১৯৭৬ সালের ঐতিহাসিক এন্টেবে বিমানবন্দরে জিম্মি উদ্ধার অভিযানে নিহত ইসরায়েলি সেনা কমান্ডার ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বড় ভাই ইয়োনাতান নেতানিয়াহুর একটি ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য উন্মোচন করা হয়েছে উগান্ডায়।
রাজধানী কামপালা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ‘ওল্ড এন্টেবে টার্মিনাল’-এ এন্টেবে সামরিক অভিযানের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে উগান্ডা সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল মুহুজি কাইনেরুগাবা ভাস্কর্যটি উন্মোচন করেন।
তবে গাজায় সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত এবং সম্প্রতি গাজায় প্রস্তাবিত ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা বাহিনী’র (আইএসএফ) অধীনে উগান্ডার সেনা মোতায়েনে পার্লামেন্টের অনুমোদনের পরপরই এই ভাস্কর্য উন্মোচন দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
উন্মোচন অনুষ্ঠানে উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইয়োওয়েরি মুসেভেনির জ্যেষ্ঠ পুত্র ও সেনাপ্রধান জেনারেল কাইনেরুগাবা বলেন, আজকের এই স্মারকটি কেবল একজন বীর সেনাকে স্মরণ করার জন্য নয়, বরং বিপদকালে সাহস এবং নির্দোষ জীবন রক্ষার প্রতি তার প্রতিশ্রুতি ও অবদানের প্রতি একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
হাতে মেশিনগান ধরা দাঁড়িয়ে থাকা ইয়োনাতান নেতানিয়াহুর এই অবয়ব উগান্ডা এবং আফ্রিকা মহাদেশ জুড়ে অনেকের মধ্যেই বিস্ময় ও অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে।
ভাস্কর্য স্থাপনের এই পদক্ষেপকে উগান্ডার সার্বভৌমত্বের অবমাননা হিসেবে দেখছেন স্থানীয় রাজনীতি ও সাবেক কূটনীতিকদের একাংশ। উগান্ডার সাবেক আঞ্চলিক বিষয়ক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসুমান কিয়িঙ্গি দ্য অবজারভারে লেখা এক নিবন্ধে স্মারকটিকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে আখ্যা দেন এবং এটি সরিয়ে ফেলার দাবি জানান।
তিনি লেখেন, ‘আমাদের রাষ্ট্র এমন একজন বিদেশি সামরিক কমান্ডারকে সম্মান জানাতে প্রস্তুত, যিনি উগান্ডার সম্মতি ছাড়াই অনধিকার প্রবেশ করেছিলেন। অথচ এন্টেবে বিমানবন্দর রক্ষা করতে গিয়ে উগান্ডার যেসব সেনা প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাদের কোনো জাতীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।’
কিয়িঙ্গি আরও যোগ করেন, ‘এটি এমন একটি বার্তা দেয় যেখানে আফ্রিকান সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করে বিদেশি সামরিক শক্তিকে উঁচুতে তুলে ধরা হচ্ছে।’
১৯৭৬ সালের এন্টেবে অভিযান
১৯৭৬ সালের ২৭ জুন ‘পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব ফিলিস্তিন’ (পিএফএলপি) এবং জার্মানির একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা তেল আবিব থেকে প্যারিসগামী এয়ার ফ্রান্সের একটি বিমান হাইজ্যাক করে এন্টেবে বিমানবন্দরে নিয়ে আসে। বিমানে ২৪৮ জন আরোহীর মধ্যে ১০৫ জন ইসরায়েলি নাগরিক ছিলেন। উগান্ডার তৎকালীন স্বৈরশাসক ইদি আমিন অপহৃতদের অভ্যর্থনা জানান এবং হাইজ্যাকারদের সমর্থন দেন।
ইসরায়েলি কারাগারে বন্দী ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তির দাবিতে এই জিম্মি নাটক শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ৩ জুলাই ইসরায়েলি স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডোরা উগান্ডা সরকারের অনুমতি ছাড়াই বিমানবন্দরে আচমকা হামলা চালিয়ে ১০২ জন জিম্মিকে উদ্ধার করে। এই আচমকা অভিযানে উগান্ডার ৪৫ জন সেনা ও সব হাইজ্যাকার নিহত হন।
ইসরায়েলি হামলাকারী দলের প্রধান ইয়োনাতান নেতানিয়াহু ছিলেন এই অভিযানে নিহত একমাত্র ইসরায়েলি সেনা। ইসরায়েলে এই অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামে পরিচিত হলেও পরে তার সম্মানে নাম বদলে ‘অপারেশন জোনাথন’ রাখা হয়। এই ঘটনাই পরবর্তীতে ভাই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের মূল ভিত তৈরি করেছিল।
উগান্ডা-ইসরায়েল সম্পর্কের টানাপোড়েন
১৯৬২ সালে স্বাধীনতা লাভের পর উগান্ডার সঙ্গে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এমনকি ১৯৭১ সালে ইদি আমিনের ক্ষমতা দখলের নেপথ্যেও ইসরায়েলি সমর্থনের ভূমিকা ছিল। তবে ১৯৭২ সালে ইদি আমিন ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে তাদের সামরিক উপদেষ্টাদের বহিষ্কার করেন।
১৯৮৬ সালে প্রেসিডেন্ট ইয়োওয়েরি মুসেভেনি ক্ষমতায় আসার পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন মোড় নেয়। মুসেভেনি একাধিকবার ইসরায়েল সফর করেন এবং দুই দেশের মধ্যকার সামরিক ও নিরাপত্তার লেনদেন জোরদার হয়। পরবর্তীকালে এন্টেবে আক্রমণকে সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের চেয়ে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার কূটনৈতিক প্রয়াস শুরু হয়। ২০১৬ সালে অভিযানের ৪০ বছর পূর্তিতে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই এন্টেবে সফর করেছিলেন।
উগান্ডার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী ‘খ্রিষ্টান জায়নবাদী’ গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতায় দুই দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক যোগাযোগ বাড়লেও, কাম্পালা এখনো নীতিগতভাবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন বজায় রেখেছে। জাতিসংঘে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একাধিক প্রস্তাবের পক্ষেও ভোট দিয়েছে উগান্ডা।
বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা ও ধর্মীয় কূটনীতির জোরে উগান্ডার নীতিতে কিছুটা প্রভাব বিস্তার করতে পারলেও, দেশটির মূল পররাষ্ট্রনীতিতে পুরোপুরি পরিবর্তন আনা ইসরায়েলের জন্য এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এফএ




