ফিলিস্তিনের গাজায় দখলদার ইসরায়েলের গণহত্যা কিছুতেই থামছে না। চলমান যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার মধ্যেই গাজায় নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
শনিবার (১ আগস্ট) চালানো ইসরায়েলি হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন ১৫ মাস বয়সী জায়েদ নোফাল। সে ছিল তার মায়ের একমাত্র অবলম্বন।খবর মিডল ইস্ট আইয়ের।
ইসরায়েলের বর্বর হামলায় নিজের শেষ সন্তানটি হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছেন ফিলিস্তিনের ফাতেমা নোফাল (৩৮)। এর আগে তার তিন পুত্রসন্তান নিহত হয় ইসরায়েলের বিমান হামলায়।
ইসরায়েল তার তিন ছেলেকে হত্যা করার পর তিনি তার নবজাতকের মধ্যে আশা খুঁজে পেয়েছিলেন। বর্বর ইসরায়েলি বাহিনী শনিবার তার শেষ অবলম্বনটিও কেড়ে নিল।
২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবরের সেই ভয়াবহ স্মৃতিকে পুনরায় জাগিয়ে তোলে, যেদিন একটি ইসরায়েলি বিমান হামলায় ফাতেমা নোফালের তিন ছেলে নিহত হয়েছিল।
অসহ্য গরমে একটি ছোট ঘরের খোলা জানালার পাশে ঘুমিয়ে ছিল ১৫ মাস বয়সী জায়েদ নোফাল। তিন সন্তানকে হারানোর ঘটনায় ইসরায়েলি হামলার ভয়ে জায়েদ নোফালকে কখনো ঘরের বাইরে যেতে দেননি ফাতেমা।
শিশুটি ঘরের বাইরে যাওয়ার জন্য সব সময় ছটফট করতো। কিন্তু তার মা ফাতেমা তাকে কখনো বাইরে যেতে দেননি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঘরের মধ্যেই ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ গেল ছোট্ট জায়েদের।
শনিবার দিবাগত রাত ৩টায় একটি ইসরায়েলি বিমান হামলায় আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে তার পরিবারের বাড়িটি বিধ্বস্ত হয় এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে তার ছোট্ট শরীরটি চাপা পড়ে।
কয়েক মিটার দূরে তার ৩৮ বছর বয়সী মা- ফাতিমা নোফাল হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। রক্ত ও ধুলোয় মাখামাখি অবস্থায় চারপাশে প্রতিবেশীদের চিৎকারের মধ্যে তিনি এমন এক ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়েছিলেন, যা তিনি আগেও সহ্য করেছেন।
২০২৩ সালে তার তিন সন্তান নিহত হওয়ার পর জায়েদ ছিল ইসরায়েলি হামলায় হারানো তার চতুর্থ ছেলে। সন্তানদের শোকে পাথর হয়ে গেছেন ফাতেমা।
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর বাড়িটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। ফাতেমা গণমাধ্যমকে বলেন, "কী ঘটেছে তা আমি এখনও বুঝে উঠতে পারছি না। আমি গভীর শোকের মধ্যে আছি।"
"আমার শুধু মনে আছে, হামলার কয়েক মিনিট আগে আমার ঘুম ভেঙেছিল। প্রচণ্ড গরমের কারণে আমি অন্য একটি জায়গায় চলে যাই, আমার ছোট্ট জায়েদকে জানালার পাশে রেখে আসি যাতে হালকা বাতাসে ওর ঘুম আসে।"
হামলায় আহত হওয়া সত্ত্বেও ফাতেমা নোফাল সেখান থেকে যেতে রাজি হননি এবং প্রতিবেশীদের তার ছেলেকে খোঁজার জন্য আকুতি জানান।
তিনি বলেন, ঘরটি ধ্বংসস্তূপে ভরে গিয়েছিল এবং তারা তাকে খুঁজে বের করার জন্য ধ্বংসস্তূপ সরাতে শুরু করে। অবশেষে জায়েদের ছোট নিথর দেহটি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বের করে আনা হয়, একটি হালকা কম্বলে মুড়িয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
তার মৃত্যু ২০২৩ সালের ১৩ই অক্টোবরের সেই ভয়াবহ স্মৃতিকে পুনরায় জাগিয়ে তোলে, যেদিন একটি ইসরায়েলি বিমান হামলায় ফাতেমার তিন ছেলে নিহত হয়েছিল।
যুদ্ধের শুরুতে, ফাতেমা নোফাল এবং তার পরিবার আল-বুরেইয শরণার্থী শিবির থেকে পালিয়ে যান, এই ভেবে যে উপকূলীয় শহর আল-জাওয়াইদার আল-সাওয়ারহা এলাকাটি আরও নিরাপদ হবে।
তিনি বলেন, "আমরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করেছিলাম এবং পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কারণ আমরা ভেবেছিলাম সীমান্তের কাছে থাকার চেয়ে এটি বেশি নিরাপদ হবে।"
"কিন্তু আমরা কখনও কল্পনাও করিনি যে, নিরাপত্তার জন্য আমরা যে জায়গায় গিয়েছিলাম, সেখানেই আমি আমার তিন ছেলে এবং আমার স্বামীর পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করব।"
সেই হামলায় তার বড় ছেলে ১৬ বছর বয়সী আমিন, ১১ বছর বয়সী হামজা এবং মাত্র ২২ দিন বয়সী নবজাতক পুত্র আহমেদ নিহত হয়।
গাজার প্রায় সব মানুষের মতোই, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ফাতেমা নোফালও মাসের পর মাস বাস্তুচ্যুত হয়ে ঘুরে বেড়িছেন।
তার তিন ছেলেকে হারানোর দশ মাস পর তিনি যখন জানতে পারেন যে তিনি গর্ভবতী, তখন তার জীবনে আশার একটি মুহূর্ত আসে। তিনি যখন জানতে পারেন যে তার একটি ছেলে সন্তান হতে চলেছে, তখন তার আনন্দ আরও বেড়ে যায়।
গাজায় চলমান যুদ্ধের মধ্যেই, ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল ফাতেমা জায়েদকে জন্ম দেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, তার হারানো সন্তানদের রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করতেই জায়েদ এসেছে। তার আগমন পুরো পরিবারে অপরিসীম আনন্দ নিয়ে এসেছিল।
ফাতিমা নোফাল বলেন, যুদ্ধের সময় জায়েদের জন্ম ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তার আগমন পুরো পরিবারে অপরিসীম আনন্দ নিয়ে এসেছিল।
দীর্ঘ যন্ত্রণা এবং কষ্টের পর আমাদের জীবনকে আলোকিত করতে আসা এক ছোট্ট অলৌকিক ঘটনা হিসেবে সবাই তাকে নিয়ে উদযাপন করেছিল।
আত্মীয়রা তার প্রয়াত ভাইদের একজনের নামে তার নাম রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু ফাতেমা তাতে রাজি হননি।
তিনি বলেন, "আমি চেয়েছিলাম ওর নিজের একটা নাম হোক এবং নিজের ভাগ্য হোক।" সময়ের সাথে সাথে, জায়েদ "বাড়ির আনন্দ" হয়ে ওঠে। তার চাচাতো বোনেরা তার প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত হয়ে পড়ে।
"যখনই আমি ওকে টিকা বা চেক-আপের জন্য ক্লিনিকে নিয়ে যেতাম, ওর বোনেরা সিঁড়িতে ওর জন্য অপেক্ষা করত। কয়েক ঘণ্টার জন্যও ওরা ওর কাছ থেকে দূরে থাকতে পারত না।"

ফাতেমা বলেন, আমার আহত স্বামী এখনও হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আমি যখন ওকে দেখতে গিয়েছিলাম, প্রথমেই ও জায়েদের কথা জিজ্ঞেস করেছিল। ও আহত থাকায় আমি ওকে সত্যিটা বলতে পারিনি। আমি ওকে বলেছিলাম যে ও ভালো আছে এবং ওর জন্য অপেক্ষা করছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে শুরু হওয়া গাজায় ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৩ হাজার ৩০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন আরও ১ লাখ ৭৩ হাজার ৩৮৮ জন।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অক্টোবরে গাজায় ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় এক হাজার ২৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত ও ৩ হাজার ২৮০ জন আহত হয়েছেন।
-এমএমএস




