মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

ইরানে গিয়ে শান্তি আলোচনার জট কি খুলতে পারবেন আসিম মুনির? 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৯ এএম

শেয়ার করুন:

ইরানে গিয়ে শান্তি আলোচনার জট কি ভাঙতে পারবেন আসিম মুনির? 
ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরে তৃতীয়বার ইরান সফর করছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের অবসানে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই আবারও ইরানে গেলেন মুনির।

পাকিস্তানের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল–জাজিরাকে সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে সফরের আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে তারা বিস্তারিত কিছু বলেননি।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও তথ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আল–জাজিরার প্রশ্নের জবাব দেয়নি। সাধারণত ইসলামাবাদ থেকেই এ ধরনের সফরের ঘোষণা দেওয়া হলেও এবার তা জানিয়েছে তেহরান।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, এই সফরের মাধ্যমে অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা জোরদারে পাকিস্তানের প্রচেষ্টা আরও এগিয়ে যাবে।

তেহরানে সাংবাদিকদের বাঘাই বলেন, সফরে মুনির ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

সফরের আগে চার দিনের মধ্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে মুনিরের দুবার ফোনে কথা হয়েছে। বুধবার ও শনিবার তাদের মধ্যে এসব ফোনালাপ হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দুই কর্মকর্তা আঞ্চলিক পরিস্থিতি এবং পশ্চিম এশিয়ায় শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রথমবার তেহরান সফর করেন মুনির। এর কয়েক দিন আগে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। চার দশকের বেশি সময় পর সেটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে প্রথম সরাসরি আলোচনা।

এরপর মে মাসে আবার ইরান সফর করেন মুনির। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ওয়াশিংটন ও তেহরানের আলোচনায় সামান্য অগ্রগতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন।

তবে বর্তমানে ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারককে (এমওইউ) ঘিরে কূটনৈতিক উদ্যোগ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই ইরানের ওপর নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

মুনিরের এবারের সফরে চলতি মাসে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও আলোচনা হতে পারে। মক্কায় অনুষ্ঠিত ওই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মুনির উপস্থিত ছিলেন।

ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। লোহিত সাগর ও আশপাশের নৌপথে হুথিদের হামলা চলমান সংঘাতকে আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। ইরান হুথিদের সমর্থন করে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়।

বিষয়টি পাকিস্তানের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গত ১১ আগস্ট বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে তানজানিয়ার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের হামলায় তিন পাকিস্তানি নাবিক নিহত এবং কয়েকজন আহত হন। তখন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার ওই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানান।

সফরে মুনির ইরানের সদ্য নিয়োগ পাওয়া শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করতে পারেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের প্রধান মেজর জেনারেল আহমাদ ভাহিদি, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদোল্লাহি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন সচিব মোহসেন রেজাই। চলতি মাসের শুরুতে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

স্থবির হয়ে পড়েছে মধ্যস্থতার উদ্যোগ

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরুর পর গত ছয় মাস ধরে পাকিস্তান মধ্যস্থতার উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। তবে সেই প্রচেষ্টার জন্য ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকে নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা আগস্টের মাঝামাঝি শেষ হয়েছে। দুই পক্ষের কেউই সেই সময়সীমা বাড়াতে রাজি হয়নি।

ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখেছে। তেহরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে, ইরানের ওপর আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে, বিদেশে থাকা ইরানের সম্পদ জব্দমুক্ত করতে হবে এবং সামরিক হুমকি বন্ধ করতে হবে। ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এখনো এসব শর্ত পূরণ করেনি।

65807b8bae89e485e79d3bfe542426eb1078d8c6

এর মধ্যে নতুন করে মার্কিন অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে ইরান।  মার্কিন কর্মকর্তারা এই নিষেধাজ্ঞাকে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর বলে উল্লেখ করেছেন। 

বেসেন্ট বলেছেন, চলমান নৌ অবরোধের পাশাপাশি এই নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য তেহরানের সরকারকে চাপে ফেলে ভেঙে দেওয়া। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিকল্পনাকে অর্থনৈতিক যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছে।

এদিকে গত ৭ আগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের কোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

চলতি মাসের শুরুতে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি স্থবির হয়ে পড়া মধ্যস্থতার উদ্যোগ পুনরুজ্জীবিত করতে তেহরান সফর করেন। তবে কোনো সুনির্দিষ্ট ফলাফল ছাড়াই তিনি দেশে ফেরেন।

অন্যদিকে অঞ্চলটির উত্তেজনাও বাড়ছে। ইরানের ভূখণ্ড থেকে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলে সংযুক্ত আরব আমিরাত গত সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করেছে। তবে ইরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মুনিরের সফর থেকে বোঝা যায়, আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীরা এখনো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনা পুনরায় শুরুর চেষ্টা থেকে সরে যায়নি। একই সঙ্গে তারা তেহরান ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কের ভারসাম্যও বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আলবুসাইদি মঙ্গলবার তেহরান সফর করবেন বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা। আরাঘচির সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে তারও ফোনে কথা হয়েছে।

মুনিরের সফরে কী অর্জন হতে পারে

কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, মুনিরের সফর ইরান ও ওমানের মধ্যে হরমুজ প্রণালি যৌথভাবে পরিচালনার বিষয়ে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার পথ তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, তা না হলে যোগাযোগের সেতুটি খোলা থাকবে ঠিকই, কিন্তু দুই পক্ষ আবারও চাপ প্রয়োগ ও পাল্টা চাপের একটি নতুন চক্রের দিকে এগোবে।

অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল মাহমুদ অবশ্য আরও স্পষ্টভাবে বিষয়টি দেখছেন। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, দুই পক্ষের জন্যই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরিতে পাকিস্তানই কার্যত একমাত্র সম্ভাব্য মাধ্যম।

এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর