ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ‘মুদ্রাস্ফীতি পছন্দ করেন’, এমন এক সময়ে যখন যুক্তরাষ্ট্রে গত তিন বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার সবচেয়ে বেশি।
ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিসটিকস (বিএলএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে এক বছর আগের তুলনায় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৪.২ শতাংশে। এপ্রিল মাসে এটি ছিল ৩.৮ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিই এই ঊর্ধ্বগতির প্রধান কারণ।
বিজ্ঞাপন
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এটা পছন্দ করি। সংখ্যাগুলো দারুণ ছিল। জানেন আমি কী সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি? আমি মুদ্রাস্ফীতি পছন্দ করি।’
তবে তিনি আশ্বাস দেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হলে মূল্যস্ফীতি ‘পাথরের মতো নিচে নেমে আসবে’। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানে হামলা চালিয়েছে।
বুধবার মুদ্রাস্ফীতির তথ্যের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প বলেন, ‘মার্কিন বাহিনী রাতের অভিযানে ইরান থেকে ‘লাখ লাখ ব্যারেল’ তেল নিয়েছে, যা তেলের দামে কিছুটা পতন ঘটাতে সহায়তা করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই সংঘাত শেষ হলে… আপনি দেখবেন তেলের দাম আগের অবস্থায় নেমে যাবে।’
বিজ্ঞাপন
২০২৬ সালের শুরুর দিকে আইওয়া সফরের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘সেখানে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম ১.৮৫ ডলার দেখেছি এবং আমরা খুব শিগগিরই আবার সেই পর্যায়ে ফিরে যাব।’
তবে বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড এখনও যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে।
নিউইয়র্ক পোস্টকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মন্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে; আমি বোঝাতে চেয়েছি যে ইরান যুদ্ধ সত্ত্বেও ‘মুদ্রাস্ফীতি’ প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।’
বুধবার ছিল টানা তৃতীয় মাস, যখন কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স (সিপিআিই) বেড়েছে, ফলে পরিবারগুলো ক্রমেই বেশি চাপ অনুভব করছে।
এর আগে ট্রাম্প বলেছেন, মুদ্রাস্ফীতি সাময়িকভাবে বাড়ছে এবং যুদ্ধ শেষ হলে দ্রুত কমে যাবে।
বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি এখনও ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে তার পূর্বসূরি জো বাইডেনের সময়কার ৯.১ শতাংশ সর্বোচ্চ স্তরের তুলনায় অনেক কম।
তবুও এটি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটাররা অর্থনীতিকে শীর্ষ ইস্যু হিসেবে দেখছে।
উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা বাড়ায়, যাতে ব্যয় কমিয়ে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
মে মাসে গ্যাস ও বিদ্যুৎসহ মোট জ্বালানি বিল এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি ছিল, যার বড় অংশই পেট্রলের দাম বৃদ্ধির কারণে হয়েছে।
অন্যদিকে মোটরিং সংস্থা এএএ-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন সাধারণ পেট্রলের গড় দাম ৪.১৫ ডলার, যা ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার সময়ের ২.৯৮ ডলার থেকে অনেক বেশি।
ইরান এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়— ফলে সরবরাহে বড় ধাক্কা লেগেছে।
বুধবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে।
এপ্রিল মাসে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও দুই পক্ষই এই সপ্তাহে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। সংঘাতটি শুরু হয়েছে তিন মাসেরও বেশি সময় আগে।
বিএলএস-এর তথ্য অনুযায়ী, বিমান ভাড়া, ব্যক্তিগত ও চিকিৎসা সেবা, বিনোদন এবং যোগাযোগ ব্যয়ও বেড়েছে।
সিপিআই হলো একটি সূচক, যা এক বছরের ব্যবধানে নির্দিষ্ট মাসে দামের পরিবর্তন পরিমাপ করে। ফেড-এর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য মুদ্রাস্ফীতি ২ শতাংশে রাখা।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন স্বাভাবিক হতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারণায় ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, মুদ্রাস্ফীতি কমানোই হবে তার মূল লক্ষ্য। কিন্তু তার সাম্প্রতিক মন্তব্য বিরোধীদের সমালোচনার মুখে পড়ে।
সিনেটের ডেমোক্র্যাটিক নেতা চাক স্কুমার সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘আপনার প্রতি তার অবজ্ঞার কোনো সীমা নেই।’
এ ছাড়া গত মাসে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে— এটি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তিনি আমেরিকানদের আর্থিক অবস্থার দ্বারা ‘একটুও প্রভাবিত নন’— এ মন্তব্যও সমালোচিত হয়।
উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি নতুন ফেড গভর্নর কেভিন ওয়ারস-এর জন্যও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ আগামী সপ্তাহে তিনি প্রথমবারের মতো সুদের হার নির্ধারণ করবেন।
সাধারণত মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়ায়, যাতে ঋণের খরচ বাড়ে, অর্থের প্রবাহ কমে এবং মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আসে।
ওয়ারস দায়িত্ব নেওয়ার আগে ট্রাম্প বারবার তার পূর্বসূরি জেরোমি পাওয়েল-কে সুদের হার কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, আগামী মাসে সুদের হার ৩.৫% থেকে ৩.৭৫% এর মধ্যে অপরিবর্তিত থাকতে পারে। তবে মুদ্রাস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ফেড এই হার বাড়িয়ে দিতে পারে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের প্রধান উত্তর আমেরিকা বিষয়ক অর্থনীতিবিদ স্টিফেন ব্রাউন বলেন, মে মাসের এই বৃদ্ধি একাই সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী প্রমাণ নয়।
এফএ




