যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) তৈরির পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই আভাস মিলেছে।
গত শুক্রবার (৭ আগস্ট) আহভাজে জুমার নামাজের খুতবায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি আবদ আল-নবী মুসাভি ফার্দ ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার এবং আমেরিকানদের হামলার অভিজ্ঞতা দেওয়ার লক্ষ্যে ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১৫ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি যাতে আমেরিকার জনগণও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয় এবং রক্ত ও ধুলোর মধ্যে দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়ার অর্থ কী, তা বুঝতে পারে।’
অন্যদিকে গত মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা পিবিএস-কে দেওয়া সাক্ষাতকারে আইআরজিসির এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ রেজা নাঘদি বলেন, ইরানের নতুন সামরিক নীতির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে— এমন সক্ষমতা ও প্রস্তুতি অর্জন করতে হবে, যাতে প্রয়োজনে দেশের নিজস্ব সীমান্ত বা ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে সরাসরি শত্রুর ডেরায় গিয়ে নিখুঁত অপারেশন চালানো যায়।
তিনি আরও দাবি করেন, বর্তমানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের উৎপাদন সক্ষমতা তাদের ব্যবহারের হারের চেয়েও অনেক বেশি। ফলে, যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের সাথে এই যুদ্ধ যদি কয়েক বছর ধরেও চলে, তবে যুদ্ধের একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত ইরান সমান তালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যেতে পারবে।
এরআগে গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরান খুবই দ্রুত এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ফেলবে যা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে পারবে।
এবার ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের পক্ষ থেকেও ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রকাশ্য ঘোষণায় আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হলো ‘খোররামশহর’, যার সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার। এটি দিয়ে ইউরোপের কিছু দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত করা সম্ভব। তবে ইরান থেকে ওয়াশিংটন বা নিউ ইয়র্কের মতো মার্কিন মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে কমপক্ষে ১০ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন। ফলে এখন দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব ১২ থেকে ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কথা বলছে।
ইউক্রেন-ভিত্তিক সামরিক ম্যাগাজিন ডিফেন্স এক্সপ্রেস জানিয়েছে, মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র থেকে ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার একটি আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে ইরান উত্তর কোরিয়ার বিদ্যমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে।
ম্যাগাজিনটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ইরানের খোররামশাহর ক্ষেপণাস্ত্রটি উত্তর কোরিয়ার হোয়াসং-১০ এর উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল, যা আবার সোভিয়েত আর-২৭ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে উদ্ভূত।
ডিফেন্স এক্সপ্রেস জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার কাছে ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলোর দাবিকৃত পাল্লা প্রায় ১৫ হাজার কিলোমিটার বা তারও বেশি। বিশেষ করে, হোয়াসং-১৮ এবং হোয়াসং-১৭- এর পাল্লা আনুমানিক ১৫ হাজার কিলোমিটার, হোয়াসং-১৯-এর পাল্লা ১৭ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি বলে দাবি করা হয়।
অন্যদিকে মার্কিন ও ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, তেহরান চাইলে ২০৩৫ সালের মধ্যে সামরিকভাবে কার্যকর আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে। এর জন্য ইরান তাদের সামরিক মহাকাশ কর্মসূচি ও স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ যান (এসএলভি)-কে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কভার বা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
প্রসঙ্গত, মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর জন্য যে শক্তিশালী বুস্টার ও প্রপালশন সিস্টেম প্রয়োজন, সেই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব সহজেই আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) তৈরি করা সম্ভব।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র থেকে সরাসরি ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় সিস্টেমে পৌঁছানো ইরানের জন্য একটি বিশাল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। তবে তাদের বর্তমান মহাকাশ গবেষণার গতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।
সূত্র: ইরান ওয়্যার, ডিফেন্স এক্সপ্রেস
এমএইচআর




