ট নেপালের উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর ত্রিশুলি নদী উপত্যকার বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষে সুড়ঙ্গগুলোর প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ভেতরে আটকা পড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন

আকস্মিক বন্যার জন্য ভারতসহ ৩ দেশের কাছে ক্ষতিপূরণ চায় নেপাল

আপার ত্রিশুলি-৩এ প্রকল্পের সুড়ঙ্গেও উদ্ধারকারীদের পৌঁছাতে প্রায় ছয় দিন সময় লাগে। এরপর ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ভেতরে প্রবেশের পথ তৈরি করা হয়। সুড়ঙ্গের সম্ভাব্য ফাঁকা জায়গাগুলোতে পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন পৌঁছানোর চেষ্টাও করা হয়।

অস্ট্রেলীয় টানেল উদ্ধার বিশেষজ্ঞ আর্নল্ড ডিক্সও দূর থেকে নেপালের উদ্ধার অভিযানকে কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি এর আগে সতর্ক করে বলেছিলেন, ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে দীর্ঘ সময় মানুষ বেঁচে থাকতে পারে এবং শুধু নীরবতা মানেই মৃত্যু নয়।

আরও জীবিত উদ্ধারের আশা

দুই শ্রমিককে নয় দিন পর জীবিত উদ্ধারের ঘটনা নেপালের উদ্ধার অভিযানে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। কারণ, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে এখনও বিপুলসংখ্যক শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন।

Nepal3

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নিখোঁজ প্রায় ৯০০ মানুষের কেউ কেউ সুড়ঙ্গে আশ্রয় নিয়ে থাকতে পারেন বলে কর্তৃপক্ষের ধারণা। বিভিন্ন সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ কাদা ও ধ্বংসাবশেষে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

এরই মধ্যে ত্রিশুলি-৩এ সুড়ঙ্গ থেকে দুই শ্রমিকের জীবিত উদ্ধারের ঘটনা নিখোঁজ অন্যদের পরিবারের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। উদ্ধারকারীরাও সুড়ঙ্গের ভেতরে আরও জীবিত মানুষের সন্ধানে অভিযান অব্যাহত রেখেছেন।

আরও পড়ুন

নেপালের সুড়ঙ্গে ড্রোন পাঠিয়েও খোঁজ মিলল না ৯৩ শ্রমিকের!

২৬ আগস্ট হিমবাহ ধস, পাহাড়ি ঢল, বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়। ত্রিশুলি ও ভোতেকোশি নদীর উপত্যকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি হিসাবে, দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ২০০ ছাড়িয়েছে এবং কয়েক হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

তবে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শিশু ও অন্যান্য মানুষকে জীবিত উদ্ধারের পর এবার নয় দিন ধরে সুড়ঙ্গে আটকে থাকা দুই শ্রমিকের উদ্ধারে নেপালে আবারও আশার আলো দেখা দিয়েছে। উদ্ধারকারী দল এখন সেই আশাকেই সামনে রেখে সুড়ঙ্গগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছে। সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট, রয়টার্স, এএফপি

জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর